ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯ ১৫:৪৭ Asia/Dhaka

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম পশ্চিম ইরানের চমৎকার প্রদেশ লোরেস্তানের সুন্দর শহর বুরুজেরদে। এই শহরটিও অসম্ভব সুন্দর।

বুরুজেরদের উত্তর-পশ্চিমে সুন্দর একটি প্রণালী রয়েছে, নাম কাপারগাহ। এই প্রণালিটা আসলে একটা নদী যা কখনো শুকায়না, বেশ আঁকাবাঁকা। পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেল চালিয়েও কাপারগাহ প্রণালিটি পার হওয়া যায়। বেশিরভাগ ভ্রমণ রসিকই পায়ে হেঁটে এই নদীটি পার হয়। নদীর দুই পারেই রয়েছে পায়ে হাঁটার উপযোগী পত। প্রণালিটি পর্বতারোহীদের জন্যও খেলার খুবই উপযোগী একটি এলাকা।

কাপারগাহ এলাকায় রয়েছে দুটি প্রাকৃতিক ফোয়ারা। দুটোই গরম পানির। রয়েছে পাথরের সেতু আর গোপন গুহা নামের একটি গুহাও।উত্তর পশ্চিম দিক থেকে যদি দক্ষিণ পশ্চিম দিকে যাওয়া যায় তাহলে 'বোস্তনে ফাদাক' নামের অবকাশ যাপন কেন্দ্রটি দেখতে পাওয়া যাবে। বোস্তন শব্দটি বড় পার্ককে বলা হয়। ফাদাক হচ্ছে বুরুজেরদ শহরের সবচেয়ে পড় পার্ক। এই পার্কের ভেতরে রয়েছে তিনটি হ্রদ। হ্রদগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে লাগোয়া। হ্রদগুলো 'গুলরুদ' নদীর পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম হ্রদ এটি। যাই হোক এই হ্রদ আমরা দেখেছি গত আসরে।দেখেছি বিশে দলন জলাশয় এবং সেখানকার বিচিত্র প্রাণী ও পশুপাখি। আজ আমরা সোজা চলে যাবো বুরুজের্দ জামে মসজিদে। সেখান থেকে সুযোগ পেলে আরও কিছু দর্শনীয় নিদর্শনের সঙ্গে পরিচিত হবার চেষ্টা করবো।

বলেছিলাম যে দলন জলাশয় এবং সেখানকার বিচিত্র প্রাণী ও পশুপাখি দেখে আমরা সোজা চলে যাবো বুরুজের্দ জামে মসজিদের দিকে।জলাশয় থেকে পূর্ব দিকে মানে বুরুজের্দ শহরের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত জামে মসজিদটি। পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা হিসেবে পরিচিত বুরুজের্দ জামে মসজিদ। ভ্রমণকারীদের জন্য যেসব প্রদর্শক বা গাইড থাকেন তাদের ভাষ্যমতে এই মসজিদটি হিজরি তৃতীয় শতকের বলে মনে করা হয়।একটি প্রাচীন অগ্নিমন্দিরের ওপর এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে তাদের ব্ক্তব্য।মসজিদের গম্বুজটির উচ্চতা ভূপৃষ্ঠের সমতল থেকে বিশ মিটার।মসজিদ নির্মাণের শুরুর দিকে এর কোনো মিনার ছিল না।পরবর্তীকালে ১২০৯ হিজরিতে ওই মসজিদে মিনারগুলো যুক্ত হয়েছে।

মসজিদের স্থাপত্য কাঠামোটি নির্মাণ করা হয়েছে সাসানীয় স্থাপত্যশৈলী বিশেষ করে ইসলামি শাসনামলের স্থাপত্যের ডিজাইনে। মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে দেখতে পাবেন ইটের তৈরি বিশাল শাবেস্তান চমৎকারভাবে সজ্জিত। তারপরও দেখবেন নয়টি সিঁড়ির বড়োসড়ো একটি মিম্বার। ওই মিম্বারে খোদাইকর্ম করে কবিতা লেখা হয়েছে। আপনারা যারা স্থাপত্যশিল্পের অনুরাগী, যারা প্রাচীন শিল্প পছন্দ করেন তারা সুযোগ পেলে অবশ্যই এই মসজিদটি পরিদর্শন করতে ভুলবেন না। স্থাপত্যশৈলীর চমৎকার এই নিদর্শনটি ভালোভাবে দেখে একটু বিশ্রাম নিয়ে চলে যাওয়া যায় ইমামজাদা জাফর (আ)'র মাজারের দিকে।

ইমামজাদা জাফর (আ) এর মাজারের কথা বলছিলাম। এই ইমামজাদা জাফরের পাঁচ পুরুষ আগে গেলেই ইমাম জয়নুল আবেদিন (আ) এর বংশের সঙ্গে মিলিত হওয়া যাবে। ইমামজাদা জয়নুল আবেদিন ছিলেন শিয়া মাজহাবের চতুর্থ ইমাম। ইমামজাদা জাফর (আ) এর মাজারটি শহরের একেবারে প্রাচীন কবরস্থানে অবস্থিত। এই গোরস্থান থেকে এমন সব মৃৎশিল্পের নমুনা পাওয়া গেছে যেগুলোতে কুফি বর্ণের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়েছে। এই কুফি বর্ণের লেখা প্রমাণ করে যে স্থাপনাটি সালজুকি রাজবংশের সময়কালীন। ভেতরে একটি শ্বেত পাথরের নেমপ্লেটও পাওয়া গেছে যাতে তারিখ লেখা রয়েছে সাত শ সতেরো হিজরি। সুতরাং বুঝতেই পারা যায় কবরস্থানটির ঐতিহ্য যথেষ্ট প্রাচীন এবং সেই প্রাচীনকাল থেকেই মাজারের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা, সম্মান ও মর্যাদা ছিল বেশ আন্তরিক।

এই মাজার কমপ্লেক্স থেকে যাওয়া যেতে পারে কামাল উদ্দিন তাবাতাবায়ির ঐতিহাসিক বাসভবনে। হজ্ব অগা' কামালুদ্দিন নাবাভি তাবাতাবয়ি ছিলেন বুরুজেরদের সাদত তাবাতাবায়ি পরিবারের একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। এই বাড়িটির একটা বিশেষত্ব হলো ইট, সিরামিক এবং বাদির কাঠের তৈরি জানালাগুলো। এই বাড়িটি কাজার শাসনামলের। বাড়িটিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিভাগ এখন একটি যাদুঘরে পরিণত করেছে। বলা বাহুল্য এই যাদুঘরটিই এখন বুরুজেরদের একমাত্র যাদুঘর। যাদুঘর ভবনটি তিন তলা। ভবনের সামনে রয়েছে বড়োসড়ো একটি আঙিনা। বেশ কয়েকটি শাবেস্তান রয়েছে এই ভবনে। রয়েছে অডিটোরিয়ামও। একটি শহনেশিনও রয়েছে ভবনটিতে। শহনেশিন মানে হলো বাড়ির শ্রদ্ধেয় মুরব্বিদের জন্য বসার বিশেষ স্থান। ভবনে প্রবেশের জন্য রয়েছে লম্বা একটি করিডোর। ঘোড়ার আস্তাবলে যেতে হলেও এই করিডোর দিয়েই যেতে হয়।

যে করিডোরের কথা বলছিলাম ওই করিডোর দিয়ে এগিয়ে গেলে পড়বে বৃহৎ একটি আঙিনা। এটা মূল ভবনের উত্তর অংশে পড়বে। আর ভবনের দক্ষিণ অংশে রয়েছে জিনিসপত্র রাখার ঘর বা গুদাম, রান্নাঘর এবং হাম্মামখানা। পশ্চিম অংশেও রয়েছে একটি পানির নালা। এই অংশে স্বাভাবিক কারণেই একটা বাসন্তি আবহাওয়া বিরাজ করে। স্থাপনাটির পূর্ব অংশে উঁচু একটি দেয়াল রয়েছে খিলানের মতো। ঘরের ভেতরেও রয়েছে চমৎকার সব কারুকাজ। ফায়ার প্লেসের উপরে ডিজাইনারের নামও লক্ষ্য করা যায়। তাঁর নাম হলো শিল্পী নেমাত উল্যাহ। এই নেমাত উল্যাহ বুরুজেরদের স্বনামধন্য শিল্পী হিসেবে পরিচিত। তিন বছর সময় নিয়ে তিনি এখানকার কারুকাজগুলো সম্পন্ন করেছেন।

ঐতিহাসিক এই ভবনটি দেখে আরও একটি স্থাপনা ঘুরে দেখা যেতে পারে। এই স্থাপনাটি হলো আর্গ্ বা দূর্গ। সম্প্রতি এই দূর্গটির একটা অংশ আবিষ্কৃত হয়েছে। এখানকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সিরামিক ব্যবহার করে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেই প্রাচীনকালে। এমনকি পানি বিশুদ্ধ করার ব্যবস্থাও দর্শনীয়। তখনকার আমলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টিও অবাক করার মতো। রাষ্ট্রীয় এই দূর্গটির নিরাপত্তার জন্য সাতান্নটি টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছিল। সব ঘুরে ফিরে দেখার পর যাওয়া যায় এখানকার একটি বাজারে। স্থানীয়রা ওই বাজারকে রাসা বলে ডাকে। এই বাজারে ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনের সকল গুরুত্বপূর্ণ জিনিসই কিনতে পাওয়া যায়।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ০৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য