ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯ ১৮:০৯ Asia/Dhaka

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান।

গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম পশ্চিম ইরানের চমৎকার প্রদেশ লোরেস্তানের সুন্দর শহর বুরুজেরদে।এই শহরটিও ছিল অসম্ভব সুন্দর। বুরুজেরদের উত্তর-পশ্চিমে সুন্দর একটি প্রণালী রয়েছে, নাম কাপারগাহ। এই প্রণালিটা আসলে একটা নদী যা কখনো শুকায়না, বেশ আঁকাবাঁকা। পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেল চালিয়েও কাপারগাহ প্রণালিটি পার হওয়া যায়। বেশিরভাগ ভ্রমণ রসিকই পায়ে হেঁটে এই নদীটি পার হয়।

আমরা আরও দেখেছি বুরুজের্দ জামে মসজিদ। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা হিসেবে পরিচিত বুরুজের্দ জামে মসজিদ। মসজিদের গম্বুজটির উচ্চতা ভূপৃষ্ঠের সমতল থেকে বিশ মিটার।মসজিদ নির্মাণের শুরুর দিকে এর কোনো মিনার ছিল না।পরবর্তীকালে ১২০৯ হিজরিতে ওই মসজিদে মিনারগুলো যুক্ত হয়েছে।যাই হোক আমরা আজকের আসরে যাবো অন্য একটি প্রদেশে।ইরানের এই প্রদেশটির নাম হলো ইলাম।আমরা সোজা চলে যাবো এই প্রদেশের কেন্দ্রিয় শহরে। শহরটির নামও ইলাম। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় এই শহরটিতে ঘুরতেও আপনাদের ভালোই লাগবে আশা করি। তো চলুন যাওয়া যাক ইলাম প্রদেশের ইলাম শহরের দিকে।

আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে আমরা এখনও পশ্চিম ইরানেই ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখানকার গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর-যাকে জাগরোস বধূ বলেও অভিহিত করা হয়। আমাদের সফরের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির অংশ এই ইলাম শহর সফর করা। ইরানের সানান্দাজ এবং কেরমানশাহ প্রদেশের পর এই ইলাম শহরটি তৃতীয় বৃহত্তম কুর্দি অধ্যুষিত এলাকা। ইলাম বেশ সুন্দর। সবুজ শ্যামল অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতির জন্য ইলাম তুলনাহীন। প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্যের কারণেই মূলত ইলামকে উপাধি দেওয়া হয়েছে 'জাগরোস বধূ'। ইলাম শব্দের অর্থ হলো পার্বত্য উঁচু স্থান। ব্যাবিলনের লিখন বা লিপিকর্মে ইলামকে অলমাতু অথবা ইলা...ম বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। 'লা'-কে একটু টেনে পড়লে তার অর্থ দাঁড়ায় পার্বত্য অঞ্চল অথবা সূর্যোদয়ের দেশ। ছবির মতো সবুজ এই দৃশ্যময় ইলাম প্রাচীনকালে আরিওজন নামে প্রসিদ্ধ ছিল।তবে ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে হোসাইনাবাদ নামের একটি উপকণ্ঠে নতুন করে বর্তমান ইলামের গোড়াপত্তন করা হয়েছিল।

পাহাড়ের মাঝে অবস্থানের কারণে ইলামের আবহাওয়া এখানকার আশেপাশের অন্যান্য শহরের চেয়ে নাতিশীতোষ্ণ এবং উপভোগ্য। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের যেসব শহর মোটামুটি উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করেছে তাদের মধ্যে ইলাম অন্যতম। এখানে রয়েছে অনেক পিকনিক স্পট, বনাঞ্চলীয় বিনোদন কেন্দ্র এবং অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন। এসব কারণে প্রচুর পর্যটক এই এলাকা ভ্রমণে আসেন। এখানে রয়েছে তাজরিয়ন নামে একটা বনাঞ্চল যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবকাশ যাপনের জন্য রয়েছে চমৎকার আয়োজন। তাজরিয়নের আবহাওয়াও উপভোগ্য-না গরম না ঠাণ্ডা এরকম নাতিশীতোষ্ণ। একইরকম আরো একটি পার্ক রয়েছে এখানে। এই বনানী পার্কটির নাম হলো চাকা'সাব্‌জ। চার হাজার হেক্টর বিস্তীর্ণ এই পার্কটি ইলামের সবচেয়ে সুন্দর এবং আকর্ষণীয় এলাকা। এই বনটিতে রয়েছে অসংখ্য দুর্লভ গাছ গাছালি।

ইলাম নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। ইলামের দিকে যখন তাকাবেন প্রথম যে দৃশ্যটি আপনার দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করবে তা হলো একটি টিলা। সবুজ শ্যামল এই টিলাটিকে দেখলেই মনে হবে শহরের ভেতরে যেন একটি আংটির পাথরের মতো ঝলমল করছে।প্রাচীন এই টিলাটির নাম হলো খারগুশন।শাহেদ টিলা নামেও এর পরিচিতি আছে। নাম যাই হোক এখানে একটা সময় বিভিন্ন প্রজাতির খরগোশের বসবাস ছিল। মূলত খরগোশের নিরাপদ আবাসের কারণেই টিলাটির নাম হয়েছে খারগুশন।এটা সবুজ বনের ভেতরে সুন্দর একটি টিলা। এই টিলার উপরের দিকে উঠতে থাকলে নিজের ভেতরে কাজ করবে চির উন্নত শিরের মতো একটা বীরত্বের ভাব।কারণ হলো সমস্ত ইলাম শহরকে মনে হবে আপনার পায়ের নীচে। আপনি পাখির মতো দৃষ্টি মেলে এক নজরেই দেখে নিতে পারবেন পুরো ইলাম শহরকে।

আপনার পদতলে ইলাম শহর আর আপনি ওই শহরের মাথার উপরে। অনেকটা একটা বাড়ির ছাদের মতো। আর এ কারণেই সম্ভবত খারগুশন টিলাকে স্থানীয় লোকজন ইলামের ছাদ মানে 'বমে ইলাম' নামে অভিহিত করে থাকে। যাই হোক ওই টিলার উপরের আবহাওয়া অন্যরকম মনোমুগ্ধকর। চুপচাপ নিরিবিলি একটা পরিবেশ। যেদিকেই তাকাবেন শহরের সৌন্দর্য আপনার দৃষ্টিতে বিমোহিত করবে। পুরো শহর আর এই সবুজের দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকলে আপনার মনে হবে কোনো বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা ছবি দেখছেন আপনি। হ্যাঁ! শিল্পীই বটে। আমাদের স্রষ্টাই সেই মহান শিল্পী। তাঁর শিল্পকর্মের দিকে তাকিয়ে মনটাকে তাঁর মুখি করে তুলতে পারলে আনমনেই স্রষ্টার প্রশংসায় বিগলিত, নিবেদিত হয়ে উঠবে হৃদয়।শহরের কোলাহল মুখরতার বিপরীতে এখানকার সুনসান নীরবতা আপনাকে প্রশান্ত করে তুলবে নিমেষেই। উড়ু উড়ু মনটা ফিরে পাবে যেন কোলাহলমুক্ত নতুন জীবন।              

ফিরে এলাম আবারও ইরান ভ্রমণে। আমরা এখন রয়েছে পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের ইলাম প্রদেশের খারগুশন টিলার চূড়ায়। এখান থেকে আমরা যাবো ইলামের একটি দূর্গের দিকে। এই দূর্গটির নাম কিরান কেল্লা। ইলাম শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান এটি। কিরান নামে একটি পাহাড় আছে এখানে। ওই পাহাড়ের উপরে গড়ে তোলা হয়েছে দূর্গটি। সে কারণেই দূর্গের নামটিও কিরান কেল্লায় পরিণত হয়েছে। ইলাম শহরে উপকণ্ঠে চমৎকার একটি বনাঞ্চল রয়েছে। ওই বনাঞ্চলের নাম শিশদর অথবা শিশদন। এ দুই নামেই বিখ্যাত বনাঞ্চলটি। ওই শিশদনের কাছেই কিরান কেল্লার অবস্থান। কেল্লাটি আশকানিয়ান শাসনামলের। ইসলাম পরবর্তী ঐতিহাসিক যুগপর্বেও কেল্লাটি তার অস্তিত্ব বজায় রেখেছে গর্বের সাথে। যে পাহাড়ের ওপর কেল্লাটি গড়ে উঠেছে সেটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব। পার্বত্য অঞ্চলের সুন্দর স্পটের বিচারে সমগ্র ইরানের মধ্যে এই কিরান পর্বতের নাম উঠে আসে।

যাই হোক বন্ধুরা! আজ এই কিরান পর্বতে গড়ে ওঠা কিরান কেল্লা পর্যন্তই আমাদের সফর সীমিত থাকুক। ইনশাআল্লাহ পরবর্তী আসরে আমরা যাবো ইলামের অন্য কোনো সুন্দর এলাকার দিকে। বিশেষ করে ইলাম শহরে রয়েছে আরগাভনে উপত্যকা।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য