ডিসেম্বর ২৩, ২০১৯ ১৭:৪৫ Asia/Dhaka

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম পশ্চিম ইরানের চমৎকার প্রদেশ ইলামে।

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে আমরা সোজা চলে গিয়েছিলাম প্রদেশটির কেন্দ্রিয় শহর ইলামে। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় এই শহরটিতে ঘুরতে আপনাদের ভালো লাগারই কথা। কেননা নিশ্চয়ই অনুভব করেছেন যে, পাহাড়ের মাঝে অবস্থানের কারণে ইলামের আবহাওয়া এখানকার আশেপাশের অন্যান্য শহরের চেয়ে নাতিশীতোষ্ণ এবং উপভোগ্য। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের যেসব শহর মোটামুটি উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করেছে তাদের মধ্যে ইলাম অন্যতম।

ইলাম প্রদেশের খারগুশন টিলার চূড়ায় যাবার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই ভোলেন নি। সেখান থেকে আমরা গিয়েছিলাম ইলামের একটি দূর্গের দিকে। দূর্গটির নাম কিরান কেল্লা। ইলাম শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান ছিল এটি। কিরান নামে একটি পাহাড়ও আছে এখানে। ওই পাহাড়ের উপরে গড়ে তোলা হয়েছে দূর্গটি। সে কারণেই দূর্গের নামটিও কিরান কেল্লায় পরিণত হয়েছে। ইলাম শহরে উপকণ্ঠে চমৎকার একটি বনাঞ্চল রয়েছে। ওই বনাঞ্চলের নাম শিশদর অথবা শিশদন। এ দুই নামেই বিখ্যাত বনাঞ্চলটি। এখানে রয়েছে অনেক পিকনিক স্পট, বনাঞ্চলীয় বিনোদন কেন্দ্র এবং অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন। এসব কারণে প্রচুর পর্যটক এই এলাকা ভ্রমণে আসেন। কিরান থেকে আমরা আরগাভনে উপত্যকার দিকে যাবো বলেছিলাম। সময় পেলে ওই উপত্যকা হয়ে অন্য কোনো দিকে যাবার চেষ্টা করবো আজ।

ইলামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন হলো 'আরগাভন' উপত্যকা। এই উপত্যকাটি ইলাম শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। প্রতিবছর বসন্ত এলেই আরগাভনের রূপ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বিচিত্র ফুলের রঙ আর প্রকৃতির সবুজে অন্যরকম এক পরিবেশ তৈরি হয় এখানে। প্রচুর গাছগাছালি রয়েছে আরগাভনে উপত্যকায়। সবুজ গাছগাছালির ডালে ডালে পাতার ফাঁকে ফাঁকে যদি হলুদ রঙের ফলপাকড়া ঝুলে থাকে দূর থেকে দেখতে কেমন দেখায় একটু ভাবলেই বোঝা যাবে। এর বাইরেও এখানে আরও সুন্দর সুন্দর অবকাশ যাপন কেন্দ্র রয়েছে।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। ইলাম শহর থেকে পঁচিশ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে 'এমা' নামে একটি বিনোদন কেন্দ্র। বসন্তে দেশি বিদেশি পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকে এখানে।  দূর থেকে একেবারে ফ্রেমে বাঁধানো ছবির মতো মনে হয় এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্যকে। এই এলাকাতেই আবার বেশ উঁচু এবং সুন্দর একটি ঝরনাও রয়েছে।অনন্য সাধারণ ওই ঝরনাটিকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে দু'পাশের বিচিত্র ফুল ও উদ্ভিদ। পাহাড়ি ডুমুর গাছ, আঙুর ইত্যাদি গাছ এই ঝরনার আশপাশের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।এই ঝরনা ছাড়াও সুন্দর সুন্দর আরও ঝরনা রয়েছে ইলামে। কাবির কুহ নামে একটি পাহাড় আছে ইলামের উত্তরে। ওই পাহাড়ের পাদদেশে তাখতন নামে একটি গ্রাম আছে। সেই গ্রামে উত্তর দিকে জাররিনাবাদ নামক এলাকায় মন কেড়ে নেয়া সুন্দর একটি ঝরনা আছে। ঝরনাটির নাম হলো 'চাপি-রস্তি'। ফার্সি এই শব্দটির অর্থ দাঁড়াবে বাম-ডান।গুহা, ফোয়ারা আর বাগ-বাগিচা মিলে যেরকম আকর্ষণীয় একটি দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে এখানে তা দেখলে ক্লান্ত শ্রান্ত যে-কোনো ভ্রমণকারীই ক্লান্তি ভুলে উজ্জীবিত, সজীব হয়ে উঠবেন।

ইলামের সালেহাবাদ এলাকায় জিনহাগন গুহাটিও বেশ মনোরম।এ কারণেই গুহাটিকে বেহেশত গুহা নামেও অভিহিত করা হয় স্থানীয়ভাবে। এখানকার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। গুহার ভেতরে রয়েছে চোখ ধাঁধানো বিস্ময়ের পর বিস্ময়।এ এলাকাতেই 'চামো' নামে গ্রামে পৌঁছার আগে আরেকটি ঝরনা পড়বে। গ্রামের নামেই ঝরনাটির নামকরণ করা হয়েছে চামো ঝরনা।বেশ উঁচু থেকে নেমে আসা এই ঝরনার পানি কিছুটা প্রবাহিত হওয়ার পর মিলে গেছে গুদারখোশ নদীর সঙ্গে। গ্রামের পথেই আরেকটু সামনে গেলে পাওয়া যাবে আরেকটি ঝরনা। এই ঝরনাটি মৌসুমি। বেশ উঁচুতে নতুন চাঁদ মানে হেলালের মতো বিরাট একটি পাথর বয়ে নীচে পড়ে এই ঝরনার পানি।ইলামের 'গাচন' এলাকাটিও সুন্দর।সবুজ গাছগাছালি পরিবেষ্টিত উপত্যকাময় এই এলাকাটির সৌন্দর্য সত্যিই বিরল। গাচন উপত্যকায় রয়েছে ঝরনা এবং ফোয়ারাও।এখানকার পানি এলাকাবাসী পান করে এবং কৃষিকাজ ও বাগবাগিচায় ব্যবহার করে।

ইলামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আসলে বর্ণনা করে শেষ করা কঠিন। এ নিয়ে কথা আর না বলে আমরা বরং ইলামের স্থাপত্য নিদর্শনের দিকে যাবার চেষ্টা করবো। স্থাপত্য নিদর্শনও এখানে প্রচুর। আমরা দু'একটির সঙ্গে পরিচিত হবার চেষ্টা করবো। ইলাম শহরে কাজার শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা হলো 'চোগা মিরাগ' কেল্লা। কেল্লার ভেতরে বিভিন্ন রুম ও বিভাগ রয়েছে। শাহের বসবাসের রুম, আয়নাকক্ষ, হারাম মানে সংরক্ষিত এলাকা যেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ, আবার বেজমেন্টে রয়েছে কারাকক্ষ। এই কেল্লার তিন প্রান্তে তিনটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। তবে দক্ষিণ দিকের গেটটিই প্রধান প্রবেশদ্বার। রয়েছে দুটি বারান্দা। এই বারান্দার মাধ্যমে কেল্লার ভেতরে আলো সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বারান্দা দুটোতে রয়েছে চমৎকার ইটের বিচিত্র কারুকাজ। বাদশার নির্ধারিত রুমে আয়নার অসামান্য কারুকাজ এবং প্লাস্টারিং চোখে পড়ার মতো। শাহী এ ভবনের বাইরের দেয়ালেও রয়েছে সিরামিকের অসাধারণ কারুকাজ।

'ফালোহাতি প্রাসাদ'ইলামি স্থাপত্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অপর একটি নিদর্শন। ইলাম প্রদেশের কৃষি সংস্থা কমপ্লেক্সের ভেতর এই প্রাসাদটি অবস্থিত।এ কারণে ভবনটি ফালোহাতি প্রাসাদ কিংবা কৃষি ভবন নামেও পরিচিতি লাভ করেছে। ইটের তৈরি সুন্দর ডিজাইনের এই ভবনটিতে রয়েছে কয়েকটি ঝুলবারান্দা এবং এগুলোর মাঝখানে রয়েছে বড় রকমের অভ্যর্থনা কক্ষ। আগে প্রাসাদের চার পাশ ঘিরে ছিল বাগ-বাগিচা। বর্তমানে শহরের উন্নয়নের সুবাদে সেসব মুক্তাঙ্গনে গড়ে উঠেছে ভবন এবং রাস্তা। যার ফলে আগেকার সেই শৌকর্য এখন আর নেই। সামগ্রিকভাবে বলা যায় যে ইলাম শহরটি দেখার মতো শহর। এক, দুই দিনে এই ইলাম শহর দেখে শেষ করা খুবই কঠিন কাজ। আর শুধু দেখলেই তো হবে না। এখানকার আবহাওয়া এবং সুন্দর পরিবেশ উপভোগ করতে হলে একটু লম্বা সময় নিয়ে যাওয়াই ভালো।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য