ডিসেম্বর ৩১, ২০১৯ ১৯:১৮ Asia/Dhaka

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান।

গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম পশ্চিম ইরানের চমৎকার প্রদেশ ইলামের আরগাভনে উপত্যকার দিকে।'এমা' নামে একটি বিনোদন কেন্দ্রেও গিয়েছিলাম। দূর থেকে একেবারে ফ্রেমে বাঁধানো ছবির মতো মনে হয় এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্যকে। এই এলাকাতেই আবার বেশ উঁচু এবং সুন্দর একটি ঝরনাও দেখেছি। অনন্য সাধারণ ওই ঝরনাটিকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে দু'পাশের বিচিত্র ফুল ও উদ্ভিদ। পাহাড়ি ডুমুর গাছ, আঙুর ইত্যাদি গাছ এই ঝরনার আশপাশের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়।

কাবির কুহ নামে একটি পাহাড় দেখেছি ইলামের উত্তরে। ওই পাহাড়ের পাদদেশে তাখতন নামের গ্রামটিও ছিল চমৎকার।সেই গ্রামের উত্তর দিকে জাররিনাবাদ নামক এলাকায় মন কেড়ে নেয়া সুন্দর একটি ঝরনা দেখেছি আমরা। ঝরনাটির নাম 'চাপি-রস্তি'। ফার্সি এই শব্দটির অর্থ দাঁড়াবে বাম-ডান। গুহা, ফোয়ারা আর বাগ-বাগিচা মিলে যেরকম আকর্ষণীয় একটি দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে এখানে তা দেখেই ক্লান্তি শ্রান্তি ভুলে উজ্জীবিত, সজীব হয়ে উঠেছিলাম আমরা।'ফালোহাতি প্রাসাদ' ইলামি স্থাপত্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি নিদর্শন। ইলাম প্রদেশের কৃষি সংস্থা কমপ্লেক্সের ভেতর এই প্রাসাদটি অবস্থিত হবার কারণে ভবনটি কৃষি ভবন নামেও পরিচিতি লাভ করেছে। আপনাদের নিশ্চয়ই ভালো লেগেছে। আজ আমরা যাবো ইলাম শহরের অপর একটি শহরের দিকে। এই শহরটির নাম দাররে শহর।

ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রতিটি শহরই ভিন্ন ভিন্ন রকমের আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এ কারণে শহরগুলোর প্রতি রয়েছে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা ও অন্যরকমের ভালো লাগা। শহরগুলোর রয়েছে বিশেষ রকমের প্রকৃতিও। রয়েছে ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন, হস্তশিল্প সামগ্রীসহ আরও বহু রকমের স্বাতন্ত্র্য। এসব কারণে ইরান ভ্রমণকারীরা পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলোকে বেড়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। এরকম শহরগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ অন্যান্য আকর্ষণীয় নিদর্শনের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো 'দাররে শাহর' বা উপত্যকা শহর। ইলাম শহর থেকে পশ্চিম দিকে অবস্থিত দাররে শাহরে।ঐতিহাসিক শহর সি-মারেহ যা মাদাকাতু নামেও পরিচিত এবং গভমিশন ব্রিজ-এই দুটি ঐতিহাসিক নিদর্শন কাবিরকূহ নামক পর্বতমালার মাঝে যেন মহা সমারোহে জ্বলজ্বল করছে।                                                                                    

কাবিরকূহ পাহাড়ের উচ্চতায় চমৎকার সবুজের সমারোহপূর্ণ উপত্যকার ভেতরে কোলাম নামের একটি এলাকা  রয়েছে।প্রচুর বাগ-বাগিচা রয়েছে এই পার্বত্য অঞ্চলটিতে, রয়েছে নদীও। প্রাকৃতিক এসব সৌন্দর্যের কারণে গ্রামীণ এই এলাকাটি ভ্রমণকারীদের কাছে আকর্ষণীয় একটি অবকাশ যাপন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানকার নদী কাবিরকূহ পাহাড় থেকে নির্গত ঝরনা থেকে উৎপত্তি হয়ে মন কেড়ে নেয়া সবুজের দৃশ্যাবলি পেরিয়ে সি-মারেহ নদীতে গিয়ে মিশে গেছে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের বাইরেও আরও দুটি কারণে এই এলাকাটি ঐতিহাসিক ও পবিত্র মর্যাদা পেয়েছে। একটি হলো এখানে রয়েছে সাসানি আমলের প্রাচীন কেল্লা এবং অগ্নিমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। আরও রয়েছে জাবের ইবেনে অঅনসারি এবং সাইয়্যেদ তাজ উদ্দিনের পবিত্র মাজার। মাজারের কারণে শুধু জিয়ারতের উদ্দেশ্যেও প্রচুর লোকজন এখানে আসে।

দাররে শাহরের পশ্চিম এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক এবং বৃহত্তম একটি এলাকা রয়েছে। ওই এলাকাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। আরও রয়েছে প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক কিছু নিদর্শনও। এসবের কারণে এলাকাটির সৌন্দর্য আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। মাদাকাতু নামে পরিচিত ঐতিহাসিক সি-মারেহ শহরটির ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ইতিহাসবিদদের মতে লোরেস্তানের এই পার্বত্য অঞ্চলটিতে ইলামিদের শাসোধীনে ছিল। ইলামিরা বিশাল বিস্তৃত অঞ্চলের ওপর তাদের শাসনাধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই সি-মারেতেই তারা তাদের দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং নাম দিয়েছিল মাদাকাতু। হাখামানেশিয়দের শাসনামলে এই শহরটির কোনো খবরই ছিল না। তবে সাসানীয় শাসনামলে পুনরায় এই শহরটি তার প্রাচীন ঐশ্বর্য ফিরে পায়।

বর্তমানে এই শহরের ধ্বংসাবশেষের ভেতরও সাসানীয় আমলের শহর নির্মাণরীতি লক্ষ্য করা যায়। এই কমপ্লেক্সের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ছিল। ছিল রাস্তাঘাট, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং পয়োনিষ্কাষণ ব্যবস্থাও। ধ্বংসাবশেষের ভেতরে ভেতরে পাথরের স্তরে স্তরে পা রাখলে বুঝতে পারা যাবে জ্যামিতিক গঠনে কতোটা সুশৃঙ্ক্ষলভাবে বিশেষ নির্মাণশৈলীতে তৈরি করা হয়েছে স্থাপনাগুলো। ভাবনার পর্দায় ভেসে উঠবে এখানে এই কলধ্বনিময় প্রবাহমান জলের নদী সি-মারের তীরে গড়ে উঠেছিল একটি শহর। এই এলাকায় ঘোরাফেরা করে পরিচিত হওয়া যাবে তুলনামূলকভাবে কম ধ্বংস হওয়া ঐতিহাসিক শহরের অংশের সাথেও। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে এভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে: একটি জলটৈটুম্বুর প্রবাহমান নদী বিশাল একটি প্রান্তর পেরিয়ে গেছে। এই প্রান্তরে রয়েছে কয়েকটি ছোট-বড় টিলাও। সেই টিলাগুলো আবার বিচিত্র রঙের ফুলেফুলে এবং উদ্ভিদে পরিপূর্ণ। কল্পচোখে একবার দেখলেও মনটা জুড়িয়ে যাবে।

চোখ মন জুড়ানো রঙ বেরঙের ফুল আর উদ্ভিদে সুসজ্জিত টিলাময় প্রান্তর হয়ে বহমান নদীর সৌন্দর্যের কথা বলছিলাম। রোদের ভেতর শহরের প্রাচীন এলাকায় ঘুরতে ঘুরতে বুঝতে পারা যাবে প্রকৃতির সৌন্দর্যঘেরা শহর দেখতে কতোটা মনোরম। প্রাচীন এই শহরে যেসব নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেছে সেসবের মধ্যে একটি মসজিদ রয়েছে। ওই মসজিদটিকে মাটির ভেতর থেকে আবিষ্কার করা হয়েছে। ওই মসজিদের বিশেষত্ব হলো এটি তৈরি করা হয়েছে পাথর এবং চুনাচক দিয়ে। মসজিদের শাবেস্তান এবং ঝুল বারান্দাও চকের কারুকাজে এতোটাই মনোরম এবং চিত্তাকর্ষক করা হয়েছে যে ওই শহরে গেলে না দেখে আসাটা হবে চরম ভুল।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/৩১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

মন্তব্য