জানুয়ারি ১৪, ২০২০ ১৯:৫৯ Asia/Dhaka

আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান।

গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম পশ্চিম ইরানের চমৎকার প্রদেশ ইলামের দাররে শাহরের দিকে। সেখানে আমরা দেখেছি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন, হস্তশিল্প সামগ্রীসহ আরও বহু রকমের স্বাতন্ত্র্য। এসব কারণে ইরান ভ্রমণকারীরা পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলোকে বেড়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।এরকম শহরগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ অন্যান্য আকর্ষণীয় নিদর্শনের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো 'দাররে শাহর' বা উপত্যকা শহর।ঐতিহাসিক শহর সি-মারেহ মাদাকাতু নামেও পরিচিত। গভমিশন ব্রিজটিও যেন ঐতিহাসিক নিদর্শন কাবিরকূহ নামক পর্বতমালার মাঝে যেন মহা সমারোহে জ্বলজ্বল করছে।

প্রাচীন এই শহরে যেসব নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেছে সেসবের মধ্যে একটি মসজিদও রয়েছে। ওই মসজিদটিকে মাটির ভেতর থেকে আবিষ্কার করা হয়েছে। ওই মসজিদের বিশেষত্ব হলো এটি তৈরি করা হয়েছে পাথর এবং চুনাচক দিয়ে। মসজিদের শাবেস্তান এবং ঝুল বারান্দাও চকের কারুকাজে এতোটাই মনোরম এবং চিত্তাকর্ষক করা হয়েছে যে ওই শহরে গেলে না দেখে আসাটা হবে চরম ভুল। যাই হোক এতোসব সৌন্দর্যের বাইরেও এখানে রয়েছে সি-মারেহ নদী। ওই নদীর উপরে রয়েছে পোলে গভমিশন নামে অসম্ভব সুন্দর,কারুকার্যময় একটি স্থাপত্য নিদর্শন। পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের সবচেয়ে বড়, প্রাচীনতম এবং ঐতিহাসিক একটি ব্রিজ এই গভমিশন। এই  ব্রিজ নিয়েই আজকের আলোচনার সূচনা করা যাক।

গভমিশন ব্রিজটি আগের মতো আর নেই। প্রাচীন ঐশ্বর্য অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। তবে অস্তিত্বটা এখনও বজায় রেখেছে। দেড় হাজার বছরের পুরোনো এই ব্রিজটির দৈর্ঘ এক শ আটষট্টি মিটার আর চলাচলের উপযোগী প্রস্থের পরিমাণ আট মিটার। বর্তমানে ব্রিজের নীচের ছয়টি ধারা এখনও অবশিষ্ট রয়েছে। এই ব্রিজটি তৈরি করতে যেসব নির্মাণ উপাদান-উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে সেসবের মধ্যে রয়েছে পাথরকুচি, ইট, পাথরের ব্লক, চক প্লাস্টার ইত্যাদি। এই স্থাপনার সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপারটি হলো পানি প্রবাহের সুবিধার জন্য ব্রিজের নীচের পিলারগুলোকে ডিম্বাকৃতিতে তৈরি করা হয়েছে।

দাররে শাহর সফরে গেলে বাহরাম চুবিন প্রণালী না দেখে আসা ঠিক হবে না। কাবির কূহের উচ্চতায় বিশাল বিশাল পাথরের মধ্যবর্তী স্থান এই প্রণালীটির মূল উৎস। এটি ছিল একটি সামরিক স্থাপনা মানে দূর্গ। এই দূর্গের -যাকে চুবিন কেল্লাও বলা হয়- দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ বিচিত্র সামরিক নিদর্শনে ভরপুর। বাহরাম চুবিন নামে অভিহিত করার পেছনে একটি কারণ রয়েছে। তা হলো খসরু পারভেজের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের সময় এই প্রণালীতে ঢুকে আশ্রয় নিয়েছিল বাহরাম চুবিন। তার সেই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি ধরে রাখার স্বার্থেই এরকম নামকরণ। এই সামরিক প্রণালীটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন শত্রুরা কোনোভাবেই কিংবা খুব সহজে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।

বিস্ময়ের ব্যাপার হলো পাহাড়ের উচ্চতায় বিশাল বিশাল পাথরের ওপর কী করে এরকম মজবুত এবং সুউচ্চ দেয়াল তৈরি করা হয়েছে। যেখানে ওই পাহাড়ের উপরে পাথর পর্যন্ত পৌঁছানোটাই খুবই কঠিন ব্যাপার ছিল। দুর্গম ওই দুর্গের ভেতরে আবাসিক একটি কমপ্লেক্সও তৈরি করা হয়েছে। এটা শাহের আবাসের জন্য। সেখানে তাই পানির হাউজও বানানো হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে টাওয়ারও। বাহরাম চুবিন প্রণালিতে বহু মূল্যবান অনেক সম্পদ রয়েছে। বিশেষ করে এর প্রবেশদ্বার এবং তার উপর অংশে। এখানকার আরেকটি কেল্লার কথা বলা দরকার। এ কেল্লাটি তৈরি করা হয়েছে পাথর এবং চুনাচক দিয়ে। কেল্লাটি সাসানীয় শাসনামলের। কাবির কূহ নামক বনাঞ্চলের অনেক উচ্চতায় একেবারে প্রণালীর গভীরে এবং দুর্গম একটি এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে এই দূর্গটি। এটিকে বাহরাম চুবিনের শিকারের স্থানও বলা হয়। বনাঞ্চল হবার কারণে এখানে বিচিত্র পশুপাখিও বাস করে। আর বাহরাম তাই সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এখানে শিকার করতেন।

বাহরাম যে রুচিবান ছিলেন তা বোঝা যায় এখানকার পরিবেশের কথা ভাবলে। তিনি যেহেতু এখানে বসবাস করতেন এবং শিকার করতেন তাই এখানকার পরিবেশটাকে নিরাপদ এবং উপভোগ্য করে তোলার সকল আয়োজনই করেছিলেন। বিশেষ করে বিপদের সময় এখানে যেন নিরাপদে আশ্রয় নেয়া যায় এবং সেই সময়টায় যেন কোনো প্রকার সমস্যা না হয় এমনকি বিনোদনের জন্যও সেরকমভাবেই তিনি সবকিছু তৈরি করে নিয়েছিলেন। দাররে শাহর হলো ঝরনার শহর। অসংখ্য ঝরনা রয়েছে এই শহরে।দাররে শাহর মহাসড়ক ধরে পোলদোখতারের দিকে বিশ কিলোমিটার এগিয়ে গেলে একটি ঝরনা পড়বে সুন্দর। এই ঝরনার নাম হলো মর্‌বারেহ ঝরনা। ঝরনাটি বড় বড় বেশ কিছু গাছের মাঝখানে। সারা বছর ধরেই এই ঝরনার পানি পড়তে থাকে সমান গতিতে। বিশেষ করে বসন্তের সময় পানির পরিমাণটা একটু বেড়ে যায়। যারা ঝরনা ভালোবাসেন কিংবা এরকম প্রকৃতির প্রতি অনুরাগী তারা এই ঝরনাটি দেখলে খুব মজা পাবেন। দাররে শাহরের অর্থনীতি কৃষিকাজ, বাগ-বাগিচা তৈরি, পশুপালন ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে। এখানকার পণ্য বিভিন্ন শহরেও রপ্তানি করা হয়।

বন্ধুরা! দাররে শাহরে এতো বিচিত্র দর্শনীয় বিষয় আশয় রয়েছে যে দু'একদিনে দেখে শেষ করার মতো নয়। বিশেষ করে এখানকার প্রকৃতি যতই উপভোগ করবেন ততই আপনার ভালো লাগবে। শেষ করবো একথা বলে যে বেড়াতে গেলে এখানকার চমৎকার সব প্রকৃতি ও নিদর্শনের ছবি তুলতে ভুলবেন না। হাতে আমাদের আজ আর সময় নেই। ইলাম প্রদেশের দাররে শাহর ঘুরে বেড়ানো এখনো শেষ করা সম্ভব হলো না। তারপরও শেষ করতেই হচ্ছে। এ যেন শেষ হয়েও হইলো না শেষ। পরবর্তী আসরে চেষ্টা করবো অন্য কোনো শহরে অন্য কোনোদিকে যেতে। আপনারা যথারীতি সঙ্গেই আছেন আমাদের।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/১৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য