জানুয়ারি ১৭, ২০২০ ২১:৩২ Asia/Dhaka

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি'র কুদস ফোর্সের প্রধান শহীদ লে. জেনারেল কাসেম সোলাইমানির জন্য গোটা ইরান জুড়ে মানুষের মধ্যে শোক ও ক্ষোভ তীব্র এখনও একটুও কমেনি। মার্কিন সন্ত্রাসী ঐ হামলার ঘটনার পর ইরানও কঠোর জবাব দিয়েছে।

Image Caption

সর্বশেষ গত ৮ জানুয়ারি বুধবার ভোরে ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইরান বলেছে, শহীদ জেনারেল সোলাইমানি হত্যার প্রতিশোধ এবং জাতিসংঘ সনদের ৫১ ধারা অনুসারে তারা আত্মরক্ষার্থে হামলা চালিয়েছে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময় বুধবার সকালে দেয়া ভাষণে পূর্বের হুমকীর নীতি থেকে সরে ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলেছে। ইরান-মার্কিন উত্তেজনার সবশেষ পরিস্থিতি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের সাবেক মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অন্য কোনো রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করা ও তাদের কাউকে হত্যা করা আমেরিকার প্রকাশ্য নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, সারা বিশ্বব্যাপী যে গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তি রয়েছে তাদের ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ ও ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস কার্যত মার্কিনিদের প্রতিরোধে মূল ভূমিকা পালন করতে পারে। মেনন বলেন, আমেরিকা আসলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুদ্ধ বাধানোর চেস্টা করছে। তাদের ফাঁদে আমরা পা দেব কি না সেটি ভাববার বিষয়। কারণ এই যুদ্ধ বিস্তৃত হয়ে পড়বে সমস্ত অঞ্চলে।

শহীদ জেনারেল সোলাইমানি হত্যার দায় পুরোটাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের

বিশিষ্ট এই রাজনীতিবিদ বলেন, জেনারেল সোলাইমানি হত্যার সম্পূর্ণ দায় দায়িত্ব ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ট্রাম্প কেবলমাত্র পাগলাটে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে শুধু এমনটি নয়; সে প্রকাশ্যে উন্মাদের মতো আচরণ করছে। কারণ জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার মধ্য দিয়ে সমস্ত অঞ্চলকে যে যুদ্ধের বিপদের মধ্যে ঠেলে দেয়া হলো; এর পরিণতি পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

লে. জেনারেল শহীদ কাসেম সোলাইমানি

রেডিও তেহরান: জনাব রাশেদ খান মেনন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের কুদস ব্রিগেডের কমান্ডার জেনারেল সোলোইমানিকে মার্কিন বাহিনী হত্যা করেছে এবং এ ঘটনার আপনি কঠোর ভাষায় নিন্দা এবং প্রতিবাদ করেছেন। কাসেম সোলায়ইমানি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে অনেকে আমেরিকার স্বাভাবিক নীতি বলে মন্তব্য করেছেন। মার্কিন বাহিনীর এই বর্বরতাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

রাশেদ খান মেনন: দেখুন, আমরা সব সময় বলেছি যে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অব্যাহত রাখতে  বা তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যেকোনো ধরনের পথ তারা অবলম্বন করে থাকে। তারমধ্যে আমরা সম্প্রতি দেখলাম ইরানের আইআরজিসি'র কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল সোলাইমানিকে তারা প্রকাশ্যে হত্যা করল। এরবাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রনায়ক বা তাদের সহযোগিদেরকে হত্যা করেছে কিংবা হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে। কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে ১৯ বারের মতো হত্যার চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়ককে তারা হত্যা করেছে। আর এসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে আমেরিকার সিআইএ এ বিষয়টি বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে এসেছে।

বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পেছনে তাদের হাত ছিল বলে আমরা জানি। ৯/১১ আগে এতটা প্রকাশ্যে হত্যা বা অন্য রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপের বিষয়টি ছিল না। কিন্তু বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করছে। কাউকে হত্যা করাও তাদের অধিকার বলে মনে করে। যেমন তারা ইরাকের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগে যুদ্ধ বাঁধিয়েছিল। সিরিয়াতে তারা একইভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। অতএব আমি বলব এধরনের হস্তক্ষেপ ও হত্যার নীতি মাকিনিদের কাছে স্বাভাবিক নীতি এবং তারচেয়েও নিকৃষ্ট হচ্ছে এটি এখন তাদের প্রকাশ্য নীতি হিসেবে মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়েছে।

রেডিও তেহরান:  জনাব মেনন, কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব থেকে যে আওয়াজ উঠেছে সেটি হচ্ছে যে, এর প্রতিশোধ নিতে হবে। আর ইরান এরইমধ্যে ইরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। তো আপনি এ বিষয়ে কি বলবেন?

রাশেদ খান মেনন: দেখুন, আমি মনে করি যে সারা বিশ্বব্যাপী যে গণতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তি রয়েছে তাদের ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ ও ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস কার্যত মার্কিনিদের প্রতিরোধে মূল ভূমিকা পালন করতে পারে। আর ইরানের বিষয়ে আমি বলব যে, তারা এরইমধ্যে তাদের পদক্ষেপ নিয়েছে এবং নিচ্ছে। তবে আমি বলব, আমেরিকা আসলে এই অঞ্চলে যুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা করছে। তাদের ফাঁদে আমরা পা দেব কি না সেটি ভাববার বিষয়। কারণ এই যুদ্ধ বিস্তৃত হয়ে পড়বে সমস্ত অঞ্চলে। আমাদের দেশও তার থেকে বাইরে থাকবে না। সুতরাং আমি মনে করি যে, আমাদের চেষ্টা হবে জনশক্তিকে নিয়ে জনগণের প্রতিরোধের মাধ্যমে এর প্রতিকারে এগিয়ে যাওয়া। আত্মরক্ষার জন্য আমাদেরকে জনগণের প্রতিরোধকামীতাকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আর এরমাধ্যমে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করা সম্ভব।

মার্কিন সিনেটর র‍্যান্ড পল

রেডিও তেহরান: জনাব রাশেদ খান মেনন, মার্কিন সিনেটর র‍্যান্ড পল বলেছেন, “কাসেম সোলায়মানিকে হত্যার মধ্যদিয়ে প্রকৃতপক্ষে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার কূটনীতির মৃত্যু ঘটেছে। পাশাপাশি এ সিনেটর বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা জন বোল্টনের পরামর্শে জেনারেল সোলায়মানিকে হত্যা করা হয়েছে।” এ দুটি বক্তব্যকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

রাশেদ খান মেনন: আমি মনে করি কূটনীতির পথ আমেরিকা বন্ধ করে দিয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। বোল্টনের মতো লোক আমেরিকায় প্রচুর রয়েছে যারা এই ধরনের আচরণে অভ্যস্ত। আমি এখানে আমেরিকার শুধু একজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করতে চাইনে; আমি মনে করি এখানে সম্পূর্ণ দায় দায়িত্ব ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ট্রাম্প কেবলমাত্র পাগলাটে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে শুধু এমনটি নয়; সে প্রকাশ্যে উন্মাদের মতো আচরণ করছে। কারণ জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার মধ্য দিয়ে সমস্ত অঞ্চলকে যে  যুদ্ধের বিপদের মধ্যে ঠেলে দেয়া হলো; এর পরিণতি পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এসব আশঙ্কার বিষয়টি তারা বিচার করে নি। পৃথিবী বর্তমানে পারমাণবিক যুদ্ধের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষার জন্যও রয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আর সেই জায়গা থেকে ট্রাম্পের উন্মাদ আচরণ গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে। আমরা মনে করি গণ প্রতিরোধের মাধ্যমে এর প্রতিকারে এগোতে হবে।

আমরা আনন্দিত যে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ৭০ টির বেশি শহরে এ বিষয়ে বিক্ষোভ হয়েছে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নিতে হবে ইরাক থেকে

রেডিও তেহরান: ইরাকসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা বহিষ্কারের দাবি উঠেছে এবং ইরাকের কোনো কোনো রাজনীতিবিদ এরইমধ্যে দাবি তুলেছেন যে, আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে এবং ইরাকে মার্কিন দূতাবাস বন্ধ করে দিতে হবে। এসব দাবিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রেডিও তেহরান: দেখুন, আপনারা হয়ত লক্ষ্য করে থাকবেন যে, ঢাকাতে আমাদের ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে জেনারেল সোলাইমানি হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করা হয়েছে। আমরা ওই প্রতিবাদ বিক্ষোভের সময় স্পষ্টভাবে বলেছি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সবরকম সামরিক চুক্তি, অস্ত্র চুক্তি বা প্রতিরক্ষার ব্যাপারে যেকোনো ধরনের লেনদেন বন্ধ করতে হবে। তাদের সাথে এসব চুক্তি বা লেনদেনের অর্থ কেবলমাত্র বিভিন্ন জায়গায় আমেরিকার হস্তক্ষেপের পথকে প্রশস্ত করবেই না শুধু তাদের যুদ্ধ অর্থনীতিকে সহযোগিতা করা হবে। অতএব মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে যে দাবি উঠেছে আমেরিকার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে এবং ইরাকে মার্কিন দূতাবাস বন্ধ করে দিতে হবে-আমি মনে করি তাদের ওই দাবি ও সিদ্ধান্ত যৌক্তিক এবং তাদের দাবিকে স্বাগত জানাই।  

রেডিও তেহরান: জনাব রাশেদ খান মেনন, সর্বশেষ আমরা যে বিষয়টি আপনার কাছ থেকে জানতে চাই সেটি হচ্ছে- কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কি হওয়া উচিত?

রাশেদ খান মেনন: দেখুন, বাংলাদেশ সবসময় শান্তির পক্ষে ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে। একইসাথে অন্য দেশে হস্তক্ষেপের বিরোধী। ইরানের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সুসম্পর্ক রয়েছে। আমরা মনে করি কোনো দেশ যে পথ বা নীতি অনুসরণ করুক না কেন তাদের নিজ দেশের পরিচালনার অধিকার তাদের রয়েছে। আমি মনে করি ইরান-মার্কিন বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও স্পষ্ট করা উচিত। আমাদের নীতিগত ও সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে আমরা যেন চলি। আমরা বাংলাদেশের সরকারকে সে পরামর্শ দিয়েছি।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/১৭

 

 

ট্যাগ

মন্তব্য