জানুয়ারি ২৩, ২০২০ ১৭:৩০ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা কাশ্মির অঞ্চলে ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির ধর্ম-প্রচারমূলক তৎপরতাসহ নানা তৎপরতা ও এসবের প্রভাব সম্পর্কে কিছু কথা বলেছি।

কাশ্মির অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম ও ফার্সি ভাষা এবং সাহিত্যের বিস্তারে মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি ও তার সুযোগ্য ছাত্রদের অবদানের কথা প্রখ্যাত কোনো কোনো লেখকের বর্ণনায়ও উঠে এসেছে। এ অঞ্চলসহ নানা অঞ্চলে সাইয়্যেদ আলী হামেদানি ও তার সুযোগ্য ছাত্রদের বংশধর তথা পরবর্তী প্রভাবশালী প্রজন্ম আজও সক্রিয় রয়েছে।

অনেক ঐতিহাসিক ও গবেষক মনে করেন ভারত উপমহাদেশ এবং কাশ্মিরে বেশ কিছু শিল্পের প্রচলন ও বিকাশ সাইয়্যেদ হামেদানি ও তার সুযোগ্য ছাত্রদের শিল্প-সাধনার কাছে ঋণী। আমরা আরও জেনেছি হামেদানি তার সুফি-তাত্ত্বিক চিন্তাধারা ও শিক্ষা বর্ণনায় গাজ্জালি, আত্তার, রুমি, সা'দী ও শাবিস্তারির মত খ্যাতনামা আরেফ বা সুফি-সাধকদের চিন্তাধারা এবং রচনা ব্যবহার করেছেন।

সাইয়্যেদ আলী হামেদানি কাশ্মিরের আলেম, পর্যটক এবং বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মসহ অন্য ধর্মের সন্ন্যাসী বা পুরোহিতদের সঙ্গে আলোচনা ও বিতর্কে অংশ নিতেন। এসব বিতর্কে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি বিজয়ী হতেন।

সাইয়্যেদ আলী হামেদানি কাশ্মিরে মোট পাঁচ বছর ছিলেন।  এ সময় তার হাতে তিন হাজার ৭০০ ব্যক্তি মুসলমান হন। তার অসাধারণ সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাবের কারণে এ অঞ্চলে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। হামেদানি এ অঞ্চলের জনগণকে ইসলামের প্রতি এত গভীর অনুরাগী করতে সক্ষম হন যে তারা নিজ উপাসনালয়গুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন এবং ঐসব উপাসনালয়ের জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করতেন। তারা সাইয়্যেদ হামেদানির সঙ্গীদের দাওয়াত দিয়ে আনতেন যাতে তারা নব-নির্মিত মসজিদগুলোতে আযান দেন এবং সেইসব মসজিদকে চালু করেন।

স্থানীয় শাসকরা হামেদানির আদেশ-নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন এবং তার প্রচারমূলক ও শিক্ষামূলক তৎপরতা সব সময়ই ছিল খুব বরকতময়।

ভারতের বিখ্যাত হিন্দু আর বৌদ্ধ জাদুকর ও যোগী-সন্ন্যাসীরা সাইয়্যেদ হামেদানির সঙ্গে বিতর্কের সময় তার যৌক্তিক বক্তব্য এবং নানা কারামাত বা অলৌকিক ঘটনা দেখে স্বেচ্ছায় মুসলমান হয়ে যেতেন। আর এসব বিষয় সাধারণ জনগণের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। প্রজ্ঞা ও ধার্মিকতার জন্য খ্যাত সাইয়্যেদ হামেদানির এসব সাফল্যের পটভূমিতে কাশ্মির অঞ্চলে শিয়া মুসলিম মাজহাবেরও ব্যাপক বিকাশ ঘটে বলে মনে করা হয়।  

সাইয়্যেদ আলী হামেদানি সব সময়ই ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিন্তাধারার বিষয়ে জনগণের সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাদেরকে উপদেশ দিতেন। তিনি নৈতিক নানা বিষয় খুব সুমিষ্ট ও আকর্ষণীয় ভাষায় তুলে ধরতেন। উপস্থিত জনগণের প্রতিভা ও জ্ঞানগত ধারণ-ক্ষমতার আলোকে সহজ সরল ভাষায় বক্তব্য রাখতেন তিনি। ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি তিনি এ অঞ্চলে ফার্সি ভাষারও প্রচলন করতে সক্ষম হন। কাশ্মির অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রের উন্নয়নে হামেদানির প্রচার কাজ ও তৎপরতা ফার্সি ভাষার কাছে ঋণী।  ইসলাম ও ফার্সি ভাষার পারস্পরিক এই প্রভাবের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে আছে কাশ্মির। কাশ্মিরকে বলা হত ক্ষুদ্র ইরান এবং হামেদানিকে বলা হয় 'কাশ্মিরের হাওয়ারি'। হযরত ঈসার (সা) সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কয়েক জন সঙ্গীকে বলা হত হাওয়ারি। 

যদিও ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কাশ্মিরে ফার্সি ভাষার প্রচলন হয়েছিল অনেক দেরিতে কিন্তু তা সত্ত্বেও এ অঞ্চলের ফার্সি-ভাষী কবি ও লেখকদের সংখ্যা ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি।

প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ সাইয়্যেদ আলী হামেদানি ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য কাশ্মির অঞ্চলে গড়ে তুলেছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা এ প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হত হামেদানির নিখুঁত  নজরদারিতে। এখানে ধর্ম-প্রচারক এবং ওয়াজকারীদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হত। এরপর তাদেরকে পাঠানো হত বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণের কাছে যাতে তারা পবিত্র কুরআন ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)'র পবিত্র আহলে বাইতের শিক্ষার  সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।

জম্মু ও কাশ্মির অঞ্চলে সাইয়্যেদ আলী হামেদানির সেবামূলক তৎপরতাসহ নানা ধরনের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান। এ অঞ্চলের প্রথম ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা মাদ্রাসা গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সুলতান শাহাবুদ্দিন মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানির পরামর্শে এ অঞ্চলে পবিত্র কুরআন শিক্ষার একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান তথা মাদ্রাসা গড়ে তোলেন। কাশ্মিরের নানা অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিতেন। হামেদানির সবচেয়ে ভালো ছাত্র ও তার হাতে গড়ে ওঠা চিন্তাবিদ বা আলেমরা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এই মাদ্রাসায়। হামেদানির অনুরোধেই সুলতান কুতুবউদ্দিন কাশ্মির অঞ্চলে একটি বড় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পূর্বোক্ত মাদ্রাসায় যেসব বিষয় শেখানো হত না এখানে শিক্ষা দেয়া হত  সেইসব বিষয়।

সাইয়্যেদ মীর হামেদানি কাশ্মিরে গড়ে তুলেছিলেন একটি লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরিতে ছিল ইসলামী নানা জ্ঞানের উৎস-বিষয়ক আরবি ও ফার্সি ভাষায় লেখা অনেক বই। বড় বড় পণ্ডিত ও শাসকরা এ লাইব্রেরি ব্যবহার করতেন।

সাইয়্যেদ হামেদানির লেখা অনেক ফার্সি কবিতা ও গজলের অংশ বিশেষ উৎকীর্ণ করা হয়েছিল কাশ্মিরের নানা মসজিদ ও মাদ্রাসায়। এসবই ভারত উপমহাদেশে  এই মহান সাইয়্যেদের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করছে। আমরা আগেই বলেছিলাম যে হামেদানির লেখা বইয়ের সংখ্যা ১১০টিরও বেশি। সাহিত্য, নৈতিকতা, দর্শন, ইরফান ও ইসলামী নানা জ্ঞান তুলে ধরা হয়েছে এসব বইয়ে।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ

মন্তব্য