জানুয়ারি ২৩, ২০২০ ১৭:৩৬ Asia/Dhaka

সুরা তাকাসুর পবিত্র কুরআনের ১০২ তম সুরা। মক্কি এ সুরায় রয়েছে ৮ আয়াত। এই সুরায় মহান আল্লাহ সন্তান-সন্ততি ও ধনসম্পদের মত ধ্বংসশীল বিষয় নিয়ে গর্ব করার বিষয়ে মানুষকে তিরস্কার করেছেন।

এ ছাড়াও এসব সম্পদের অধিকারী হওয়ার কারণে আল্লাহ, ধর্ম ও পরকাল সম্পর্কে উদাসীন হওয়া, প্রত্যেক ব্যক্তিকে দোজখ প্রদর্শন, নিয়ামতের বিষয়ে হিসাব গ্রহণ ইত্যাদির কথা উল্লেখ করেছেন মক্কায় নাজিল হওয়া এই সুরায়। বলা হয় বনী আব্দে মানাফ ও বনী সাহম একবার নিজেদের মধ্যে বিতর্কে নিজ নিজ বংশ এবং ধনাধিক্যের প্রতি গর্ব করছিল। আর তখনই এ আয়াত নাজিল হয়েছিল। এবারে এই সুরার অনুবাদ শোনা যাক:                                                  

অসীম দয়াময় ও অনন্ত করুণাময় আল্লাহর নামে

(১) ধন ও সন্তানের আধিক্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের অমনোযোগী করে রাখে, (২) যতক্ষণ না তোমরা কবরের সম্মুখীন হও ও কবরের সংখ্যা গুণে গর্ব প্রকাশ কর! (৩) দেখ, তোমারা অবিলম্বে জানতে পারবে; (৪) আবার বলি, তোমরা উত্তমরূপে জানতে পারবে। (৫) তোমাদের নিশ্চিত জ্ঞান থাকলে তোমরা কখনও অমনোযোগী হতে না। (৬) তোমরা তো জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করবেই; (৭) আবার বলি, তোমরা তা চাক্ষুষ প্রত্যয়ে প্রত্যক্ষ করবেই, (৮) এরপর তোমাদেরকে দেয়া নিয়ামতগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।

- এ সুরার নামকরণ 'তাকাসুর' হয়েছে সুরাটির প্রথম বাক্যের আততাকাসুর শব্দটি থেকে। এই তাকাসুর শব্দটির অর্থ প্রাচুর্য বা আধিক্য।

ইসলাম-পূর্ব যুগে তথা অজ্ঞতার যুগে আরবদের মধ্যে নানা বিষয়ে গর্ব ও অহংকার প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা হত। কোনো কোনো গোত্র গর্ব প্রদর্শনের জন্য নিজ নিজ গোত্রের জনসংখ্যার আধিক্য ও সম্পদের প্রাচুর্যের কথা তুলে ধরত। এমনকি নিজ নিজ গোত্রের মৃত ব্যক্তিদের সংখ্যা তুলে ধরার জন্য তারা গোরস্তানে যেত ও মৃত লোকদের কবরের সংখ্যা গণনা করত।

সুরা তাকাসুরের প্রথম দুই আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, (১) ধন ও সন্তানের আধিক্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের অমনোযোগী করে রাখে, (২) যতক্ষণ না তোমরা কবরের সম্মুখীন হও ও কবরের সংখ্যা গুণে গর্ব প্রকাশ কর! –আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ) এ দুই বাক্য তিলাওয়াতের পর বলেছেন: কি বিস্ময়কর! কত ব্যাপক দূরবর্তী লক্ষ্য ও কেমন উদাসীন কবর জিয়ারতকারী! কত কাল্পনিক বা অলীক ও বেদনাদায়ক অহংকার! বহু বছর আগে মৃত ব্যক্তিদের পঁচে যাওয়া হাড়কে স্মরণ করা হচ্ছে! এত বছর পর মৃতদের এভাবে স্মরণ করার মাধ্যমে কারো কোনো উপকার বা লাভও হচ্ছে না!

আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ) আরও বলেছেন: তোমরা কি তোমাদের পূর্বপুরুষদের ধ্বংস হওয়ার স্থান বা কবর নিয়েও গর্ব করছ? অথবা তোমরা কি তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের সংখ্যা গুণে নিজেদের বিপুল সংখ্যক বলে ভাবছ? ... পঁচে যাওয়া এইসব লাশ যদি হয় শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যম তাহলে তা-ই হবে গর্ব করার চেয়ে বেশি যৌক্তিক বা শোভনীয়।  

তাকাসুর শব্দটি এসেছে কাসরাত শব্দটি থেকে যার অর্থ হল সম্পদ বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা ও বড়াই করা। অজ্ঞতা হচ্ছে তাকাসুরের উৎপত্তির অন্যতম প্রধান উৎস। খোদায়ি শাস্তি ও পুরস্কার সম্পর্কে অজ্ঞতা তাকাসুরের উৎস। পরকালে অবিশ্বাসও তাকাসুর তথা সম্পদ বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা ও বড়াইয়ের অন্যতম প্রধান চালিকা-শক্তি। মানুষের বহু দুর্বলতা ও ক্ষতির উৎস হল তাদের অজ্ঞতা। মানব সৃষ্টির উৎস ও তাদের পরিণতি সম্পর্কে অজ্ঞতাও তাদের অহংকার ও বড়াই করার মানসিকতার চাবিকাঠি। আর এইসব অহমিকা ও দম্ভকে চূর্ণবিচূর্ণ করতেই পবিত্র কুরআনে দাম্ভিক ও খোদাদ্রোহী জাতিগুলোর পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে।

অতীতের বহু জাতি বহু সম্পদ ও ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তুফান, বজ্রপাত, ভূমিকম্প ও বৃষ্টি-বন্যার মত খুব সাধারণ প্রতিকূলতার শিকার হয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। অহমিকা ও বড়াইয়ের আরেকটি কারণ হল নানা দুর্বলতা ও পরাজয়গুলোর ফলে সৃষ্ট অসম্মানবোধ আল গ্লানি ধামাচাপা দেয়া। হযরত ইমাম সাদিক্ব (আ) বলেছেন, ‘নিজের মধ্যে অসম্মান দেখতে না পেলে কেউই অহমিকা দেখাত না।’ তাই মানুষ যদি এটা অনুভব করে যে সে পূর্ণতায় পৌঁছে গেছে তাহলে সে অহমিকার আশ্রয় নেয়ার কোনো দরকারই অনুভব করে না।  

কেউ কেউ তাকাসুর বলতে অর্থ-সম্পদ সঞ্চয় করা ও বেশি পাওয়ার লোভ বা ইচ্ছাকেও বুঝিয়ে থাকেন। মহানবী (সা) আলহাকুমুত্তাকাস্সুর –বাক্যটির অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘মানুষ বলে, আমার সম্পদ! আমার সম্পদ! অথচ তোমার সম্পদ শুধু তা-ই যা তুমি খাও, যে পোশাক তুমি পর ও যে সদকা তুমি আল্লাহর রাস্তায় দান করে থাক।’ আমরা একটু চিন্তা করলেই এটা বুঝতে পারব যে যত সম্পদই আমাদের থাকুক না কেন মহানবীর (সা) উল্লেখিত এ তিনের বাইরে আমাদের কিছুই থাকে না। বাদবাকি সম্পদ  অন্যদের অধিকারে চলে যায়।

সুরা তাকাসুরের পঞ্চম আয়াতে সম্পদের বড়াইকারীকে তীব্র ভাষায় হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে:

তোমরা যেমনটি ভাবো তা কখনোই বাস্তব নয়। তোমরা যদি পরকালে বিশ্বাস রাখতে তাহলে তোমরা কখনও এসবের ধারে কাছেও যেতে না এবং এমন মিথ্যা ও অলীক বিষয় নিয়ে অহংকার করতে না।   

ইয়াক্বীন বা নিশ্চিত বিশ্বাস হচ্ছে সন্দেহের ঠিক বিপরীত।  জানা বা জ্ঞান হচ্ছে অজ্ঞতার ঠিক বিপরীত। জানা মানে কোনো কিছু স্পষ্ট হওয়া ও প্রমাণ হওয়া। ইসলামী শাস্ত্রে ইয়াক্বীন  হচ্ছে ঈমানের উচ্চতর স্তর। মহান আল্লাহর পবিত্র সত্তার প্রতি পুরোপুরি ভরসা বা নির্ভর করা এবং তাঁর নির্ধারিত বিধান ও পরিণতির কাছে সন্তুষ্ট চিত্তে আত্মসমর্পণ করাই হচ্ছে ইয়াক্বীন। কেউ কেউ মহানবী (সা)’র কাছে প্রশ্ন করেছিলেন: আমরা শুনেছি যে হযরত ঈসা নবীর (আ) কোনো কোনো সঙ্গী পানির ওপর হাঁটতে পারতেন!? মহানবী (সা) বললেন, তাদের ইয়াক্বীন যদি আরও শক্তিশালী হত তাহলে তারা বাতাসের মধ্যে তথা শুণ্যেও হাঁটতে পারতেন!

মরহুম আল্লামা ত্বাবাত্বাবায়ি এই হাদিস প্রসঙ্গে বলেছেন, মহান আল্লাহর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও শক্তির প্রতি যার ইয়াক্বিন যত বেশি তাঁর প্রতি বিশ্বের সব বস্তুই তত অনুগত। সব কিছু মহান আল্লাহর প্রতি নিশ্চিত বিশ্বাস ও নির্ভরতা তথা ইয়াক্বিনকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

সুরা তাকাসুরের শেষ আয়াতে বলা হয়েছে ক্বিয়ামতের দিন বা বিচার-দিবসে অবশ্যই সবাইকে মহান আল্লাহর নানা অনুগ্রহ বা নেয়ামতের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অর্থাৎ আমাদেরকে দেয়া সব সম্পদ আর অনুগ্রহগুলোর ব্যবহার আর দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। যেমন, চোখ-কান-মুখ, জ্ঞান ও বিবেক, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, বয়স বা আয়ু ও যৌবন- এসব সম্পদকে আমরা কিভাবে ব্যবহার করেছি তা জানতে চাওয়া হবে। এসব সম্পদকে কি আমরা আল্লাহর নির্দেশ পালনে ব্যবহার করেছি না পাপাচারে ব্যবহার করেছি? এসব সম্পদকে পাপাচারে ব্যবহারের অর্থ হল আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা ও এসব সম্পদের অপচয় তথা ধ্বংস সাধন। তাই সম্পদের অপব্যবহারের জন্য কঠোর শাস্তি পেতে হবে। #

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য