ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২০ ১৯:২৪ Asia/Dhaka

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম পশ্চিম ইরানের চমৎকার প্রদেশ ইলামের ঐতিহাসিক সি-মারেহ শাহরের দিকে।

সেখানে আমরা দেখেছি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন, হস্তশিল্প সামগ্রীসহ আরও বহু রকমের স্বাতন্ত্র্য। এসব কারণে ইরান ভ্রমণকারীরা পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরগুলোকে বেড়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।

ঐতিহাসিক শহর সি-মারেহ মাদাকাতু নামেও পরিচিত।

গভমিশন ব্রিজটিও যেন ঐতিহাসিক নিদর্শন কাবিরকূহ নামক পর্বতমালার মাঝে যেন মহা সমারোহে জ্বলজ্বল করছে। এতোসব সৌন্দর্যের বাইরেও এখানে রয়েছে সি-মারেহ নদী।ওই নদীর উপরে রয়েছে পোলে গভমিশন নামে অসম্ভব সুন্দর,কারুকার্যময় একটি স্থাপত্য নিদর্শন।পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের সবচেয়ে বড়,প্রাচীনতম এবং ঐতিহাসিক একটি ব্রিজ এই গভমিশন। এই  ব্রিজসহ আরও অনেক নিদর্শন দেখে আমরা সমাপ্তি টেনেছিলাম ইলাম ভ্রমণ পর্বের। আজকের আসরে আমরা যাবো শীতল পশ্চিমাঞ্চল ছেড়ে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় আহওয়াজ শহরের দিকে। এখানকার বিভিন্ন সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত হবার মধ্য দিয়ে আজকের আলোচনার সূচনা করা যাক।

ইরানের শীতল শ্যামল পশ্চিমাঞ্চলের ইলাম ছেড়ে আমরা যাচ্ছি দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় উষ্ণ শহর আহওয়াজের দিকে। সোজা গিয়ে উঠবো খুজিস্তান প্রদেশে। যেখানে হৃদয়ের মাঝে স্থান দিয়েছে জাগরোস পর্বতমালার উপত্যকা। যখন আমরা গিয়ে পৌঁছবো সমতলভূমিতে যার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে একেবারেই কম, তখনই টের পেয়ে যাবো খুজিস্তানের উষ্ণ আতিথেয়তা মানে গরম অনুভূতি। এই কম উচ্চতার কারণে খুজিস্তানে বিস্তৃত জলাশয়ের পাশাপাশি সোনালি বাঁশঝাড় কিংবা নলখাগড়া জাতীয় উদ্ভিদ দেখতে পাওয়া যায় বেশি। গভীর জলময় এইসব জলাশয়কে 'হাওড়' বা 'হুর' বলেও অভিহিত করা হয়। আহওয়াজ শহরটি ইরানের ঐতিহাসিক একটি শহর। খুজিস্তানের সমভূমিতে অবস্থিত এই শহরটি। পারস্য উপসাগরের সঙ্গে লাগোয়া অবস্থানের কারণে এবং সৌদিআরবের তপ্ত বালির গরম প্রবেশের কারণে আহওয়াজ শহরটি ইরানের সবচেয়ে গরম এলাকাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

আহওয়াজের সভ্যতা বেশ প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ। সেই এইলামি সভ্যতার যুগে গিয়ে মিলে যায়। ছয় হাজার বছর আগে 'তারিয়ানা' নামে পরিচিত প্রাচীন এই শহরাঞ্চলটির বিশেষ মর্যাদা ছিল। পরবর্তীকালে হাখামানেশিয় যুগে সিনিয়র দারিয়ুশ ওই তারিয়ানা শহরের নাম পরিবর্তন করে খুজিস্তান নাম রাখেন। ফার্সিতে খুজিস্তানের সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে 'শেকারেস্তান'। শেকার মানে হলো চিনি আর 'স্তান' কোনো স্থান বা অঞ্চল বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। চিনি তৈরি হয় আখ থেকে। সুতরাং আখ উৎপাদনের জন্য উপযোগী অঞ্চল হিসেবেও এরকম নামকরণ করা হয়ে থাকতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এ অঞ্চলে বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে রয়েছে আখক্ষেত। অবশ্য বলে রাখা অপ্রাসঙ্গিক নয় যে এই আহওয়াজের নাম যুগে যুগে বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। তবে এখন যে আহওয়াজ নামে পরিচিতি লাভ করেছে তা ইসলামি যুগে এসে এখনও অপরিবর্তিত আছে।

আহওয়াজ শহরে দর্শনীয় বহু নিদর্শন রয়েছে। মূল শহরে ঢোকার আগে থেকেই এগুলোর সাক্ষাৎ মেলবে। উপরে নীল আকাশ আর নীচে সবুজ শ্যামল আখের বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র। তাকাতেই দুচোখ জুড়িয়ে যাবে। আরও দেখতে পাওয়া যাবে সারি সারি খুরমা বাগান। ইরানের মধ্যে খোরমা উৎপাদনের দিক থেকে বৃহৎ শহরগুলোর একটি হলো আহওয়াজ। খোরমাকে বলা হয় হলদে-খয়েরি সোনা। এর বাইরেও আহওয়াজে রয়েছে কালো সোনার বৃহৎ ভাণ্ডার। সেটি হলো তেলের খনি। আহওয়াজে বহু তেলের খনি রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান। বিখ্যাত অনেক স্টিল কারখানার অস্তিত্ব পুরো আহওয়াজ শহরকে ইরানের শিল্প-কল-কারখানার গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

আরেকটি বিষয় জেনে নেয়া যেতে পারে। তাহলো আহওয়াজের এতো সুনাম সুখ্যাতির সঙ্গে এখানকার সুন্দর ও নামকরা নদী কারুনের একটা সম্পর্ক কিংবা বলা ভালো অবদান রয়েছে। সেটা হলো কারুন নদীর একটা অংশে নৌকা চলে। এ কারণেই সুদূর প্রাচীনকাল থেকে আহওয়াজে বাণিজ্যিক কাজকারবার বেশ জাঁকজমক ও শশব্যস্ততার মধ্য দিয়েই চলে এসেছে। এই কারুন নদী ইরানের সবচেয়ে জলটৈটুম্বুর নদী। বাখতিয়রি পাহাড় চুঁয়ে নেমে আসা পানিই এই নদীর প্রধান উৎস। এঁকেবেঁকে এই নদী যেমন বহুদূর বয়ে চলে গেছে তেমনি নদীটির উপর অসংখ্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এইসব বাঁধ নির্মাণের ফলে খুজিস্তান হয়ে উঠেছে নজিরবিহীন একটি সমতলভূমি। কারুন নদী আহওয়াজের বুক চিরে বয়ে গেছে দয়ালু মায়ের মতো। মা যেমন আপন সন্তানদের বুকে ধারন করে পরম আদর-স্নেহ মমতা দিয়ে ঠিক তেমনি আহওয়াজ শহরের পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তকে এই কারুন নদী যেন পরম মমতায় বুকে ধারন করে আছে। এই দৃশ্য না দেখলে বোঝানো কঠিন।                        

কারুন শহরের সৌন্দর্য আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে যখন আপনি 'হাফতম' মানে সপ্তম ব্রিজের ওপর রাতের শীতল আবহাওয়ায় পায়চারী করতে বের হবেন। একইভাবে ব্রিজের প্রান্তে তৈরি করা কৃত্রিম ঝরনার দিকে যখন এগুতে থাকবেন তখন জলের বিচিত্র রঙীন নৃত্যের সঙ্গে নিজেও নাচতে শুরু করে দেবেন। ঠিক তখনই আহওয়াজ শহরের সৌন্দর্য কিছুটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। আহওয়াজ শহরের এই অসম্ভব সুন্দর ব্রিজটি তার প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখেছে আজও। তবে শহর ঠিকই নতুনভাবে বিস্তৃতি যেমন পেয়েছে তেমনি আধুনিকও হয়ে উঠেছে। আধুনিক শহরের সঙ্গে মিশে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী হাফতম ব্রিজটি গড়ে তুলেছে দারুন সখ্যতা। তাই এই ব্রিজটিকে 'সভ্যতাগুলোর সংলাপ' ব্রিজ নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে।

অবশ্য কেবল হাফতম ব্রিজটাই নয় বরং আরও অনেক ব্রিজ রয়েছে এখানে সেগুলোও কারুন নদীর সৌন্দর্য নান্দনিক মনের অধিকারী দর্শকদের সামনে তুলে ধরে। এগুলোর মধ্যে পোলে সেফিদ বা হোয়াইট ব্রিজের নামও করা যেতে পারে। কারুন নদীর তীর বা উপকূল থেকে এই ব্রিজের দিকে তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। আরও একটি ব্রিজ আছে পোলে হাশতম বা অষ্টম ব্রিজ নামে। এই ব্রিজটি কারুন নদীর উপরে নির্মিত অপরাপর ব্রিজ থেকে একেবারেই আলাদা। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য