ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২০ ১৬:৩৫ Asia/Dhaka

গত আসরে যেমনটি বলেছিলাম, ইরানের বিমানবাহিনী একযোগে ১৪০টি জঙ্গিবিমান আকাশে উড়িয়ে ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানে এবং এর মাধ্যমে ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে নিজের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে।

ইরানের নৌবাহিনীও ইরাকের তেল রপ্তানির দু’টি প্ল্যাটফর্ম ও কয়েকটি গানবোট ধ্বংস করে সেদেশের তেল রপ্তানি প্রক্রিয়াকে মারত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়। ইরাকি আগ্রাসনের মোকাবিলায় ইরানের এসব প্রতিক্রিয়া বাগদাদের জন্য ছিল অবিশ্বাসী; কারণ, সাদ্দাম সরকারের কাছে যে গোয়েন্দা তথ্য ছিল তাতে বলা হয়েছে, সামরিক দিক দিয়ে ইরান এই মুহূর্তে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

ইরাকের একজন সেনা কমান্ডার ইরান সম্পর্কিত ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদের ব্যাপারে বলেন: “ইরানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেদেশের অভ্যন্তীণ সংকট বিশেষ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোন্দলের সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের জানানো হয়েছিল। এ ছাড়া, আমাদেরকে বলা হয়েছিল, বিপ্লবের পর সেনাবাহিনী থেকে শত শত কর্মকর্তাসহ হাজার হাজার সেনাকে অবসরে পাঠিয়ে দেয়ার কারণে ইরানের সেনাবাহিনী অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তাদের মধ্যে কোনো শৃঙ্খলা নেই এবং বিদেশি আগ্রাসন রুখে দেয়ার মতো বিন্দুমাত্র মনোবল আর অবশিষ্ট নেই।” ইরাকি ওই জেনারেল আরো বলেন, “ইরানে ইসলামি বিপ্লব হওয়ার পর সেদেশের সামরিক অবস্থান সম্পর্কে সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও আমাদেরকে গোয়েন্দা তথ্য জানানো হয়। সৌদিরা আমেরিকার কাছে থেকে এসব গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছিল।”

কিন্তু এতসব গোয়েন্দা তথ্য হাতে পাওয়ার পরও ইরাকি কমান্ডাররা যে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেননি তা হচ্ছে ইরানি জনগণের দৃঢ় মনোবল ও দেশরক্ষায় তাদের অকুতোভয় যুদ্ধ করার মানসিকতা। অন্য কথায় ইরানে আগ্রাসন চালানোর সময় সাদ্দাম সরকার আমেরিকা ও সৌদি আরবের কাছ থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পর্কে বাগদাদ বেখবর থেকে যায়। ইরানি জনগণের প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে কোনো তথ্য না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে একজন ইরাকি সেনা কর্মকর্তা বলেন, “ইরানের যেসব অবস্থানে হামলা চালানো হবে সেসব অবস্থান সম্পর্কে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। আমরা তাদের যুদ্ধাস্ত্র ও গোলাবারুদ সম্পর্কে তথ্য জেনেছিলাম ঠিকই কিন্তু দেশ রক্ষায় ইরানি জনগণে দৃঢ় প্রত্যয় পরবর্তীতে  আমাদেরকে হতচকিত করে দিয়েছে।”

সার্বিকভাবে আগ্রাসন চালাতে এসে ইরানি যোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হওয়ার পর ইরাকের তৎকালীন স্বৈরশাসক সাদ্দাম যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তুলে ধরেন।  যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে তিনি ইরাকি জনগগণকে উদ্দেশ করে বলেন: “ইরানের যতটুকু ভূমি আমরা দখলে নিতে চেয়েছিলাম তা নেয়া হয়ে গেছে। কাজেই এখন আমরা সংঘাত বন্ধ করে আলোচনায় বসতে চাই।”

অবশ্য ইরানি যোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধ সত্ত্বেও কোথাও কোথাও ইরানি বাহিনীর কাছে অস্ত্রসস্ত্র ও প্রয়োজনীয় রসদ না থাকার কারণে আগ্রাসী সেনারা কোনো কোনো ফ্রন্ট দিয়ে ইরানের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। কিন্তু মাত্র তিনদিনে ইরানের গোটা খুজিস্তান প্রদেশ দখল করে ফেলব বলে যারা আগ্রাসন চালিয়েছিল তাদের কাছে এতটুকু অগ্রগতি কোনো সাফল্য নয়। প্রকৃতপক্ষে সাদ্দামের যুদ্ধবিরতির ঘোষণাই ইরাকের আগ্রাসনের কৌশলের ব্যর্থতার জানান দিচ্ছিল।

এদিকে সাদ্দাম যখন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন তখন ইরানের বিস্তীর্ণ এলাকা ইরাকি বাহিনীর করতলগত থাকার কারণে সে প্রস্তাব মেনে নেয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু ইরাকি শাসক সাদ্দাম মনে করেছিল, ইরানের সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামি সরকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না বলে তেহরান যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব লুফে নেবে। ইরানে সে সময় কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় থাকার কারণেও সাদ্দামের মনে এ ধারনা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, ইরানকে যুদ্ধবিরতির আলোচনা বসানো যাবে এবং আলোচনার টেবিলে ইরানের কাছ থেকে অনেক ছাড় আদায় করা যাবে।

তবে ইরানের নব্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামি শাসনব্যবস্থা  অসংখ্য সমস্যার সম্মুখীন থাকা সত্ত্বেও এদেশের কোনো কর্মকর্তা সাদ্দামের প্রস্তাবকে মোটেই গুরুত্ব দেননি। কারণ, ইরাকের স্বৈরশাসক যদি সত্যিই যুদ্ধবিরতি চাইতেন তাহলে তিনি প্রথমে ইরানের দখল করা ভূমি থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিতেন এবং ১৯৭৫ সালে স্বাক্ষরিত আলজেরিয়া চুক্তি ছিঁড়ে ফেলার সময় যে অন্যায় দাবি করেছিলেন তা প্রত্যাহার করে নিতেন। কিন্তু ইরানের দখলীকৃত ভূমিকে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল সাদ্দাম সরকার। কাজেই ওই বিস্তীর্ন এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করা ছিল সাদ্দামের জন্য আত্মহত্যার শামিল। তাই তিনি ইরানি ভূমি জবরদখল করে রাখারই সিদ্ধান্ত নেন।

সেইসঙ্গে তার মনে এই ধারনাও বদ্ধমূল হয় যে, ইরানের সদ্য প্রতিষ্ঠিত সরকার দুর্বল হওয়ার কারণে তার পক্ষে দখলদার ইরাকি বাহিনীর হাত থেকে জবরদখলকৃত ভূমি মুক্ত করা সম্ভব নয়। কাজেই ইরান অনায়াসে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সাড়া দেবে এবং সে আলোচনায় বাগদাদের পক্ষ থেকে আলজিয়ার্স চুক্তি বাতিলের বিষয়টি মেনে নেবে। এই ভুল বিশ্লেষণ থেকে সাদ্দাম সরকার ইরানের দখলীকৃত ভূমিতে সেনা উপস্থিতি শক্তিশালী করে। আর এটি ছিল ইরাকের বাথ সরকারের দ্বিতীয় কৌশলগত ভুল।

ইরাক-ইরান সীমান্তবর্তী এলাকায় তখন শীতকাল আসন্ন এবং শীতকালে এসব এলাকায় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এবং ভারী বৃষ্টিপাত হয়। কখনো কখনো ব্যাপক তুষারপাতও হয়। এরকম আবহাওয়ায় ইরাকি সেনারা অস্থায়ী সীমান্তচৌকি স্থাপন করে সেখানে অবস্থান করতে থাকে। ইরাকের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার কারণে দখলদার সেনারা ইরানে হামলা চালানো বন্ধ রাখে। এদিকে ইরান ওই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে না নিলেও ইরাকের পক্ষ থেকে হামলা বন্ধ থাকায় নিজের সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠনের যথেষ্ট সুযোগ পেয়ে যায়।

এ সম্পর্কে ইরাকের একজন সেনা কমান্ডার বলেন, “প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন এবং তিনি ভেবেছিলেন এরকম পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ইরান সরকারের পক্ষে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভূমি পুনরুদ্ধারের মতো শক্তি সঞ্চয় করা সম্ভব হবে না।”

তো বন্ধুরা, আজকের আসরের সময়ও ফুরিয়ে এসেছে। এবার বিদায় নেয়ার পালা। যাওয়ার আগে বলে রাখছি আগামী আসরে আমরা যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার উপায় নিয়ে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য এবং শত্রুদের ওপর ওই মতপার্থক্যের প্রভাব সম্পর্ক আলোচনা করব।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ০৯

ট্যাগ

মন্তব্য