ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২০ ১৯:২০ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের শুরুতেই থাকবে দুটি গল্প। এরপর থাকবে একটি কবিতা। আর সবশেষে থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন সহকর্মী আশরাফুর রহমান। তো প্রথমেই বাংলাদেশি শিশু-সাহিত্যিক বিএম বরকতউল্লাহ'র লেখা গল্পটি শোনা যাক।

রাজার অসুখ

একবার এক রাজার অসুখ হলো। তাবিজ-কবচ, ওঝা-বৈদ্য, ডাক্তার-কবরেজ সব করা হয়েছে। কিন্তু রোগ সারে না। সারাদিন চুপচাপ বসে থেকে সময় কাটে নিঃসন্তান রাজার।

একদিন কোতোয়াল এসে রাজাকে বলে, মহামান্য রাজা, লক্ষণ তো ভালো ঠেকছে না। আপনার চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে বোধ হয়। আপনি বরং চিকিৎসা-টিকিৎসা বাদ দিয়ে একমনে ইবাদত-বন্দেগি করুন। বাকি দিনগুলে আরামে কাটুক।

রাজা বললেন, আচ্ছা।

মন্ত্রী এলেন রাজার ঘরে। কুর্ণিশ করে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন, রাজামশাই আপনার অসুস্থতার কথা শুনে রাজ্যটাও কেমন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সুখ চলে যাচ্ছে প্রজাদের মন থেকে। এখন রাজ্যটা শাসন করবে কে? প্রজারা বলছে এভাবে আর কতদিন? এর একটা বিহিত করলে হয় না রাজামশাই? এ ব্যাপারে আপনার সামান্য ইশারা পেলেই...

রাজা বললেন, আচ্ছা।

তারপর এলেন সেনাপতি। তিনি রাজাকে কুর্ণিশ না করেই বললেন, হে দুঃখিত রাজা, আপনি যদি অসুখে-বিসুখে ক্লান্ত হয়ে এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকেন, তাহলে রাজ্যটা চলে কিভাবে? আপনার সুস্থতার জন্য সব চেষ্টাই তো করা হলো। আপনি সুস্থ হবেন এমন কোনো লক্ষণ দেখছি না। দিনে দিনে প্রজাদের মন ভেঙ্গে যাচ্ছে। রাজ্যে যে-কোন সময় নানা অশান্তি আর বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যেতে পারে। পরে আশাহত প্রজাদের সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। আপনি জীবিত থেকেও মৃত। রাজ্যের কল্যাণে নতুন রাজার নাম ঘোষণা করা দরকার। আপনি সম্মতি দিলেই আমরা এগুতে পারি।

রাজা বললেন, আচ্ছা।

এরপর ঢোল-কাঁড়ায় বাড়ি পড়ল। তুড়ি-ভেরি, শঙ্খ-শিঙা বেজে উঠল। রাজবাড়িতে শুরু হয়ে গেল রাজাবদলের উৎসব। নতুন রাজার নাম ঘোষণা করা হবে। রাজদরবারে বইছে আনন্দের জোয়ার।

রাজামশাই জানালা ফাঁক করে দেখছেন ওসব। রাজা চিন্তিত মনে পায়চারি করছেন। তার আশপাশে কেউ নেই। সবাই আনন্দে মাতোয়ারা।

এরই মধ্যে একটা কাণ্ড ঘটে গেল। প্রজারা রাজবাড়ির সামনে এসে চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল। তাদের কান্নায় রাজবাড়ির আনন্দে টান পড়ল। সবাই প্রচণ্ড বিরক্তবোধ করল। কোতোয়াল কয়েকজন সিপাই নিয়ে কান্নারত প্রজাদের সামনে গিয়ে ধমক দিয়ে বলল, এই, কী চাস তোরা? কী হয়েছে তোদের? জানস না এখানে রাজা বদলের আনন্দ-আয়োজন চলছে?

প্রজারা বলল, না, না, না আমাদের প্রিয় রাজাকে কিছুতেই বদল করা চলবে না। বন্ধ করুন এই উৎসব। নতুন রাজা চাই না আমরা। আমাদের মহান রাজা যতদিন জীবিত থাকবেন ততদিন তিনিই থাকবেন আমাদের রাজ্যের রাজা। আমাদের গায়ে এক ফোঁটা রক্ত থাকতে এই মহান রাজাকে বদল করতে দেব না।

সিপাইরা রাগে কাঁপতে কাঁপতে দৌড়ে গিয়ে মন্ত্রী ও সেনাপতিকে প্রজাদের কথা বলল। তারা রাগে আগুন হয়ে কড়া নির্দেশ দিল কোতোয়ালকে। সে সিপাইদের নিয়ে কান্নারত প্রজাদের ধরে প্রচণ্ড মারধর করতে লাগল। তবুও প্রজারা তাদের দাবি ত্যাগ করল না। সেনাপতির নির্দেশে কোতোয়াল তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে চাবুক মেরে রক্তাক্ত করে ফেলল। প্রজারা বেহুঁস হয়ে পড়ে রইল।

রাজা জানালার ফাঁক দিয়ে সবই দেখছিলেন। আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি গর্জে উঠলেন এবং দ্রুত নিচে নেমে এসে ধমকের সুরে বললেন, কী হচ্ছে এসব, প্রজাদের গায়ের রক্ত ঝরিয়ে রাজা বদলের আনন্দ-আয়োজন চলছে বুঝি?

রাজার অগ্নিমূর্তি দেখে সবাই ভয়ে তটস্থ হয়ে গেল এবং ছেড়ে দিল প্রজাদের। রক্তাক্ত প্রজারা রাজাকে কুর্ণিশ করে বলল, হে মহান রাজা, আমরা আপনাকে অনেক ভালোবাসি। আমরা আপনার ন্যায়শাসনের বদলে এই নিষ্ঠুর মানুষের দুঃশাসন চাই না। ওরা রাজ্যে অশান্তি সৃষ্টি করবে। আমরা মনে-প্রাণে আপনার সুস্থতার জন্য দোয়া করছি। আপনি দয়া করে আমাদের ত্যাগ করবেন না রাজামশাই!

রাজা বললেন, আমি অসুস্থ নই। বহুদিনের পুরোনো ও বিশ্বস্ত রাজকর্মচারিদের পরীক্ষা করার জন্য আমি অসুস্থতার ভান করেছি। আমি যাদের বিশ্বাস করে রাজ্য পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছি- এতদিনে তাদের মধ্যে ভয়ংকর লোভ জেগে উঠেছে। তাদের পরীক্ষা হয়ে গেল। সেই সঙ্গে আমার প্রতি প্রজাদের বিশ্বাস ও ভালোবাসার পরীক্ষাটাও হয়ে গেল।

রাজা লোভী রাজকর্মচারিদের বন্দি করে তাদের পরিবর্তে প্রজাদের নিয়োগ করলেন। কেউ মন্ত্রী, কেউ সেনাপতি, কেউবা কোতোয়াল-সিপাই পদে অধিষ্ঠিত হলো। রাজা বদলের আনন্দ-আয়োজন অকৃতজ্ঞ কর্মচারি পরিবর্তনের উৎসবে পরিণত হলো।

অত্যাচারি রাজার গল্প

বন্ধুরা, এবার আমরা এক অত্যাচারি রাজার গল্প শোনাব। তৎকালীন পারস্যে এক রাজা ছিল। রাজা হলে কি হবে? লোকটা ছিল হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর প্রকৃতির। দয়ামায়া বলতে তাঁর প্রাণে কিছুই ছিল না। প্রজাসাধারণের অর্থসম্পদ আত্মসাৎ করার লোভে তাদের ওপর জোর জুলুম চালাতে তার মোটেই দ্বিধাবোধ হতো না।

রাজার হৃদয়হীন ব্যবহারে তার অধীনস্থ কর্মচারীরাও তার ওপর সন্তুষ্ট ছিল না। দিন দিন অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়াল যে, তার নির্মম অত্যাচারে টিকতে না পেরে অনেক নিরীহ প্রজা তার রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে গিয়ে আশ্রয় নিতে লাগল এবং দিন দিন প্রজার সংখ্যা কমতে শুরু করল।

রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ায় রাজকোষ শূন্য হয়ে এলো। দেশের উন্নয়নমূলক কাজ বন্ধ হয়ে গেল। সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা যথারীতি বেতন ভাতাদি না পাওয়ায় তাদের মাঝে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠল। এই রাজ্যের প্রতি প্রতিবেশী রাজার লোলুপ দৃষ্টি ছিল। সুযোগ বুঝে তারা আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করল। দেশ রক্ষার জন্য রাজ কর্মচারী থেকে শুরু করে প্রজাসাধারণ পর্যন্ত কারো ভেতর কোনো উৎসাহ উদ্দীপনার লক্ষণ দেখা গেল না।

একদা সেই রাজার দরবারে মহাকবি ফেরদৌসীর প্রসিদ্ধ কাব্যগ্রন্থ শাহনামা পড়া হচ্ছিল। বিষয়বস্তু ছিল সম্রাট জোহাকের পতন ও ফেরিদুনের অভ্যুত্থান কাহিনী। প্রধানমন্ত্রী রাজাকে জিজ্ঞেস করলেন : ফেরিদূন একজন সাধারণ লোক ছিলেন। তার না ছিল অর্থ সম্পদ, না ছিল সৈন্যসামান্ত। এই অবস্থার ভেতর দিয়ে তিনি জোহাকের মতো একজন শক্তিশালী সম্রাটের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে কিভাবে তার সিংহাসন অধিকার করেছিলেন, তা জানেন কি?

রাজা উত্তরে বললেন: শুনেছি দেশের জনগণ তার নেতৃত্বে আস্থাবান ছিল এবং তাঁকে শক্তিশালী করেছিল। তাই তিনি অনায়াসে জয়লাভ করে রাজা হতে পেরেছিলেন।

মন্ত্রী বললেন: দেশের জনসমর্থনই শক্তির উৎস এবং রাজ্য প্রাপ্তির কারণ বলে যদি জানেন, তাহলে জনসাধারণের ওপর জুলুম করে জনমন ক্ষুব্ধ করেন কেন? আপনার কার্যকলাপে মনে হয় রাজত্ব করার ইচ্ছাই আপনার নেই।

রাজা জিজ্ঞেস করলেন: জনগণ, রাজকর্মচারি ও সেনাবাহিনীর অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করার উপায় কি?

মন্ত্রী উত্তর দিলেন : রাজা-বাদশাহদের দুটো গুণ থাকা অপরিহার্য। একটা হলো, কর্মচারী ও প্রজাসাধারণকে পুত্রের মত প্রতিপালন করা এবং অপরটি তাদের জানমাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। দুঃখের বিষয়, এ দুটো গুণের কোনটাই আপনার মধ্যে নেই। আপনার রাজত্ব কি করে রক্ষা পাবে?

হিতাকাঙ্ক্ষী মন্ত্রীর উপদেশ ও পরামর্শ রাজার মনঃপুত হলো না, বরং মন্ত্রীর কথায় অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন।

অল্পদিন যেতে না যেতেই রাজার চাচাত ভাইয়েরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল এবং তাদের পৈত্রিক রাজত্ব দাবি করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো। যেসকল প্রজা রাজার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ছিল, তারা এবং স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনগণ সদলবলে বিপক্ষের সেনাবাহিনীতে যোগ দিল। ফলে অনায়াসে রাজ্য তার হাতছাড়া হয়ে বিপক্ষের অধিকারে চলে গেল।

এ গল্পের শিক্ষা হলো- রাজ্য শাসন করতে হলে রাজার বহু গুণ থাকা প্রয়োজন। প্রজাসাধারণের মন জয় করে চলতে হবে। তাদেরকে আপনজন মনে করতে হবে। তাদের জানমাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের জানমাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। পক্ষান্তরে রাজা যদি কর্কশ মেজাজের হয়, দেশের সৈন্য সামান্তও প্রজাদের সাথে ভালো ব্যবহার না করে, তবে রাজ্যের ক্ষমতা অল্পের মধ্যেই চলে যাবে। #

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৯

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য