ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০ ১৭:৫৬ Asia/Dhaka

গত দুই আসরে আমরা সততা ও সত্যবাদিতা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি, সততা ও সত্যবাদিতা, ব্যক্তির মধ্যে যেমন প্রশান্তি সৃষ্টি করে তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রকেও কলুষতামুক্ত করতে সহযোগিতা করে।

অবিশ্বাস ও অনাস্থার বেড়াজাল থেকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে সততা ও সত্যবাদিতা হচ্ছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। যে কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে যদি সততার অভাব থাকে তাহলে তা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অথবা অস্বস্তিকর পর্যায়ে পৌঁছায়। এছাড়া মিথ্যাচার মানুষকে ভুল-ভ্রান্তিতে ফেলে দেয় এবং বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সত্যবাদিতা হচ্ছে অপর সব ভালো গুণের ভিত্তি এবং মিথ্যাচার হচ্ছে সব খারাপ বৈশিষ্ট্যের জননী। আজকের আসরে আমরা সুন্দর কথা বলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করব।

জীবনকে আরও সুন্দরভাবে সাজাতে সামাজিক সুসম্পর্ক জরুরি। আল্লাহ মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, সে তার আত্মিক ও দৈহিক চাহিদার বেশিরভাগই সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে পূরণ করতে পারে। আসলে মানুষ হচ্ছে সামাজিক জীব। মানুষ বেশি দিন একা থাকতে পারে না এবং বিচ্ছিন্ন মানুষ জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারে না। মানুষ জন্মগতভাবেই সামাজিক সম্পর্কের মুখাপেক্ষী। আর এ কারণেই মানুষ সহজেই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। সহানুভূতি ও সহমর্মিতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী ও প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক যেকোনো মানুষের ব্যক্তিত্বের পূর্ণতার নিদর্শন। আর পারস্পরিক সুসম্পর্কের মূল চাবিকাঠি হলো সুন্দরভাবে ভালো কথা বলা। মানুষের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ভাষা বা কথা। ইরানে বলা হয়, যেকোনো কথার সূচনা হয় সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে এবং মানুষের পারস্পরিক পরিচিতির জন্য প্রয়োজন কথোপকথন। মৌখিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুন্দর শব্দ প্রয়োগ এবং ভদ্রতার সঙ্গে কথা বলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সুন্দর কথা বলার অর্থ এই নয় যে, অন্যের যা ভালো লাগে সে ধরণের কথা বলে তার মন জয় করা বরং সুন্দরভাবে কথা বলা মানে হলো, সর্বোত্তম শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে কল্যাণকর কথা বলা। বিশ্বের সব সমাজ ও ধর্মেই সুন্দর ও ভদ্রভাবে কথা বলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুন্দরভাবে কথা বললে মানুষের মর্যাদা সমুন্নত থাকে এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে যেকোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি এড়িয়ে চলা সম্ভব হয়। যেকোনো ব্যক্তির কথায় তার ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। কথা বলার আগ পর্যন্ত মানুষের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা অপ্রকাশ্য থাকে। পবিত্র কুরআনেও সুন্দর কথা বলার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, মানুষের সঙ্গে ভালো ও সুন্দর কথা বলুন। অনেকে দরিদ্র ও ভিক্ষুকদের সঙ্গে কর্কশ ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ভিক্ষুকদের সঙ্গেও নম্রভাবে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন।

মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (স.) ও তার আহলে বাইতের সদস্যরাও এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। মহানবী (স.) বলেছেন, "যারা জোরালো ঈমানের অধিকারী তারা নিরর্থক কথা বলেন না, কারণ উপকারী কথা, জোরালো ঈমানের পরিচায়ক।" আহলে বাইতের মহান ইমাম হজরত বাকির (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন, "আপনি অন্যদের কাছ থেকে যেরকম সর্বোত্তম আচরণ প্রত্যাশা করেন ঠিক সেভাবে আপনিও অন্যদের সঙ্গে কথা বলুন।" ভেবেচিন্তে কথা বলা, সত্যবাদিতা, গীবত ও চোগলখোরী না করা, কটুবাক্য পরিহার করা, অন্যকে তিরষ্কার না করা ইত্যাদি হলো সুন্দরভাবে কথা বলার অপরিহার্য উপাদান। পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন ও সাধারণ মানুষের পাশাপাশি একেবারে নীচু পর্যায়ের মানুষের সঙ্গেও সুন্দরভাবে কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পবিত্র ইসলাম ধর্মে।

মুসলমানদের বলা হয়েছে, আপনারা মানুষের সঙ্গে সুন্দরভাবে মোলায়েম কণ্ঠে কথা বলুন অথবা চুপ থাকুন। কোন অবস্থাতেই কর্কশ ভাষায় তিরষ্কারের সুরে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়নি। প্রতিটি শব্দ ও বাক্য ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। কারণ একটি ভুল শব্দ বা বাক্য, বড় ভুল বোঝাবুঝির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সুন্দর কথা মানুষের নিজের মধ্যে যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে তেমনি অন্যদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। একটি ফলবান বৃক্ষ যেমন বছরের পর বছর নানাভাবে মানুষ ও পরিবেশের উপকার করে  তেমনি একটি সৎবাক্য বা ভালো কথা স্থানকালের সীমানা অতিক্রম করে অগণিত মানুষকে আলোকিত করতে পারে। ভালো কথা বা সৎবাক্য ব্যবহারের জন্য কোনো অর্থ বা বাড়তি শ্রমের প্রয়োজন হয় না, কিন্তু তা গোটা সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে, যেমনিভাবে একটি কটুকথা একটা পরিবার ও সমাজ এমনকি একটি রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্বে এমন অনেক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যাদের একটি বাক্য গোটা বিশ্বের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে।

বর্তমানে গণযোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক উন্নতির কারণে আপনার একটি শব্দ ও বাক্য মুহূর্তে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ভাইরাল হতে পারে। এর ফলে উপকারী কথা হলে মানুষ দীর্ঘকাল এ ধরণের কথা থেকে উপকৃত হতে পারে। আর এর উল্টোটাও হতে পারে। কটুবাক্য ভার্চুয়াল জগতে ভাইরাল হয়ে তা ধ্বংসাত্মক ভূমিকা রাখতে পারে। আসলে সুন্দর কথা বা বাক্য হচ্ছে এমন এক ধরনের সৎকর্ম যার প্রতিদান শেষ হবার নয়। একইভাবে কটুকথা এমন এক অসৎ কর্ম যা পারস্পরিক সম্পর্ককে ধ্বংস করার পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদি সমস্যার জন্ম দিতে পারে। এ কারণে আমাদেরকে সব সময় কথা বলার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে গোটা বিশ্বের মানুষের আদর্শ মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (স.) সব সময় সুন্দর করে কথা বলতেন। তার মুখে হাসি ফুটত। মহানবীর কথা শুনলে শ্রোতার মনের কষ্ট দূর হয়ে যেত। তিনি কটু ও মন্দ কথার জবাবে মন্দ কথা বলতেন না।

আসলে ভালো ও ঈমানদার মানুষ কখনোই অন্যকে কষ্ট দিতে চায় না। আর একজন মানুষের সুন্দর কথায় অন্যের মনোকষ্ট দূর হতে পারে। হতাশা, নিরাশা, দুশ্চিন্তা দূর হতে পারে। একজনের কথায় অন্যের মধ্যে সচেতনতা ও বিবেক জাগ্রত হতে পারে। আমাদের সবার প্রতিটি কথা ইতিবাচক হবে এবং শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে এ প্রত্যাশায় শেষ করছি আজকের আসর।#

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো: আবুসাঈদ/ ১০

ট্যাগ

মন্তব্য