ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২০ ১৮:৪০ Asia/Dhaka
  • ইরানের ঐতিহাসিক সৌন্দর্য উপভোগ্য কারুন নদী
    ইরানের ঐতিহাসিক সৌন্দর্য উপভোগ্য কারুন নদী

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান।

গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম ইরানের শীতল শ্যামল পশ্চিমাঞ্চল ছেড়ে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় আহওয়াজ শহরের দিকে। এখানকার বিভিন্ন সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত হবার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে আহওয়াজ শহরে ঢোকার পথেই দেখেছি খেজুর বাগান আর ইক্ষু ক্ষেতের সারি। শহরের ভেতরে ঢুকেই দেখেছি ঐতিহাসিক কারুন নদী। ইরানের সবচেয়ে বড় এই নদীটির সৌন্দর্য সত্যিই উপভোগ্য। বিশেষ করে আহওয়াজ শহরটির বুক চিরে বয়ে গেছে এই নদীটি।

মাতৃস্নেহে যেন শহরের দুই প্রান্তকে আগলে রেখেছে কারুন। কারুনের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করেছে এই নদীর উপর গড়ে ওঠা কয়েকটি অনন্য সাধারণ ব্রিজ। এই সৌন্দর্য উপভোগ্য হয়ে উঠবে যখন আপনি 'হাফতম' মানে সপ্তম ব্রিজের ওপর রাতের শীতল আবহাওয়ায় পায়চারী করতে বের হবেন। একইভাবে ব্রিজের প্রান্তে তৈরি করা কৃত্রিম ঝরনার দিকে যখন এগুতে থাকবেন তখন জলের বিচিত্র রঙীন নৃত্যের সঙ্গে নিজেও নাচতে শুরু করে দেবেন। ঠিক তখনই আহওয়াজ শহরের সৌন্দর্য কিছুটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। আহওয়াজ শহরের এই অসম্ভব সুন্দর ব্রিজটি তার প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রেখেছে আজও। তবে শহর ঠিকই নতুনভাবে বিস্তৃতি যেমন পেয়েছে তেমনি আধুনিকও হয়ে উঠেছে। আধুনিক শহরের সঙ্গে মিশে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী হাফতম ব্রিজটি গড়ে তুলেছে দারুন সখ্যতা। তাই এই ব্রিজটিকে 'সভ্যতাগুলোর সংলাপ' ব্রিজ নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে।

গত আসরে আমরা আপনাদের জানিয়েছিলাম যে, আরও একটি ব্রিজ আছে পোলে হাশতম বা অষ্টম ব্রিজ নামে। এই ব্রিজটি কারুন নদীর উপরে নির্মিত অপরাপর ব্রিজ থেকে একেবারেই আলাদা। এই ব্রিজটিকে ক্যাবল ব্রিজ নামেও অভিহিত করা হয়। এর কারণ হলো ব্রিজটি পিলার ছাড়া মোটা ক্যাবল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ঝুলন্ত ব্রিজ বলতে যা বোঝায় আর কি। রাতের বেলা গাড়ি চালকেরা এই ব্রিজ পার হবার সময় খুবই আনন্দ উপভোগ করে। আহওয়াজ সফর অপরিপূর্ণ থেকে যায় যদি না এখানকার ঐতিহ্যবাহী এবং আধুনিক বাজারগুলো দেখা না হয়। আহওয়াজ শহরের সবচেয়ে প্রাচীন বাজারটির নাম হলো আব্দুল হামিদ বাজার। প্রাচীন বাজারের দোকানপাটকে বলা হতো 'হুজরা'। ইট দিয়ে তৈরি করা হতো এই হুজরা বা দোকানের প্লটগুলো। কাজার শাসনামলে নির্মিত প্রাচীন বাজারের এইসব হুজরায় বিচিত্র মালামাল কেনাবেচা করা হত।

সাধারণত বিভিন্ন রকমের রঙীন কাপড়, খাদ্য পণ্য ইত্যাদি বেশি কেনাবেচা হত বেশ সস্তা মূল্যে। অবশ্য বলাবাহুল্য যে এইসব প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বাজার ছিল সমাজ অভিজাত শ্রেণীর জন্য, সর্বসাধারণের জন্য নয়। মাঈনুত্তুজ্জার স্থাপনা কিংবা 'শায়খ খাজআল' নামে পরিচিত এখানকার সরাইখানাটিও বাজারের ভেতরেই অবস্থিত। কাজার শাসনামলে এই সরাইখানাটি একেবারে জমজমাট ছিল। লোকজনের আনাগোনায় সবসময় কোলাকলমুখর ছিল এই সরাইখানা। প্রাচীন স্থাপনা সত্ত্বেও এখনও এই বাজারের ঐশ্বর্য অনুমান করা যায়। বিশেষ করে ইটের তৈরি চন্দ্রাকৃতির খিলান এবং ঝুলবারান্দাগুলো দেখলে এখনও সেই প্রাচীন ঐশ্বর্যের বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়।

আহওয়াজের প্রাচীন সরাইখানা, প্রসিদ্ধ ঘরবাড়ি কিংবা মহল্লাগুলো ঘুরেফিরে দেখলে অন্যরকম একটা অনুভূতির সৃষ্টি হবে মনের গহীনে। আহওয়াজে গেলে আজম মহল্লায় অবশ্যই যেতে ভুলবেন না। ইটের তৈরি একটি এক তলা প্রাচীন বাড়ি। পাথরের পাটাতনের বাড়িতে যেসব পিলার রয়েছে সেগুলোর খোদাইকর্মগুলো দেখার মতো। এগুলোর প্রতি নজর বুলালেই অনুমান করা যাবে যারা এখান বসবাস করতো তাদের জীবনযাপন পদ্ধতিটা কেমন অভিজাত ছিল। পাকিস্তানি বাজার নামেও একটি প্রাচীন বাজার আছে এখানে। এই বাজারে রঙীন সব কাপড় চোপড় বিক্রি হয়। কাভে বাজারের নামটিও উল্লেখ করার মতো। এখানে খাদ্য পণ্যের পাশাপাশি মাছ, চিংড়ি জাতীয় নিত্যে প্রয়োজনীয় খাবার সামগ্রী পাওয়া যায়।

আহওয়াজ শহরের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে বিখ্যাত আরেকটি বাজার। এই বাজারের নাম ইমাম খোমেনি (র.) বাজার। ছাদযুক্ত বিশাল এলাকা জুড়ে নির্মিত এই বাজারটি ইরানের সর্ববৃহৎ বাজারগুলোর একটি। ইরানের প্রায় সব শহরেই জিয়ারতগাহ আছে। আহওয়াজ শহরটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানে রয়েছে আলি ইবনে মাহজিয়ারের মাজার। তিনি ছিলেন শিয়া মাজহাবের একজন বিখ্যাত ফকিহ। ইমাম রেজা (আ) এর সহযোগীদের একজন ছিলেন তিনি। জিয়ারতকারীগণ মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তি খুঁজে পান এই মাজার জিয়ারত করে। এতোক্ষণ তো আমরা কেবল প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী স্থান ও স্থাপনার কথা বললাম। আহওয়াজে কিন্তু আধুনিক শপিং মলও রয়েছে অনেক। রয়েছে বহু মিউজিয়ামও। আধুনিক শিল্প যাদুঘরে খুজিস্তানের সমকালীন বিখ্যাত শিল্পীদের ছবির গ্যালারি রয়েছে যাদুঘরে।

আহওয়াজ শহরে কাঠ শিল্প নিয়েও রয়েছে সুন্দর একটি যাদুঘর।  বিশেষ এই যাদুঘর দেখলে শহরের কাঠ শিল্প এমনকি ফার্নিচারের কারুকাজ সম্পর্কেও চমৎকার একটি ধারনা পাওয়া যাবে। আহওয়াজের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণের পাশাপাশি এখানে রয়েছে বিচিত্র গোত্র ও বংশের সৌন্দর্যও। একই শহরে বহু গোত্রের লোকজনের সহাবস্থান সত্যিই আপনাকে চমৎকৃত করবে। লোর জনগোষ্ঠির পাশাপাশি ফার্সরা যেমন বসবাস করছে তেমনি আরবদের উপস্থিতিও লক্ষ্যণীয়। বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানের এক অনন্য পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে আহওয়াজের অধিবাসীরা। বিশেষ করে ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া আট বছরের যুদ্ধের সময় এরা সকলেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বন্ধুত্ব ও সংহতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আপন দেশের জল-স্থল-অন্তরীক্ষের সুরক্ষায় এগিয়ে এসেছে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য