ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০ ১৭:১৭ Asia/Dhaka

গত পর্বগুলোর ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি অষ্টম শতকের তথা খ্রিস্টিয় চতুর্দশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির জীবন ও চিন্তাধারা এবং নানা ক্ষেত্রে তার অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

খ্রিস্টিয় চতুর্দশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি, ধর্ম-প্রচারক ও আরেফ মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানির জীবন, চিন্তাধারা ও নানা অবদান নিয়ে আমরা কথা বলছিলাম। মধ্য-এশিয়া ও কাশ্মির অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সম্মানের অধিকারী হামেদানি কাশ্মির অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও রেখেছেন ব্যাপক অবদান। এ অঞ্চলে ইরানি হস্তশিল্পসহ নানা শিল্প আর পেশার প্রচলন ও প্রসার ঘটিয়েছিলেন তিনি। ধর্ম, দর্শন ও আত্মশুদ্ধিসহ নানা বিষয়ে হামেদানির লেখা বইয়ের সংখ্যা ১১০টিরও বেশি। তার কবিতা এবং গদ্য-সাহিত্য ভারত উপমহাদেশে ফার্সি ভাষার প্রচার-প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সাইয়্যেদ হামেদানি ধর্ম-প্রচারকদের প্রশিক্ষণের জন্য কাশ্মিরে গড়ে তুলেছিলেন বিশেষ মাদ্রাসা। কাশ্মিরের নানা মাদ্রাসা ছাড়াও বহু মসজিদ গড়ে উঠেছিল সাইয়্যেদ হামেদানির নামে। এসব মসজিদকে বলা হত 'হযরত আমিরের মসজিদ'।  মোট কথা কাশ্মিরের সব কিছুতে ইরানি শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, পেশা ও ভাষার প্রভাব এতটা জোরদার হয়েছিল যে গোটা কাশ্মিরকে বলা হত ক্ষুদ্র-ইরান বা দ্বিতীয় ইরান। আর এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল মূলত বহুমুখী ও সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী সাইয়্যেদ হামেদানি এবং তার সঙ্গী আর ছাত্রদের প্রচেষ্টার কারণেই।

কাশ্মির ও ভারত উপমহাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম বা ভাষা ছিল ফার্সি। কারণ ইসলাম ধর্ম প্রচারকেদের অনেকেরই মাতৃভাষা ছিল ফার্সি। পরবর্তীকালে ফার্সি হয়ে ওঠে গোটা ভারত-বর্ষ ও কাশ্মিরের অন্যতম প্রধান ভাষা।  ফলে এ অঞ্চলে জন্ম নিয়েছেন ফার্সি-ভাষী অনেক কবি, সাহিত্যিক ও লেখক। আর কাশ্মিরে এ ধরনের কবি-সাহিত্যিক ও লেখকের সংখ্যা ভারত উপমহাদেশ ও তার আশপাশের অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি।  কাশ্মিরের ইতিহাসসহ নানা বিষয়ে তারা লিখেছেন অনেক বিখ্যাত বই। এসব বইয়ের মধ্যে 'তর্জমেইয়ে র'জ তারাঙ্গিনি', 'তারিখে হেইদার মালিক', 'মুন্তাখাব আততাওয়ারিখ' বা নির্বাচিত ইতিহাস, শাহনামায়ে কাশ্মির ও তারিখে কাশ্মিরসহ আরও অনেক বইয়ের কথা উল্লেখ করা যায়।  কাশ্মিরে ফার্সি ভাষার প্রসার ও প্রচার জোরদার হয়ে ওঠে বুলবুল শাহ সোহরাওয়ার্দি, সাইয়্যেদ হামেদানি এবং তার সঙ্গী আর ছাত্রদের সৃষ্টিশীল নানা পদক্ষেপের পর থেকে। হামেদানি তার সুফি-তাত্ত্বিক চিন্তাধারা প্রচারের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ফার্সি কবিতাকে। তার সমসাময়িক এবং পরবর্তী যুগে কাশ্মিরের সুফি ও আরেফদের বেশিরভাগই এই একই কৌশল বা পন্থা ব্যবহার করেছেন। 

সাইয়্যেদ হামেদানি এবং তার সঙ্গীরা কাশ্মিরি ভাষা জানতেন না। ফলে এ অঞ্চলে এসে ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে তারা অসুবিধার শিকার হয়েছিলেন। আর এই সমস্যা কাটানোর জন্য তারা কাশ্মিরের নানা অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেন অনেক মাদ্রাসা বা দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কাশ্মিরের রাজধানী শ্রীনগরের এমনই একটি মাদ্রাসার নাম ছিল 'উরওয়াতুল উস্‌কা'। এ মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন সাইয়্যেদ হামেদানির অন্যতম সঙ্গী সাইয়্যেদ জামালউদ্দিন। তিনি ছিলেন, ইসলামী আইন, তাফসির ও হাদিস শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ। কাশ্মিরের পরবর্তী যুগের বেশিরভাগ আলেম ও লেখক গড়ে উঠেছেন এই মাদ্রাসা থেকেই।  এই মাদ্রাসার মূল অংশের ধ্বংসাবশেষ এখনও টিকে আছে।

শিয়া মুসলিম মাজহাবের আলেমরা ইসলাম ধর্ম ও এর প্রকৃত শিক্ষা প্রচারের জন্য সহ্য করেছেন অনেক ত্যাগ ও তিতিক্ষার কষ্ট। সাইয়্যেদ হামেদানিও ছিলেন এমনই এক মহান ব্যক্তিত্ব। কাশ্মিরসহ নানা অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য তিনি অনেক কষ্ট করেছিলেন। তিনি নিজেই লিখেছেন: আমি পূর্ব থেকে পশ্চিমে তিন বার সফর করেছি এবং পানিতে ও ডাঙ্গায় বিস্ময়কর অনেক কিছু দেখেছি। আমি প্রথমে যেতাম শহর থেকে শহরে, দ্বিতীয় বারে যেতাম গ্রাম থেকে গ্রামে ও তৃতীয় বারে যেতাম ঘর থেকে ঘরে। 

কাশ্মিরে আজ ইসলাম ধর্মের যে শক্ত ভিত্তি রয়েছে তা সাইয়্যেদ হামেদানি এবং তার সঙ্গীদের প্রচেষ্টা ও সাধনার কাছে ঋণী। কাশ্মিরের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও শিল্প এবং ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে একই কথা অনেকাংশেই প্রযোজ্য। সাইয়্যেদ হামেদানি সংসার-ত্যাগ বা নির্জনতাকে বেছে-নেয়া আরেফ বা সুফি ছিলেন না। খানকা ও মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণের মধ্যেই তার তৎপরতা সীমিত ছিল না।  হামেদানি কেবল তার অনুরাগী বা মুরিদদের মধ্যেই ইসলামকে ছড়িয়ে দেয়ার নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না, বরং সর্বত্র ইসলামী শিক্ষা ও সার্বিক উন্নয়নের ধারা ছড়িয়ে দেয়াই ছিল তার নীতি। অবশ্য হামেদানির জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ ছিল তিনি ছিলেন একটি সুফিবাদী তরিকার শীর্ষ-স্থানীয় ব্যক্তিত্ব। শেখ নাজিমুদ্দিন কোবরার প্রতিষ্ঠিত এ তরিকা ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিল।

সাইয়্যেদ হামেদানির যুগে তাসাওউফ বা সুফিবাদের মধ্যে যুক্ত হয়েছিল দর্শন, যুক্তি ও শিক্ষামূলক নানা বিষয়। সে যুগে তাসাওউফ বা সুফিবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য বিষয় হয়ে পড়েছিল দীনী মাদ্রাসাগুলোতে। আর সুফিবাদিদের ধর্ম-প্রচার মুসলিম শাসকদের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থসহ নানা স্বার্থ রক্ষা করত বলে তারা মুসলমানদের শাসনাধীন নতুন অঞ্চলগুলোতে শাসকদেরও পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন। হামেদানি যখন কাশ্মিরে আসেন প্রথম বারের মত তখন তার বয়স হয়েছিল অন্তত ষাট বছর। তার আগেই তিনি একজন বিখ্যাত সুফি-সাধক হিসেবে মুসলমানদের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। হামেদানি তার ব্যাপক জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে মুসলমানদের ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে সংস্কার আনার চেষ্টা করেছিলেন। হামেদানি মনে করতেন রাজনীতি হতে হবে নৈতিকতা ও ধর্ম-ভিত্তিক। তার মতে একজন যোগ্য মুসলিম শাসককে হতে হবে সৃষ্টিশীল, কৌশলী ও ধার্মিক আর ন্যায়নিষ্ঠতাবাদী বা  জুলুম-বিরোধী এবং সৎ ও আলেমদের সঙ্গী। বিলাসিতা, অহংকার এবং অজ্ঞ লোকদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে হবে তাকে।

হামেদানির মতে মুসলিম শাসক যদি এমনসব অযোগ্য কর্মকর্তাদের নিয়োগ করেন যারা দুর্বল ও দরিদ্রদের অবস্থা এবং দেশের ভেতরের ও সীমান্তের নিরাপত্তার ব্যাপারে অসচেতন থাকেন তাহলে তা হবে খুবই বিপজ্জনক। হামেদানির মতে মুসলিম শাসককে জনগণের পার্থিব বা দুনিয়াবী সৌভাগ্য ছাড়াও জনগণের পারলৌকিক সৌভাগ্যের প্রতিও মনোযোগী হতে হবে। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ

মন্তব্য