মার্চ ১০, ২০২০ ১৬:৪৫ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই মা-বাবা, দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানীর কাছে রূপকথার গল্প শুনতে পছন্দ করো। কেউবা রূপকথার বই পড়ে মজা পাও। সত্যি বলতে কী, গল্পের ছলে জীবনের নানান সমস্যা ও আনন্দের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয় রূপকথায়। তাই রূপকথার গল্পগুলো জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

বন্ধুরা, রূপকথা নিয়ে এত কথা বলার উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো? হ্যাঁ, রংধনুর আজকের আসরে আমরা এক দৈত্য ও তার শাগরেদের গল্প শোনাব। এরপর থাকবে পাখিদের বাসার তৈরি নানা কৌশল নিয়ে কিছু জানা-অজানা তথ্য। আর সবশেষে থাকবে একটি কবিতা ও গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে প্রথমে গল্পটি শোনা যাক।

অনেক অনেকদিন আগে, সেই প্রাচীনকালের এক দম্পতির ঘটনা। তারা স্বামী স্ত্রী ভালোভাবেই দিন কাটাচ্ছিল। কিন্তু তাদের দুটো জিনিসের অভাব ছিল। একটা হলো ধন-সম্পদ অপরটি হলো সন্তান। বিয়ের বহু বছর পরও তাদের সন্তান হচ্ছিল না। অনেক ডাক্তার কবিরাজ, অনেক ওষুধ পথ্য খাবার পর আল্লাহ শেষ পর্যন্ত তাদেরকে একটি পুত্র সন্তান দিলেন। তারা সন্তানের নাম রাখলো ‘মাহির’। মাহির ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে লাগল। একদিন মাহিরের পিতা, মা’কে বলল: 'মাহির তো বড় হচ্ছে। কাজকর্ম কিছু একটা তো শেখানো দরকার। নইলে তো মানুষের কাছে হাত পাততে হবে। ভিক্ষার হাত বাড়ানোর মতো নিকৃষ্ট আর কী হতে পারে!'

স্ত্রী তার স্বামীর কথায় সায় দিল। পরের দিন সকালেই মাহির ও তার বাবার জামা কাপড় গুছিয়ে পোটলা বাঁধা হলো। রওনা দিল তারা। পাহাড় পর্বত মরুভূমি পেরিয়ে ছোট্ট একটা হ্রদের পাশে গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে বসল তারা। ক্ষিধেও লেগেছে। দুপুরের খাবার দাবারও সেরে নিতে হবে। বাবা ছেলে খাবার খেতে শুরু করল।

খাবার খেতে খেতে মাহিরের নজরে পড়লো আজগুবি এক ঘটনা। হ্রদের পানি ভেদ করে একটা লোক বেরিয়ে এলো। লোকটা মাহির এবং তার বাবার পাশে এসে বসল। আস্তে আস্তে মাহিরের বাবাকে সে বলল: 'মাহিরকে আমার কাছে দাও। আমি তাকে বিভিন্ন রকমের শিল্প ও কাজে দক্ষ করে তুলব। তিন বছর পর ঠিক এই দিনে এই জায়গায় এসে মাহিরকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যেও।'

মাহিরের বাবা রাজি হলো এবং লোকটার সাথে ছেলেকে দিয়ে ফিরে গেল বাসায়। পানি থেকে আসা লোকটা মাহিরকে নিয়ে আবার পানিতে ডুবে গেল।

ওস্তাদের বাসায় তার একটা মেয়ে ছাড়া আর কেউ ছিল না। তিন বছর ধরে মাহির জ্ঞান বুদ্ধি ও শিক্ষা অর্জন করার সময় ওই মেয়েটাই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী। যাইহোক, মাহির অনেককিছু শিখল। এতোটাই শিখল যে, স্বয়ং ওস্তাদই তাকে হিংসা করতে শুরু করে দিল।

যাই হোক, মাহিরের বাবা তিন বছর পর সঠিক দিনে সঠিক জায়গায় যেতেই মাহিরকে নিয়ে অদ্ভুত লোকটা পানি ভেদ করে বেরিয়ে এলো। মাহিরকে তার বাবার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে লোকটা চলে গেল আর মাহির বাসায় ফিরে গেল তার বাবার সাথে।

মাহিরের বাবার আর্থিক অবস্থা তো খুব খারাপ ছিল অনেকটা দিন এনে দিন খাওয়ার মতো। সেজন্যে মাহির সিদ্ধান্ত নিল তার যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে বাবার অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবে। একদিন সে বাবাকে বলল:  ‘বাবা! আমি একটা সাদা সুদর্শন তাগড়া ঘোড়ায় পরিণত হবো। তুমি আমাকে প্রতিদিন বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারবে। তবে মনে রাখতে হবে লাগামটা অবশ্যই আমার ঘাড় থেকে খুলে নিয়ে আসবে, নইলে কিন্তু আমাকে হারাবে। আর প্রতিদিন যদি তুমি লাগাম খুলে নিয়ে আসো তাহলে প্রতিদিনই আমাকে ঘোড়া বানিয়ে বিক্রি করতে পারবে। আর ঘোড়া বিক্রি করে করে তুমি ধনী হয়ে যাবে।

মাহির প্রস্তাবে রাজি হলো তার বাবা। এর পর থেকে প্রতিদিনই ঘোড়া বিক্রি করে করে একসময় বড়লোক হয়ে গেল সে। যতই ধনী হতে লাগল ততই আরো বেশি সম্পদের লোভ তাকে পেয়ে বসল।

একদিন সে ঘোড়া নিয়ে বাজারে গেলে ঘটে গেল এক অদ্ভুত ঘটনা। এক ক্রেতা এসে বলল তোমার ঘোড়াটা আমি দ্বিগুণ দামে কিনব। তবে শর্ত হলো লাগামসহ বিক্রি করতে হবে। মাহিরের বাবা লোভে পড়ে রাজি হয়ে গেল। ওই ক্রেতা ছিল মাহিরের সেই ওস্তাদ, যে কিনা পানির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল।

ওস্তাদ যখন দেখল মাহির তাকেও ছেড়ে গেছে, সেজন্যে মাহিরকে মেরে ফেলার জন্যে তাকে কিনে নিয়ে গিয়ে নিজের কব্জায় রেখে দিল।

যে শাগরেদ দক্ষতায় ওস্তাদকেও ছেড়ে যায় সেই ছাত্র যেকোনো মুহূর্তে ওস্তাদের জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে- এ চিন্তা করেই ওস্তাদ লাগামসহ ঘোড়া কিনেছিল। ওস্তাদ এখন লাগামটাকে বড় বড় পেরেক দিয়ে ভালো করে মাটিতে পুঁতে রাখল। তারপর দৌড়ে গেল ঘোড়াটাকে জবাই করার জন্যে ধারালো ছুরি আনতে।

ওস্তাদের মেয়েটা সবকিছু দেখতে পেয়ে রহস্যটা বুঝতে পেরেছিল। সে এগিয়ে এসে মাটিতে পুঁতে রাখা মাহিরের লাগামটাকে মুক্ত করে প্রান্তরে নিয়ে রেখে আসল। মাহির পুনরায় সাদা ঘোড়া বনে গেল। ঘোড়া এখন দৌড়তে শুরু করল।

ওস্তাদ সেই মুহূর্তেই সেখানে এসে যখন দেখল মাহির চলে যাচ্ছে নিজে একটা সাদা কবুতর বনে গেল। উড়তে উড়তে ঘোড়ার পিছু নিল কবুতররূপী ওস্তাদ। কবুতর উড়তে উড়তে উপরে উঠে ঘোড়ার পিছু নিল। মাহির এবার বুদ্ধি করে ঘোড়া থেকে বাজপাখিতে পরিণত হলো। বাজপাখি এবার কবুতরের পিছু নিল। আকাশে উড়তে উড়তে মাহির এক জায়গায় দেখতে পেল ধুমধাম করে বিয়ের উৎসব অনুষ্ঠান হচ্ছে। সাথে সাথে খুব সুগন্ধি ফুলের তোড়া হয়ে দফ করে গিয়ে পড়ল কনের আঁচলের ওপর। ওস্তাদও গায়ক সেজে গিয়ে হাজির হলো সেই অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে আগত লোকেরা একের পর এক সুগন্ধি ফুলের তোড়া শুঁকে শুকে এক হাত থেকে আরেক হাতে দিয়ে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে ফুলের তোড়া এসে পড়ল গায়ক ওস্তাদের হাতে।

আর যায় কোথায়। ওস্তাদ ফুলগুলোকে টুকরো টুকরো করে ফেলল। তবে ফুলের একটি শাখা ওস্তাদের হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেল। ওই শাখাটি সাথে সাথে গমের দানায় পরিণত হয়ে গেল। ওস্তাদও সাথে সাথে মোরগে পরিণত হয়ে গমের দানাগুলো খেয়ে ফেলতে শুরু করল। গমের একটি দানা হঠাৎ করেই গড়াতে গড়াতে গিয়ে পড়ল একটি গর্তে। এই দানাটিই আসলে মাহির। মাহির দ্রুত শৃগালে পরিণত হয়ে গেল।

ওস্তাদ তো এবার ধরা খেয়ে গেল। শেয়ালের সামনে তো মুরগি টিকে থাকতে পারে না, আর মুরগিটাকেও অন্য কোনো রূপ ধারণ করার সুযোগ দেওয়া হলো না। মুরগি মুরগিই থেকে গেল আর শেয়াল মজা করে মুরগিটাকে খেয়ে ফেলল।

বন্ধুরা, মাহির বুদ্ধি দিয়ে কিভাবে পানির দৈত্যকে কুপোকাত করল তার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে। আসলে আল্লাহর সৃষ্ট সকল জীবের মধ্যে মানুষের বুদ্ধি সবচেয়ে বেশি। তাই মানুষকে বলা হয় আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব।

বন্ধুরা, তোমরা হয়তো লক্ষ্যে করেছ যে, মানুষ যেমন বুদ্ধি দিয়ে নানা কায়দায় নিজেদের ঘরবাড়ি বানায়- তেমনি পাখিরাও সেরকম নানা জিনিস দিয়ে নানা কায়দায় নিজেদের বাসা বানায়। কেউ বানায় কাদা দিয়ে, কেউ বানায় ডাল-পালা দিয়ে, কেউ বানায় পালক দিয়ে, কেউ বানায় ঘাস দিয়ে; তার গড়নই বা কতরকমের- কারো বাসা কেবল একটি ঝুড়ির মতো, কারো বাসা গোল, কারো বাসা লম্বা চোঙার মতো। এক একটা পাখির বাসা দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়, তাতে বুদ্ধিই বা কতো খরচ করেছে, আর মেহনতই বা করেছে কতো।

বন্ধুরা, তোমরা অনেকেই পাখির বাসা দেখেছ। আসরের এ পর্যায়ে আমরা কয়েকটি পাখির বাসা তৈরির বিচিত্র কৌশল নিয়ে কিছু জানা-অজানা তথ্য তোমাদের জানাব।

পাখিদের বাসা তৈরির বিচিত্র কৌশল

টুনটুনি আমাদের প্রিয় পাখিদের মধ্যে অন্যতম। এরা পাতার সাথে পাতা মিলিয়ে সুন্দর বাসা তৈরি করে। ছোট্ট পাখি এরা। এদেরকে ‘দর্জি পাখি’ বলা হয়। টুনটুনি পাখি তার বাসা তৈরি করার আগে দুটি কি তিনটি পাতা সেলাই করে একটা বাটির মতো তৈরি করে; তার মধ্যে নরম ঘাস পাতা দিয়ে সে তার বাসাটি বানায়। সেলাইয়ের সুতো সাধারণত রেশমেরই ব্যবহার করে; কাছে রেশম না থাকলে যে সুতো পায় তাই দিয়ে করে। সেলাইয়ের ছুঁচ হলো তার সরু ঠোঁট-জোড়া।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্যে করেছ যে, বাবুই পাখির বাসা উল্টানো কলসির মতো দেখতে। বাসা বানাবার জন্য বাবুই খুব পরিশ্রম করে। ঠোঁট দিয়ে ঘাসের আস্তরণ সারায়। যত্ন করে পেট দিয়ে ঘষে গোল অবয়ব মসৃণ করে। শুরুতে দুটি নিম্নমুখী গর্ত থাকে। পরে একদিক বন্ধ করে ডিম রাখার জায়গা হয়। অন্যদিকটি লম্বা করে প্রবেশ ও প্রস্থান পথ হয়। কথিত আছে, রাতে বাসায় আলো জ্বালার জন্য বাবুই জোনাকি ধরে এনে গোঁজে।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয় রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতাটি শুনেছ। এখানে বাবুই আর চড়ুই পাখির বাসা নিয়ে তর্কাতর্কি হয়েছে। এ কবিতাটি থেকে তোমরা জানতে পারলে যে, চড়ুই নিজে বাসা তৈরি করতে পারে না! অন্যের ঘরে বাস করে বা ছনের চালে বাসা বাঁধে। অট্টালিকা বা ঘরের কোনে সামান্য তৃণ দিয়ে বাসা তৈরি করে। কিন্তু আরামেই থাকে। আর বাবুই পাখি বহু কষ্ট করে মাঠ থেকে বা তৃণ, পাতা ইত্যাদি সংগ্রহ করে বাসা বানায়। কিন্তু ঝড়ে বহু কষ্ট পায়। তারপরও বাবুই বলে নিজের বাসায় থেকে পরম সুখ।

বাবুইয়ের মতো কাকেরও নিজস্ব বাসা থাকে। তবে ডিম পাড়ে কোকিলের বাসায়। তবে কেবল কাকই নয়, অন্য পাখিদের বাসা দখলের ক্ষেত্রে প্রথম বলতে হবে দোয়েলের কথা। এরা আবাবিল, কাঠঠোকরা, টিয়া, বসন্তবৌরি ইত্যাদি পাখির বাসা দখল করে বাস করে। আবার নিজেরাও বাসা বানায়। বাসা বানানোর ক্ষেত্রে বোকামি করে। মানুষ চলাচল করে এমন জায়গায় বা বন্য প্রাণীর নাগালেই বাসা করে ফেলে।

কিছু পাখি পানিতে থাকে। এদের আমরা জলজ পাখি বলি। যেমন ডাহুক, কালিম পাখি ইত্যাদি জলজ পাখি পানির ওপর কলমি, শাপলা, পদ্মফুল বা জলজ কোনো উদ্ভিদের ঝোপে খড়কুটা দিয়ে বাসা বানায়। অনেক সময় পানির চলমান স্রোতে কলমি বা কচুরিপানার সঙ্গে এসব পাখির বাসাও ভেসে যেতে থাকে।

অনেক জাতের পাখি কাদা দিয়েও তাদের বাসা বানায়। আফ্রিকার ফ্লামিঙ্গোর বাসা কাদার তৈরি। একটা ঢিপির মতো কাদা সাজিয়ে তার মাঝে একটা গর্ত করে ফ্লামিঙ্গো ডিম পাড়ে।

রাজহাঁস মাটির বাসায় থাকতে ভালোবাসে। এরকম কিছু পাখি আছে শুধু বালু, পাথুরে ভূমি এবং ঝোপঝাড়ের আড়ালে মাটিতে বাসা বানায়। নীল হাঁস,বুনো মুরগি, বুনো হাঁস, সরালি হাঁস, অ্যালবাট্রস, গাঙচিল, বিভিন্ন হাঁস প্রজাতির পাখি। খোলামেলা মাটিতে বাসা হলেও ঝোপঝাড়, বালুর ঢিবি ও পাথরের চাঁইয়ের আড়ালে লুকানো বাসাগুলো সহজে কারো নজরে পড়ে না।

কোনো কোনো পাখি থুতু দিয়ে বাসা তৈরি করে। তালচোঁচ পাখি এ জাতের। পালক, ঘাস এসব জিনিস থুতু দিয়ে জোড়া লাগিয়ে তার বাসা তৈরি হয়।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১০

  

ট্যাগ

মন্তব্য