মার্চ ১২, ২০২০ ১৯:৫৩ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ১০৬ থেকে ১১৩ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ১০৬ থেকে ১০৮ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ (106) وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ (107) وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآَخِرِينَ (108)

“নিশ্চয় এটা ছিল সেই সুস্পষ্ট পরীক্ষা।” (৩৭:১০৬) “এবং আমি তার পরিবর্তে দিলাম জবেহ করার জন্যে একটি বড় জন্তু।” (৩৭:১০৭) “আমি পরবর্তীদের মধ্যে তার জন্য (সুনাম ও সুখ্যাতি) রেখে দিয়েছি।”(৩৭:১০৮)

গত আসরে আমরা বলেছিলাম, আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.) আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে উদ্যত হলে গায়েবি আওয়াজ আসে, হে ইব্রাহিম! তোমাকে স্বপ্নে যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তা একনিষ্ঠ চিত্তে বাস্তবায়ন করেছ এবং কোনো ধরনের অবহেলা প্রদর্শন করোনি। এরপর আজকের এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা ইসমাইলকে জবেহ করার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা ছিল হযরত ইব্রাহিমের জন্য একটি পরীক্ষা; হযরত ইব্রাহিমের হাতে ইসমাইলের রক্ত ঝরুক তা আল্লাহ চাননি। এই পরীক্ষার মাধ্যমে মহান আল্লাহ দেখতে চেয়েছেন তাঁর নির্দেশ পালন করতে গিয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ.) সন্তানের মায়া ত্যাগ করতে পারেন কিনা।

কাজেই যখন পিতা ও পুত্র আল্লাহর নির্দেশ পালনে নিজেদের একনিষ্ঠ প্রস্তুতি প্রদর্শন করলেন তখন আল্লাহ তায়ালা ইসমাইলের পরিবর্তে একটি বড় আকৃতির মেষ জবেহ করার জন্য হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে নির্দেশ দেন। পিতা-পুত্রের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার এই ঘটনা আল্লাহ তায়ালা এতটাই পছন্দ করেন যে, তিনি এই ঘটনাকে ইব্রাহিম (আ.)’র সুন্নত হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেন।  প্রতি বছর হজের মওসুমে যারা আল্লাহর ঘর জিয়ারত করতে যান তারা মিনা’র ময়দানে হযরত ইব্রাহিম ও হযরত ইসমাইলের স্মরণে আল্লাহর রাস্তায় একটি পশু কুরবানি করেন।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১- সন্তানের প্রতি পিতার মায়া ত্যাগ করা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে মানব জাতির জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা; যে পরীক্ষায় হযরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল আলাইহিমুস সালাম সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

২- আল্লাহর রাস্তায় পশু কুরবানি করা হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র সুন্নত যা প্রতি বছর মক্কাসহ মুসলিম দেশগুলোর আনাচে কানাচে পালন করা হয়।

৩- আল্লাহ তায়ালা নিজের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই সুন্নত জারি রাখার মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে হযরত ইব্রাহিমের সুনাম ও সুখ্যাতি ধরে রাখবেন।

সূরা সাফফাতের ১০৯ থেকে ১১১ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

سَلَامٌ عَلَى إِبْرَاهِيمَ (109) كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (110) إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ (111)

“ইব্রাহীমের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক।” (৩৭:১০৯)

“আমি এমনিভাবে সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।” (৩৭:১১০)

“নিঃসন্দেহে সে ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম।” (৩৭:১১১)

এক কঠিন ঐশী পরীক্ষায় হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র উত্তীর্ণ হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করার পর এই তিন আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর এই মহান নবীর প্রতি সালাম পাঠাচ্ছেন। কিয়ামত পর্যন্ত মুমিন মুসলমানরা কুরআন তেলাওয়াতের সময় হযরত ইব্রাহিমের প্রতি এই সালাম পাঠাতে থাকবে।  এরপর বলা হচ্ছে: শুধু ইব্রাহিম (আ.) নন যে কেউ আল্লাহর রাস্তায় তার জান-মালের যতটুকু উৎসর্গ করতে পারবে আল্লাহ তায়ালা তাকে ততটুকু পুরস্কার দান করবেন। এটা বান্দার প্রতি মহান রব্বুল আলামিনের প্রতিশ্রুতি। যে কেউ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করবে সে হযরত ইব্রাহিমের মতো আল্লাহর সালাম পাওয়ার মর্যাদা অর্জন করবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:

১- মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাঁর বিভিন্ন নবীকে সালাম পাঠিয়েছেন। আর আমাদের শেষ নবীর প্রতি আল্লাহ একা সালাম পাঠাননি তাঁর ফেরেশতারাও সালাম ও দরুদ পাঠিয়েছেন এবং ঈমানদার বান্দাদেরকেও একই কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই আমাদের উচিত মহানবী (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি বেশি বেশি সালাম ও দরুদ পাঠানো।

২- যেকোনো ভালো কাজের পুরস্কার আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে দান করবেন।

এই সূরার ১১২ ও ১১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

وَبَشَّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ نَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ (112) وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمٌ لِنَفْسِهِ مُبِينٌ (113)

“এবং আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছি ইসহাকের, সে সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে একজন নবী।” (৩৭:১১২)

“এবং তাকে ও ইসহাককে আমি বরকত ও কল্যাণ দান করেছি। তাদের বংশধরদের মধ্যে কেউ কেউ সৎকর্মশীল এবং (কেউ কেউ) নিজেদের উপর স্পষ্ট জুলুমকারী।” (৩৭:১১৩)

আগের আয়াতগুলোতে ইব্রাহিম (আ.)’র সন্তান হযরত ইসমাইলের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর এই দুই আয়াতে হযরত ইব্রাহিমের আরেক সন্তান ইসহাকের কথা বলা হয়েছে যাকে আল্লাহ তায়ালা নবুওয়াত দিয়েছেন। অন্যান্য নবীর মতো এই নবীও সৎকর্মশীল ছিলেন বলে তার প্রতি আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ ও বরকত দান করেন। কুরআনুল কারিমে এখানে যে বরকত শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে তা থেকে হযরত ইসহাক (আ.) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উপকৃত হয়েছেন। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাকে দেয়া বরকতের একটি ছিল এই যে, বনি ইসরাইল জাতির পরবর্তী নবীগণ ছিলেন তাঁর বংশধর।  অবশ্য আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ছিলেন হযরত ইসমাইল (আ.)’র বংশধর।

এই দুই আয়াতের শেষাংশে বলা হচ্ছে: হযরত ইসহাকের সব বংশধর সৎকর্মশীল ছিলেন না বরং তাদের কেউ কেউ ছিল জালেম ও গুণাহগার।  এটি হচ্ছে মানব জাতির প্রতি আল্লাহর দেয়া স্বাধীনতার অপব্যবহারের ফসল। কারো পূর্বপুরুষ সৎকর্মশীল এমনকি নবী হলেও ভ্রান্ত পথ অনুসরণ করে সে পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। চেষ্টা ও পরিশ্রম ছাড়া ঈমানের পথে অটল থাকা দুরুহ ব্যাপার। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিলে যেকোনো ঈমানদার মানুষের পথভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১- নবী-রাসূলদের বংশধরদের মধ্যেও খারাপ লোকের আবির্ভাব ঘটতে পারে। পূর্বপুরুষরা ঈমানদার ও সৎকর্মশীল বলে পরবর্তী বংশধররাও যে ভালো হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পিতা আল্লাহর বাছাই করা বান্দা হওয়া সত্ত্বেও সন্তান ঈমানের পথে অটল থাকার জন্য চেষ্টা-সাধনা না করার কারণে পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে।

২- হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর দরবারে যে দোয়া করেছিলেন তার ফলশ্রুতিতে তার প্রতি মহান আল্লাহ  অনেক বড় অনুগ্রহ দেখিয়েছেন এবং তাকে ইসমাইল ও ইসহাকের মতো নেক সন্তান দান করেছেন। আমাদেরও উচিত আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের সৎপথে পরিচালিত হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা। # 

 

ট্যাগ

মন্তব্য