মার্চ ১৩, ২০২০ ২১:৩০ Asia/Dhaka

হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টিয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, চিত্র-শিল্পী কবি, লেখক, চিন্তাবিদ, সুফি-সাধক ও রাষ্ট্রনীতিবিদ আমির আলীশির নাওয়ায়ির জন্ম হয়েছিল হিজরি ৮৪৪ সনের ১৭ রমজান মোতাবেক ১৪৪১ খ্রিস্টিয় সনের ৯ ফেব্রুয়ারি।

সেই সময়কার ইরানের হেরাত শহর ছিল তার জন্ম-স্থান। অবশ্য কেউ কেউ বলেন তার জন্মস্থান ছিল ইরানের ম'জান্দার'ন। আমির আলীশির নাওয়ায়ির পরিবার ছিল শিক্ষিত, সভ্রান্ত ও সম্মানিত পরিবার। তার বাবা গিয়াসউদ্দিন কিচকিনা ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তিনি তৈমুরি রাজবংশের শাসনামলে কিছু সময় সাবজাওয়ার প্রদেশের গভর্নর ছিলেন। তৈমুরি রাজবংশের শাসকরা ছিলেন সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পকলা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পৃষ্ঠপোষক ও অনুরাগী। ফলে এ যুগে ইরান অঞ্চল হয়ে উঠেছিল অনেক জ্ঞানী-গুণী, কবি, মনীষী ও খ্যাতনামা বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞদের লালন-কেন্দ্র। এ ধরনের জ্ঞানী-গুণীরা রাজ-দরবারের সদস্য হিসেবেও হতেন সমাদৃত। তাই দেখা যায় খোরাসানের সুলতান হুসাইন বোয়কারো'র মন্ত্রী বা উপদেষ্টা ও তার অধীনস্থ বড় প্রশাসক হিসেবেও কাজ করেছেন আমির আলীশির নাওয়ায়ি। হুসাইন বোয়কারো ছিলেন এক সময় আলীশির নাওয়ায়ির পাঠশালা-জীবনের সহপাঠী ও খেলার সাথী।

আমির আলীশির নাওয়ায়ির বাবার বাসভবনে বিশিষ্ট আলেম ও ব্যক্তিরা সমবেত হতেন। তাই শৈশবেই আলেমদের অনুরাগী হয়েছিলেন আলীশির নাওয়ায়ি। পাঠাশালার ছাত্র থাকার সময়ই অন্য ছাত্রদের চেয়ে বেশি মেধা দেখা গেছে তার মধ্যে। পবিত্র কুরআন শেখাসহ প্রাথমিক শিক্ষার নানা পর্ব খুব দ্রুত শেষ করেন তিনি।  তৈমুরি বাদশাহ শাহরুখের মৃত্যুর পর আলীশির নাওয়ায়ির ছয় বছর বয়সে তথা হিজরি ৮৫০ সনে খোরাসানে দেখা দেয় নৈরাজ্য। ফলে বৃহত্তর প্রাচীন খোরাসানের কেন্দ্রীয় শহর হেরাত ত্যাগ করতে বাধ্য হয় আলীশির নাওয়ায়ির পরিবার। এ শহর ত্যাগের সময়ই বিখ্যাত ইতিহাসবিদ বা জাফরনামার লেখক শারফুদ্দিন আলী ইয়াজদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন আলীশির নাওয়ায়ি।  হিজরি ৮৫৩ সনে হেরাতের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন আবুল কাসেম বাবর। এ সময় হেরাতে ফিরে আসে আলীশির নাওয়ায়ির পরিবার। কিন্তু আবুল কাসেমের মৃত্যুর পর আবারও অশান্ত হয়ে ওঠে হেরাত।  এ সময়  আলীশির নাওয়ায়ির বয়স হয়েছিল ১৭।

হেরাতের ক্ষমতা নিয়ে আবু সায়িদ ও হুসাইন বোয়কারো'র মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হন আবু সায়িদ।

হেরাতের ক্ষমতা নিয়ে আবু সায়িদ ও হুসাইন বোয়কারো'র মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছিল তাতে আমির আলীশির নাওয়ায়ির পরিবার বোয়কারো'র সমর্থক ছিল। কারণ তার সঙ্গে এ পরিবারের ছিল দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠতা। আবু সায়িদ হেরাতের ক্ষমতা দখল করায় আমির আলীশির নাওয়ায়ি হেরাত ত্যাগ করতে বাধ্য হন।  হেরাত ছেড়ে তিনি পবিত্র মাশহাদ শহরে আসেন এবং এরপর যান সমরকন্দে। এখানে তার শিক্ষা-জীবন কাটাতে হয়েছে খুবই কঠিন অবস্থায়। কারণ এখানেই তিনি হয়ে পড়েন দরিদ্র ও অসুস্থ।  মাশহাদ শহরে এসে নানা গুণ ও যোগ্যতা অর্জনে সচেষ্ট হন আমির আলীশির নাওয়ায়ি।  এখানে তিনি অনেক কবি এবং শেইখ কামাল ও মোহাম্মাদ খাজার শাহের মত প্রখ্যাত আলেমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বড় বড় আলেম ও কবিদের সঙ্গে সংলাপ বা আলোচনার মজলিশ অনুষ্ঠান ছিল এ সময়ে তার গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। মাশহাদে কিছুকাল থাকার পর আলীশির নাওয়ায়ি হেরাতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। কিছুকাল সেখানে থাকার পর তিনি আবারও হেরাতের পরিস্থিতির ব্যাপারে হতাশ হয়ে সমরকন্দের দিকে রওনা হন।  সেখানে তার জীবন হয়ে পড়ে খুবই কঠিন।

সমরকন্দে বিখ্যাত সুফি-সাধক ও ফকিহ খাজা আবুল লাইসের আস্তানায় থাকতেন আমির আলীশির নাওয়ায়ি।  কিন্তু শিগগিরই এ শহরের কবি-সাহিত্যিক, আলেম, গুণী  ও পন্ডিতদের মধ্যমনি হন আমির আলীশির নাওয়ায়ি। সবাই তার কাছ থেকে জ্ঞান ও নানা বিষয়ে পথ-নির্দেশনা নেয়ার জন্য ছুটে আসতেন।

 সমরকন্দেই নিজের পড়াশুনা পরিপূর্ণ করেছিলেন আলীশির নাওয়ায়ি। এখানেই তিনি ইসলামী আইন বিষয়ে পড়াশুনা করেন খাজা আবুল লাইসের কাছে। ছন্দ-বিদ্যা শেখেন দরবেশ মানসুর সাবজেওয়ারির কাছে। মাওলানা হাফেজ আলী জামির কাছে শেখেন আবৃত্তি।

সমরকন্দে আর্থিক দৈন্যতার কঠিন দিনগুলোতে দরবেশ মোহাম্মাদ তোরখান ও আহমাদ হাজি বেগের সহায়তা পান আলীশির নাওয়ায়ি। হাজি বেগ ছিলেন সমরকন্দের তৎকালীন শাসক। অবশেষে আমির আলীশির নাওয়ায়ির জীবনের কঠিন দিনগুলোর অবসান ঘটে তার উজ্জ্বল রাজনৈতিক ভূমিকা শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে। এ সময়ে তার উত্থান ঘটে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও।

হিজরি ৮৭৩ সনে হেরাতের শাসক আবু সায়িদ নিহত হন। এ সময় হেরাতের সুলতান হন আমির আলীশির নাওয়ায়ির মক্তব-জীবন বা পাঠশালার সহপাঠী হুসাইন মির্যা তথা হুসাইন বোয়কারো। হুসাইন মির্যা আলীশির নাওয়ায়িকে সমরকন্দ থেকে হেরাতে ফিরে আসার সাদর আমন্ত্রণ জানান। সেই পাঠশালার জীবনে তারা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল যে তাদের একজন যদি কখনও বড় কোনো পদে আসীন হয় তাহলে অন্যজনেরও সৌভাগ্যের ব্যবস্থা করবে। হুসাইন মির্যা সেই প্রতিজ্ঞার আলোকেই বাল্য-বন্ধুকে রাজকীয় দরবারে আসার সাদর আমন্ত্রণ জানান।  

হুসাইন মির্যা তথা হুসাইন বোয়কারোর রাজদরবারের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও যোগ্যতার পরিচয় দেন আলীশির নাওয়ায়ি। তার নানা পরিকল্পনা ও কার্যক্রমের ফলে হেরাতে হুসাইন মির্যার শাসনের ভিত্তিগুলো শক্তিশালী হয় এবং এ অঞ্চলের জনগণ নতুন সুলতানের ন্যায়-বিচার-ভিত্তিক শাসনের ছায়াতলে নানা ধরনের জুলুম ও অনাচার থেকে মুক্তি পায়।

হুসাইন মির্যা প্রথমে আলীশির নাওয়ায়িকে দেশের প্রধান সচিব বা রেজিস্ট্রার হতে বলেন। কিন্তু তিনি এই পদ গ্রহণ করতে রাজি হননি। এরপর ৮৭৬ হিজরিতে সুলতান মির্যা আলীশির নাওয়ায়িকে দেশের বিচার-মন্ত্রী হতে বলেন। এবারও তিনি প্রথমে রাজি হননি। পরে সুলতানের বার বার অনুরোধের মুখে বিচার-মন্ত্রী হন।  মন্ত্রী হিসেবে ব্যাপক যোগ্যতার পরিচয় দেন আমির আলীশির নাওয়ায়ি। কখনও কখনও সুলতানের অনুপস্থিতিতে তিনি হেরাতের অস্থায়ী সুলতানের দায়িত্বও পালন করেন।  সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক সংস্কার এনে হেরাতকে বেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ করেন  আলীশির নাওয়ায়ি। রাষ্ট্রীয় জুলুম ঠেকানো ও প্রজাদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারেও তিনি সব সময়ই সচেতন ছিলেন। তার সুশাসনে জনগণের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে। কেউ যেন কর আদায়ের ক্ষেত্রে জনগণের ওপর জুলুম করতে না পারে সে জন্য আলীশির নাওয়ায়ি নিজে নজরদারি করতেন। কৃষি-কাজের সুবিধার জন্য তিনি অনেক নহর ও ভুগর্ভস্থ খালও খনন করান। সমাজের সব শ্রেণীর উন্নয়নের জন্য সর্বাত্মক ও ব্যাপক শ্রমসাধ্য চেষ্টা চালাতেন আলীশির নাওয়ায়ি।

কিন্তু আলীশির নাওয়ায়ির জনদরদি এবং জুলুম-বিরোধী তৎপরতায় ক্ষমতালোভী ও দুর্নীতিবাজ এক শ্রেণীর আমির-ওমরাহ ও দরবারের সদস্য ইর্ষান্বিত হয়ে ওঠে। তারা তাদের দুর্নীতি ও জুলুমের পথে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ানো  মন্ত্রী আলীশির নাওয়ায়ির বিরুদ্ধে সুলতানের কানে নানা মিথ্যা তথ্য দেয়। ফলে মন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন তিনি। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ

মন্তব্য