মার্চ ১৩, ২০২০ ২১:৪৯ Asia/Dhaka

সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। আপনারা জানেন যে, ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র পণ্য সামগ্রী। এর পাশাপাশি খনি থেকেও আহরিত হয় বিভিন্ন সামগ্রী। ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়েও তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য।

গত আসরে আমরা আলোচনা করেছিলাম টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পে ইরানের অগ্রগতি নিয়ে। আমরা বলেছিলাম যে, ইরানি পোশাক শিল্পের রয়েছে বেশ সমৃদ্ধ ইতিহাস। এখানে রয়েছে পোশাক তৈরির হাজার হাজার কারখানা। রয়েছে দক্ষ পোশাক শ্রমিক ও বিশেষজ্ঞ। সেজন্য ইরানও এই পোশাক শিল্পে মোটামুটি সফল।

ইরানে যতগুলো শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেসবের মধ্যে শতকরা এগারো ভাগের বেশি হলো পোশাক শিল্প কারখানা। দুই লাখ আশি হাজারের বেশি জনশক্তি সরাসরি এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। ইরানি টেক্সটাইল শিল্পের পাশাপাশি সমৃদ্ধ আরেকটি শিল্পখাত হলো কার্পেট বুনন শিল্প। তাঁত শিল্পের এই শাখাটি ইরানে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। কার্পেট শিল্পের প্রধান দুটি শাখা রয়েছে। একটি হলো হাতে বোনা কার্পেট অপরটি মেশিনে তৈরি কার্পেট। আমরা আজকের আসরে এই কার্পেট শিল্প নিয়ে খানিকটা আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

টেক্সটাইল শিল্প সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোর অন্যতম হলো কার্পেট শিল্প। এ কারণে অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই কার্পেট শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। কার্পেট শিল্পের উন্নয়নের ফলে অন্যান্য বহু শিল্পের উন্নয়ন ঘটে। মেশিনে তৈরি কার্পেট হলো গালিচারই একটা ভিন্ন সংস্করণ। গালিচা তো হাতেও বোনা হয় কিন্তু মেশিনে তৈরি কার্পেট হাতে বোনা হয় না, মেশিনেই তৈরি হয়। মূল কার্পেট এখনও হাতেই বোনা হয় এবং হাতে বোনা কার্পেটের মূল্য প্রচুর। যেহেতু হাতে বোনা হয় না সেজন্য দ্রুত তৈরি করা যায় এই কার্পেট। তাতে সময় যেমন বেঁচে যায় তেমনি শ্রমও লাগে অনেক কম। উৎপাদনের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া মেশিনে তৈরি কার্পেটের কাঁচামাল মোটামুটি সস্তা। এইসব দিক বিবেচনায় মেশিনে তৈরি কার্পেটের দাম হাতে তৈরি কার্পেটের তুলনায় অনেক কম।

তাছাড়া উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করার কারণে যে-কোনো ডিজাইনেরই কার্পেট বানানো এখন বেশ সহজ হয়ে গেছে। মেশিনে তৈরি কার্পেটের ডিজাইন এতো নিখুঁত যে একটু দূর থেকে দেখলে বোঝা মুশকিল আসলেই কি ওইসব ডিজাইন কার্পেটে করা হয়েছে নাকি কোনো বিখ্যাত শিল্পীর নিজের কোনো ক্যানভাসে রঙ-তুলি দিয়ে আঁকা হয়েছে। হাতে তৈরি কার্পেটের সঙ্গে মেশিনে তৈরি কার্পেটের আরও একটি মৌলিক পার্থক্য হলো অ্যাক্রেলিকের মতো কিংবা প্লেসটার বা পলি-প্রোপিলিনের মতো কৃত্রিম সূতার ব্যবহার। মেশিনে তৈরি কার্পেটে অ্যাক্রিলিকের কৃত্রিম সূতা ব্যবহৃত হয় প্রচুর। প্রাকৃতিক সূতা বা আঁশের মতো পশমের সঙ্গে এই কৃত্রিম সূতার ব্যাপক মিল রয়েছে। আরও যত রকমের কৃত্রিম সূতা রয়েছে সেগুলোর তুলনায় অ্যাক্রেলিক সূতার স্থায়িত্ব বেশি। এ কারণে অ্যাক্রেলিক সূতা দিয়ে যে কার্পেট তৈরি করা হয় মেশিনের সাহায্যে সেগুলোর মূল্য মেশিনে তৈরি অপরাপর সূতার কার্পেটের তুলনায় অনেক বেশি।

অ্যাক্রেলিকের সূতা দিয়ে তৈরি করা কার্পেটে ডিজাইনও করা যায় যেমন ইচ্ছা তেমন। তার ফলে কার্পেট ব্যবহারকারীগণ এই শ্রেণীর কার্পেটের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কৃত্রিম রেশমি সূতা মানে পলিয়েস্টার সূতা দিয়েও মেশিন-কার্পেট তৈরি করা হয়। পলিয়েস্টার সূতা দিয়ে মেশিনে তৈরি কার্পেট দেখতে বেশ ঝকঝকে। এতোই ঝকঝকে যে আসল রেশমি কার্পেটকে পলিয়েস্টার সুতোর কার্পেট থেকে আলাদা করা বেশ কঠিন। এ কারণে এই পলিয়েস্টার সুতোর কার্পেটের চাহিদা অনেক বেশি। কার্পেট তৈরিতে সুতোর ব্যবহার কত বেশি তার ওপরে কার্পেটের গুণমান বিচার করা হয়। কার্পেটের ক্ষেত্রে দুটি পরিভাষা বেশ প্রচলিত। একটি হলো শনে, অপরটি তারাকোম। এগুলো প্রতি এক বর্গমিটার কার্পেটের দৈর্ঘ্যে প্রস্থে কতগুলো গিঁট ব্যবহার হয়েছে তার একটা হিসেব। এগুলোর পরিমাণের ওপর নির্ভর করেই কার্পেটের মান নির্ধারণ করা হয়। এই গিঁটের সংখ্যা যত বেশি হবে কার্পেটের বুনন তত ঘন হবে এবং অনেকটাই হাতে বোনা কার্পেটের মতো দেখতে মনে হবে। সেইসঙ্গে দামও বেড়ে যাবে।

নকশা এবং ডিজাইনও কার্পেটের মূল্যমানের আরেকটি মাপকাঠি। মেশিনে তৈরি কার্পেটে এখন জ্যামিতিক ডিজাইন, ফাইন আর্টসের মতো ডিজাইন এমনকি বাচ্চাদের জন্য কার্টুনের ডিজাইনও করা হচ্ছে। বাচ্চাদের অ্যানিমেশন ফিল্মে যেসব চরিত্র বেশ খ্যাতি পেয়েছে সেসব ক্যারেক্টার কার্পেটে খুব সহজেই ডিজাইন করা হচ্ছে। তারপরও ইরানের মূল যে কার্পেট ছিল ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা কার্পেট, সেগুলোর চাহিদা কিন্তু কমে নি। অভিজাত সেই হাতে বোনা কার্পেট মেশিনে তৈরি বিচিত্র ডিজাইনের কার্পেটের মাঝেও আপন ঐশ্বর্য ধরে রেখেছে। অভিজাত শ্রেণীর কার্পেট ব্যবহারকারীরা সেগুলোকে ঠিকই বের করে আনেন এবং পছন্দমতো কার্পেটের নান্দনিক চাহিদা মেটাতে বুননকারীদের সহযোগিতা নেন। মজার ব্যাপার হলো সেই হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা কার্পেটের ডিজাইনগুলো এখন মেশিনে তৈরি কার্পেটে লক্ষ্য করা যায়।

ইরানে মেশিনে তৈরি কার্পেটের ইতিহাস খুব বেশি প্রাচীন নয়-মাত্র অর্ধ শতাব্দীর। খ্রিষ্টীয় সত্তরের দশকে মেশিনের সাহায্যে প্রথম কার্পেট তৈরি করা হয়েছে। ইরানের ইস্পাহান প্রদেশের একটি শহরের নাম হলো কাশান। এই শহরটি কার্পেটের শহর হিসেবে পরিচিত হলেও এখানে গোলাপ ফুলের নির্যাসসহ বিচিত্র আতর তৈরির ঐতিহ্যের আবহমান ধারা বর্তমান থাকার কারণেও পরিচিত। যাই হোক কাশানে মখমল এবং রেশমি পণ্য তৈরির বহু কারখানা আগে থেকেই ছিল। এসব কারখানারই একটির নাম হলো রভান্দ। ফার্সে রভান্দ মানে রভান্দ কার্পেট। এই রভান্দ কোম্পানির কারখানাতেই চকচকে কৃত্রিম সূতা দিয়ে তৈরি করা হয় প্রথম কার্পেট। মখমলসহ কৃত্রিম সূতা দিয়ে কার্পেট বানানোর কারণে ওই কার্পেটের ওজন ছিল বেশ হালকা। হালকা কার্পেট ধোয়ার জন্য বেশ সুবিধাজনক। দেখতেও ঝকমকে। সুতরাং খুব সহজেই মেশিনে তৈরি কার্পেট ব্যবহারকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ১৩

ট্যাগ

মন্তব্য