মার্চ ১৮, ২০২০ ২২:৪৪ Asia/Dhaka

গত কয়েকটি পর্বে আমরা জেনেছি,ইসলাম ধর্মের প্রাথমিক বিস্তারের যুগ থেকে প্রায় আধুনিক যুগের সূচনা পর্যন্ত পাশ্চাত্যের বেশিরভাগ প্রাচ্যবিদদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে সব সময়ই ভুল ও অস্পষ্ট ধারণা বিরাজ করেছে এবং তারা ইসলাম-বিদ্বেষী খ্রিস্টিয় চার্চ বা পুরোহিতদের মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত হতেন।

কিন্তু পাশ্চাত্যে যখন মুক্ত-চিন্তা চর্চা বা যুক্তি-ভিত্তিক জ্ঞান-আন্দোলন তথা রেনেসাঁ আন্দোলন শুরু হয় তখন ইসলাম সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের মধ্যে ধারণা পাল্টে যেতে থাকে এবং তারা ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে অতীতের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবতা  বা সত্য উপলব্ধি করতে থাকেন। কিন্তু তারা সবাই-ই যে ইসলাম ধর্মের ও মহানবীর (সা) শতভাগ অনুরাগী ও সমর্থকে পরিণত হয়েছিলেন তা নয়।

আসলে পাশ্চাত্যে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ছিল ইসলামী সভ্যতারই প্রভাব এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের অগ্রগতির ধারা থেকেই চার্চ তথা গির্জার ধর্মীয় অজ্ঞতা ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন পশ্চিমা মনীষীদের এক বড় অংশ। এইসব মনীষী ও বুদ্ধিজীবী এবং প্রাচ্যবিদদের মধ্যে অনেকেই ইসলাম ও মহানবী সম্পর্কে নিরপেক্ষ ও উদার মন্তব্য করতে পিছপা হতেন না। দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা ইসলাম ও মহানবী (সা) সম্পর্কে ভলতেয়ার,গ্যাটে ও গিবন-এর মত পশ্চিমা কোনো কোনো প্রাচ্যবিদের বক্তব্য তুলে ধরেছি। অতীতে পাশ্চাত্যের শিক্ষিত সমাজের মধ্যে এ ধারণা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল যে এশিয়ার বা প্রাচ্যের জাতিগুলো তেমন একটা সভ্য নয় বরং বর্বর এবং ইসলাম ধর্মসহ এ অঞ্চলের ধর্ম ও ধর্মগুরুরা হিংস্র, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও অজ্ঞতার আঁধারে নিমজ্জিত। অন্যদিকে পশ্চিমা সভ্যতাই হল সবচেয়ে উন্নত এবং তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিই হল শ্রেষ্ঠ। আর পশ্চিমের এসবই হচ্ছে সত্য ধর্ম, যুক্তি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান কেন্দ্রীক! প্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ও বিকাশমান ধর্ম হিসেবে ইসলামই ছিল তাদের মিথ্যা প্রচারণার প্রধান টার্গেট।

উল্লেখ্য পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকেও অনেক প্রাচ্যবিদ ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি স্বচ্ছ ও সঠিক ধারণা রাখতেন। কিন্তু তারা প্রকাশ্যে ইসলামের সমর্থনে কথা বলার বা কিছু লেখার সাহস রাখতেন না। কোনো বইয়ে তারা ইসলাম সম্পর্কে ও মহানবী (সা) সম্পর্কে প্রশংসাসূচক কিছু লিখেছেন বলে প্রকাশ হলে শাস্তির শিকার হতেন। ফলে তাদের কেউ কেউ পরিচয় গোপন রেখে বা ছদ্মনাম নিয়ে কোনো বই বা প্রবন্ধে ইসলাম ও মহানবীর (সা) প্রশংসা করেছেন এবং বিকৃত হয়ে পড়া খ্রিস্ট ধর্মের নিন্দা করেছেন। এ ধরনের প্রাচ্যবিদদের কেউ কেউ আরবি ভাষা শেখার চেষ্টা করেছেন এবং সরাসরি পবিত্র কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন করে ইসলাম ধর্ম ও মহানবীকে (সা) জানার চেষ্টা করেছেন। ফলে তারা অনেক বেশি সত্য ও বাস্তবতা জানতে সক্ষম হন এবং পবিত্র কুরআন,মহানবীর (সা) জীবনী ও ইসলামের সত্যিকারের ইতিহাস জেনে মুগ্ধ হয়েছেন।

ইসলাম ধর্ম পবিত্র কুরআনে হযরত ঈসা,মারিয়াম ও মুসা নবী সম্পর্কে যেসব তথ্য দিয়েছে তাতে প্রাচ্যবিদদের অনেকেই বুঝতে পেরেছেন যে ইসলামই হচ্ছে একমাত্র  অবিকৃত একত্ববাদী ঐশী ধর্ম এবং ইসলাম হচ্ছে ন্যায়বিচার, যুক্তি-বিবেক ও প্রকৃতির ধর্ম। মহানবী (সা) যে সর্বোত্তম মানবীয় গুণ ও নৈতিক চরিত্রের অধিকারী ছিলেন এবং মানব সমাজে তিনিই অন্যায়-অবিচার,কুসংস্কার ও অজ্ঞতা আর ধর্মীয় অনাচার দূর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছিলেন- তাও পাশ্চাত্যের এই শ্রেণীর অনেক প্রাচ্যবিদ বুঝতে সক্ষম হয়েছেন।

মহানবীর (সা) নেতৃত্বে ইসলাম যে মানবীয় মর্যাদার প্রসার এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন ঘটিয়েছে তাও পাশ্চাত্যের এই প্রাচ্যবিদরা বুঝতে পেরেছেন। হযরত ঈসা (আ) যে মহানবীর (সা) আগমনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন সে বিষয়টিও ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব ও সত্যতার প্রমাণ বলে তারা পবিত্র কুরআন থেকে শিখেছেন।

খ্রিস্টিয় উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে যেসব প্রাচ্যবিদ ইসলাম এবং মহানবী ও তাঁর শিক্ষার পক্ষে কথা বলেছেন তাদের অন্যতম ছিলেন ক্যারোলিনভন গুন্দারোদ (Karolinevon Gunderode)। ইনি ছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সমর্থক। মহানবীর (সা) প্রশংসা করে ও তাঁকে অসাধারণ মহামানব হিসেবে তুলে ধরে তিনি একটি নাটক লিখেছিলেন। গুন্দারোদ 'মরুভূমিতে মোহাম্মাদের স্বপ্ন' বা Mahomet's dream in the desert শীর্ষক একটি কবিতাও লিখেছিলেন। এই কবিতা প্রকাশ হয় ১৮০৪ সালে। তার দৃষ্টিতে মহানবী (সা) ছিলেন অনেক উন্নত চিন্তার অধিকারী যিনি বিশ্বের প্রচলিত ব্যবস্থাগুলোয় পরিবর্তন এনে এক উন্নত আদর্শকে তুলে ধরেছেন। মহানবী (সা) কিভাবে ওহি লাভ করতেন তা তিনি শৈল্পিক কল্পনা দিয়ে তুলে ধরেছিলেন যদিও তার এই বর্ণনার শেকড় রয়েছে ইসলামী সূত্রেই। 

এর আগে 'মুহাম্মাদের সঙ্গীত'শীর্ষক কবিতার কথা আমরা বলেছিলাম। বিশ্ববিশ্রুত জার্মান মহাকবি গ্যাটে লিখেছিলেন ওই কবিতা। তিনি 'ইস্ট-ওয়েস্ট দিওয়ান' বা 'প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দিওয়ান'শীর্ষক কাব্যেও ইসলাম ও মহানবীর (সা) প্রশংসা করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে এবং গ্যাটের ওপর ইসলামের প্রভাব সম্পর্কে আমরা আরও কথা বলব আগামীতে। #

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ১৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য