মার্চ ২৫, ২০২০ ১৯:৩৭ Asia/Dhaka

ইরানের ওপর ইরাকি বাহিনীর আগ্রাসন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের সেনাবাহিনী ও তরুণ সমাজ আগ্রাসী বাহিনীকে রুখে দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায়।

ইরাকি বাহিনী ইরানের সীমান্তবর্তী কিছু শহর ও কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিলেও এক পর্যায়ে ইরানি যোদ্ধারা আগ্রাসী বাহিনীর অগ্রযাত্রা কার্যকরভাবে থামিয়ে দিতে সক্ষম হন।  ইরাকের তৎকালীন সাদ্দাম সরকার ভেবেছিল ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে নবগঠিত সরকার দেশ রক্ষা করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেবে এবং অল্প কয়েকদিনের মধ্যে গোটা ইরান দখল করে নেয়া যাবে। এই ভুল ধারনা দিয়ে আমেরিকাই বাগদাদ সরকারকে ইরান আক্রমণে উসকানি দিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এক সময়ের প্রধান মিত্র ইরানের সাবেক স্বৈরাচারী শাহ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় ইসলামি সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার নীতি গ্রহণ করে এবং সাদ্দামকে ইরান আগ্রাসনে উসকে দেয়।

আমেরিকা তার অশুভ লক্ষ্য চরিতার্থ করার জন্য যে শুধু বাইরে থেকে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল তা নয় একইসঙ্গে ইরানের ভেতরেও এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে ইসলামি বিপ্লবকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেয়ার ষড়যন্ত্র আঁটে। ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী মার্কিন দূতাবাস দখল করার ফলে সে ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। ইরানের প্রথম প্রেসিডেন্ট বনি সদর ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি ইমাম খোমেনী (রহ.) থেকে দূরে সরে গিয়ে বিপ্লব বিরোধী শিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া হিসেবে পরিচিত মার্কিন দূতাবাস থেকে পাওয়া দলিল থেকে বনি সদরের বিশ্বাসঘাতক চরিত্র সম্পর্কে অবহিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

পদাধিকারবলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বনি সদর বিপ্লবের মাধ্যমে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সেনাবাহিনীর দূরত্ব সৃষ্টি করে নিজের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেন। সাদ্দামের ইরান আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বনি সদর যেসব পরিকল্পনা পেশ করেন তার ফলে ইরানের সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দেয় এবং আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীকে মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে ওঠে। বিপ্লবের পর শাহের রেখে যাওয়া সেনাবাহিনীর বহু কমান্ডারকে নানাবিধ অপরাধী তৎপরতার কারণে ফাঁসি দেয়া হয় এবং অনেক সেনা কমান্ডার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ফলে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড রক্ষা করতে বেশ বেগ পেতে হয়। বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল তেমনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হয়ে পড়েছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার।

এরইমধ্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি প্রতিষ্ঠার পর ‘সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে দেয়া হচ্ছে’ বলে গুজব ছড়িয়ে দেয় বিপ্লব বিরোধীরা। সেইসঙ্গে নবগঠিত ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে গোম্বাদ, কুর্দিস্তান, খুজিস্তান ও বালুচিস্তানে সরকার বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ইরাকি বাহিনীর আগ্রাসনের মুখে দেশের মধ্যে যখন ঐক্য ও সংহতি দরকার তখন এসব সশস্ত্র বিদ্রোহ ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বেকায়দায় ফেলে দেয়। কিন্তু নবগঠিত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সাফল্যের সঙ্গে ওই সব বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়।

এদিকে আইআরজিসি প্রতিষ্ঠা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী রক্ষা করার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন ইসলামি বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী (রহ.)। তিনি প্রয়োজনে সেনাবাহিনীতে কিছুটা সংস্কার এনে হলেও সশস্ত্র বাহিনীর এই গুরুত্বপূর্ণ অংশকে রক্ষা করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সেনাবাহিনীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য ইমাম একটি কমিটি গঠন করে দেন। এদিকে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরান থেকে আমেরিকাকে পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য করা এবং মার্কিন দূতাবাস দখলের ঘটনায় ওয়াশিংটনে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয় তার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথাটিও তেহরান সঠিকভাবে উপলব্ধি করে। যেকোনো সময় ইরানে আমেরিকার সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা মাথায় রাখা হয়।

ইমাম খোমেনী (রহ.) নবগঠিত আইআরজিসি’র প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণার পাশাপাশি এক ভাষণে বলেন, “তোমাদের যতো ক্ষোভ আছে তা আমেরিকার বিরুদ্ধে উগড়ে দাও। যত বিক্ষোভ করতে ইচ্ছা করে আমেরিকার বিরুদ্ধে করো। নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করো, সামরিক প্রশিক্ষণ নাও এবং সবাইকে সামরিক প্রশিক্ষণ দাও। ইসলামি শাসনব্যবস্থার দেশে সবাইকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে এবং সবাইকে সার্বক্ষণিকভাবে সমরসজ্জায় থাকতে হবে।”

ইমামের এই দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণের জের ধরে ইরানের সকল তরুণকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গড়ে ওঠে বাসিজ বা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরসিজি সারাদেশে বাসিজ সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ জোর কদমে শুরু করে। এ সময় স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীতে ইমাম খোমেনী (রহ.)’র প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আইআরজিসির পক্ষ থেকে ঘোষিত ঘাঁটিগুলোতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।” এভাবে ইরানের বিশাল জনগোষ্ঠীকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করা হয়। সেইসঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর মূল ভিত্তি সেনাবাহিনীর মধ্যেও শৃঙ্খলা ও চেইন-অব-কমান্ড শক্তিশালী করা হয়।

কিন্তু এতসব প্রস্তুতি সত্ত্বেও যুদ্ধ করার প্রধান হাতিয়ার- সমরাস্ত্রের দিক দিয়ে ইরানকে মারাত্মক ঘাটতির সম্মুখীন হতে হয়। ইসলামি বিপ্লবের ফলে আমেরিকাসহ সকল পশ্চিমা শক্তির স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার কারণে তারা ইরানের কাছে সমরাস্ত্র বিক্রি বন্ধ করে দেয়। এমনকি যেসব সামরিক চুক্তির অর্থ বিপ্লবের আগেই পরিশোধ করা হয়ে গিয়েছিল সেসব চুক্তিও পশ্চিমারা রক্ষা করেনি। ইরানের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে ইরানকে সমরাস্ত্র দেয়া থেকে তারা বিরত থেকেছে। ফলে সর্বোত্তম সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী একটি বিশাল জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্রের অভাবে  সর্বাত্মকভাবে দেশরক্ষার মতো কাঙ্ক্ষিত প্রস্তুতিতে পৌঁছাতে পারেনি।

অবশ্য সামরিক বাহিনীর এই যুদ্ধপ্রস্তুতি বহিঃশক্তিকে মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট না হলেও অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনে তারা ব্যাপক সাফল্য লাভ করে। বিশেষ করে, ইরানের কুর্দিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা দমনে আইআরজিসি উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করে। কিন্তু দেশের নির্বাহী বিভাগের প্রধান অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট বনি সদরের অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার কারণে সশস্ত্র বাহিনীর সবগুলো শাখার মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এরকম একটি অবস্থায় ইরাকি বাহিনী ইরানের ওপর আগ্রাসন চালালে নয়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর তরুণদের পাশাপাশি আইআরজিসি’র জওয়ানরা ন্যুনতম সমরাস্ত্র নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

প্রেসিডেন্ট বনি সদর প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে গড়িমসি করার কারণে তার নির্দেশের অপেক্ষা না করেই বিপ্লবী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশ রক্ষায় আত্মনিয়োগ করে। আমরা আগেই বলেছি, ইরানের আপামর জনসাধারণ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে খোররামশাহরের পতন ৩৪ দিন পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। তারপরও ইরাকি বাহিনী ইরানের কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিতে সক্ষম হয় এবং ইরাকি শাসক সাদ্দাম নিজের ইচ্ছেমতো যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার মিথ্যে আশায় দখলীকৃত এলাকায় সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করেন।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ২৫

ট্যাগ

মন্তব্য