এপ্রিল ০৪, ২০২০ ১৯:১২ Asia/Dhaka

বন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। আপনারা জানেন যে, ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র পণ্য সামগ্রী।

এর পাশাপাশি খনি থেকেও আহরিত হয় বিভিন্ন সামগ্রী। ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়েও তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য।

গত আসরে আমরা আলোচনা করেছিলাম শোভা বৃদ্ধি করে এমন বাহারি ফুল ও উদ্ভিদ নিয়ে। ইরানের বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে এই ফুল ও উদ্ভিদের নার্সারি। অন্তত চার হাজার হেক্টর ভূমিজুড়ে এখন এই নার্সারি শোভা পাচ্ছে ইরানে। বিশ্বব্যাপী তাই ইরানের উদ্ভিদ ও ফুল চাষের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে।

প্রাচীন ইরানের রাজা-বাদশাদের শিল্পরসিক মনের কথা উল্লেখ করার মতো। তাদের প্রাসাদে গেলে লক্ষ্য করা যাবে ইরানিদের হাতে বোণা দারুন সব কার্পেটের সমাহার। এসব কার্পেটের ডিজাইনগুলোতেও ফুল এবং উদ্ভিদের জমকালো উপস্থিতি ছিল। কেবল রাজা-বাদশাই নয় প্রাচীন ইরানি কবি সাহিত্যিকদের মাঝেও ছিল ফুল এবং উদ্ভিদের প্রতি প্রবল অনুরাগ। কবিগণ বিভিন্ন ফুলকে বিভিন্ন প্রতীকে ব্যবহার করে অমর হয়ে আছেন বিশ্ব সাহিত্যে। লাল গোলাপ, জুঁই ফুল, নারগিস ফুল, শাকায়েক ফুল অ্যানিমোন করোনারিয়া, টিউলিপ ও গোলাপ ইত্যাদি ফুলের প্রতীকী ব্যবহার বেশ লক্ষনীয়। কোনো কোনোটি পবিত্রতা এবং নিষ্পাপ ঐশ্বর্য বোঝাতে, কোনোটিকে প্রাণ হারানো অর্থে, কোনোটিকে শাহাদাতের প্রতীকে আবার কোনো কোনো ফুলকে প্রেম-প্রীতি, বালোবাসা ও বন্ধুত্ব বোঝাতে ব্যবহার করেছেন কবিগণ। এসব প্রতীক পাঠক হৃদয়কে সহজেই মোহাবিষ্ট করে তোলে।

অনেক ভ্রমণরসিকই মনে করেন বসন্ত ঋতু মানে ফার্সি উর্দিবেহেশত মাস মোতাবেক এপ্রিলের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু করে জুলাইর শেষ পর্যন্ত সময়টাতে ইরানের বিভিন্ন শহর সফর করার খুবই উপযোগী একটা সময়। বিশেষ করে বিশ্বজনীন প্রতিভা কবি হাফিজ ও সাদি'র মাজার সমৃদ্ধ শিরাজ শহরে বেড়ানোর সবচেয়ে ভালো সময় এই বসন্ত।  এ সময়টাতে শিরাজ শহরের অলিগলি, রাস্তাঘাট আর স্কোয়ারগুলোতে যেসব ফুলের সমাহার লক্ষ্য করা যায় সেগুলোর ঘ্রাণে মৌ মৌ করে পুরো শহর। বিশেষ করে বাহরে নরাঞ্জ বা অরেঞ্জ ব্লোসমের ঘ্রাণ নাকে লেগে থাকে যেন। না কেবল শিরাজেই নয় বরং এই বসন্ত ঋতুতেই বলা যায় সমগ্র ইরান জুড়েই বিরাজ করে রঙ বেরঙের বিচিত্র ফুলের সমারোহ। দৃষ্টিনন্দন এই ফুলের দৃশ্য ভ্রমণকারীদের চোখে লেগে থাকে যেন।

মাহাল্লত কিংবা খোমেইনের মতো এলাকাগুলো বিচিত্র রঙীন ফুলের সমারোহ ছাড়াও সবুজ উদ্ভিদে ভরে থাকে এ সময়। দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় কিংবা কেন্দ্রিয় এলাকার খোলা প্রান্তরগুলোও লালে লাল, হলুদে হলুদাভ হয়ে ফুটে থাকে টিউলিপ ফুলে ফুলে। আরও একটি ফুল লাল রঙের দেখা যায় এ সময়ের প্রান্তরগুলোতে। সে ফুলের নাম হলো অ্যানিমন। এটি দেখতে টিউলিপের মতোই তবে পাপড়িগুলো পাতলা এবং ফুলের মাঝখানে কালো রঙের পরাগের বৃত্ত দেখা যায়। এ দুটি ফুলের বাইরে আরও যে ফুলটি দেখতে পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে তা হলো ভজগুন টিউলিপ মানে অধোমুখি টিউলিপ। এই অধোমুখি হবার নেপথ্য কারণ সম্পর্কে আমরা ইতোপূর্বে একটি গল্প বলেছি, আশা করি মনে আছে আপনাদের।                              

আমরা গোলাবজল বলতে যা বুঝি ফার্সিতে তাকে শুধু গোলাব বলে। গুল মানে ফুল আর অব মানে পানি। তার মানে গোলাব হচ্ছে ফুলের পানি যাকে আমরা নির্যাস বলে থাকি। এই গোলাব বা গোলাবজল তৈরির মওসুম হলো এই বসন্ত। বিশেষ করে লাল গোলাপের নির্যাস কিংবা আতর তৈরি করা হয় এ সময়। ফার্স প্রদেশে অবস্থিত মেইমান্দ শহর এবং ইস্ফাহান প্রদেশে অবস্থিত কামসার এবং কাশান শহরের মতো আরও বহু শহরে এ সময়টায় ফুলের নির্যাস তৈরির উৎসব হয়। সূর্য ওঠার আগেভাগে ফুল তুলে নিয়ে একটা বিশেষ পদ্ধতিতে ফুলের নির্যাস তৈরির কাজটি করা হয়।প্রাকৃতিকভাবে তো ফুলের গাছ হয়েই থাকে, তার পাশাপাশি ফুলের অর্থকরী দিকটির প্রতি খেয়াল রেখে ফুলের চাষও করা হয় এখন ব্যাপকভাবে। পরিবেশকে সুন্দর করে সাজানোর জন্য বাহারি ফুলের চাষ এখন বাণিজ্যিকভাবে করা হচ্ছে। সমগ্র দেশে ফুল চাষের প্রাচুর্য এখন শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

ইরানে ফুলের অর্থনৈতিক উৎপাদনের ইতিহাসও অন্তত এক শতাব্দির কম নয়।ইরানে আবহাওয়াগত বৈচিত্র্য থাকার কারণে ফুল এবং নার্সারির বাইরেও বিচিত্র উদ্ভিদ বিশেষ করে বাহারি উদ্ভিদের বৈচিত্র্য ও  উৎপাদনের দিক থেকে ব্যাপক অগ্রসর। বিশ্বের দরবারে তাই ইরানের অবস্থান বেশ সমৃদ্ধ এবং উচ্চ পর্যায়ে। এমনিতেই ইরানের মাটি ফুল ও উদ্ভিদ উৎপাদনের উপযোগী। তারপরেও চাহিদার প্রাচুর্যের কারণে গ্লাসের দেয়ালময় গ্রিন হাউজও গড়ে উঠেছে ব্যাপক হারে। ইরানে প্রাচীনতম গ্রিন হাউজের বয়স সত্তর বছরের বেশি। শুরুর দিকে এইসব গ্রিন হাউজ বাণিজ্যিক ছিল না, অবকাশ যাপনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির জন্যই ব্যবহৃত হত। ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের আগে এসব বাহারি উদ্ভিদ বাইরে থেকে সংগ্রহ করা হত। ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর ফুল আমদানি নিষিদ্ধ করা হয় এবং দেশের অভ্যন্তরেই ফুলের চাষ শুরু করা হয়। সেই থেকে ইরানের ফুল ও উদ্ভিদের চাষ ব্যাপকতা লাভ করে। জনগণও এই ফুল চাষকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে এবং ফুলের বিচিত্র ব্যবহারও শুরু হয়।ফুল এখন ইরানি সংস্কৃতির অন্যতম একটা অংশে পরিণত হয়েছে।    

ফুল চাষে ইরানে বিদেশি বিনিয়োগ প্রচুর। হল্যান্ডের একটি কোম্পানি তো ইস্ফাহান প্রদেশে ফুলের বিশাল বাগান গড়ে তুলে নাম দিয়েছে হল্যান্ডি টিউলিপ। ইরান এখন বছরে পঞ্চাশ কোটি ডলার সমপরিমাণের ফুল ও উদ্ভিদ রপ্তানি করছে। পাঁচ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে ফুলের চাষ হচ্ছে ইরানে। ইরাক, আজারবাইজান, ইউক্রেন, মালদ্বীপ, বেলারুশ, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া, তাজিকিস্তান, কিরঘিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান এবং রাশিয়াসহ আরও বহু দেশে ইরানি ফুল রপ্তানি হয়। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ০৪

ট্যাগ

মন্তব্য