এপ্রিল ২০, ২০২০ ২০:৩১ Asia/Dhaka
  • ক্যালিগ্রাফি শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটে ইরানি মনীষী আলীশিরের যুগে

সুন্দর হস্তাক্ষরের লিখন-শিল্প বা ক্যালিগ্রাফি শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ও সমৃদ্ধি ঘটেছিল খ্রিস্টিয় পঞ্চদশ শতকে তথা তৈমুরি যুগের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী ও সুশাসক আমির আলীশির নাওয়ায়ি'র যুগে।

এক্ষেত্রে সে যুগের কোনো কোনো সুলতানসহ আমির আলীশির নাওয়ায়ি'র পৃষ্ঠপোষকতা, উৎসাহ ও নানা ধরনের অবদানও ছিল উল্লেখযোগ্য। তৈমুরি যুগের সুলতান বয়কারো, ইব্রাহিম সুলতান ও শাহরুখ তৈমুরির সন্তানরাও ছিলেন সুলেখন-শিল্পে সুদক্ষ। তারা সে যুগের শীর্ষস্থানীয় সুলেখন-শিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সুলতান বয়কারো 'সোলস্‌' পদ্ধতির শৈল্পিক লিখনে সুদক্ষ ছিলেন। বই সংগ্রহ ও হাতে লিখে সেসব বইয়ের কপি করাও ছিল তার অন্যতম প্রধান সখ। তার লাইব্রেরি ও কর্মশালায় ৪০ জন সুদক্ষ সুলেখন-শিল্পী নানা ধরনের বই কপি করতেন। ফেরদৌসির মহাকাব্য শাহনামার কপি করা হত এখানে। ইব্রাহিম সুলতানও সুলেখন শিল্পে এতটাই দক্ষ ছিলেন যে তার লেখার সঙ্গে হিজরি সপ্তম শতকের প্রখ্যাত সুলেখন-শিল্পী ইয়াকুত মুস্তাসিমি বাগদাদির লেখার পার্থক্য করা হত খুবই কঠিন।

হেরাতের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির বিকাশসহ এসবের নানা দিক বিশেষ করে চিত্র-কলা ও সুলেখন শিল্পের নানা অঙ্গনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রখ্যাত ইরানি মনীষী ও সুশাসক আমির আলীশির নাওয়ায়ি'র অমূল্য অবদান। হাতে লিখে বইয়ের কপি করা, বইয়ের কভারসহ নানা অংশে ছবি ও সুদৃশ্য নানা ধরনের নক্সা আঁকার  মত নানা ধরনের সূক্ষ্ম  শিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন আলীশির নাওয়ায়ি। তিনি নিজেও ছিলেন এইসব শিল্পের উচ্চ পর্যায়ের শিল্পী। আলীশির নাওয়ায়ি হেরাতকে পরিণত করেছিলেন কবিতা, সাহিত্য, সঙ্গীত,  চিত্র-কলা, সুলেখন-শিল্প বা ক্যালিগ্রাফি ও বইয়ের সাজ-সজ্জা শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে। আলীশির নাওয়ায়ির সৌজন্যে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা ছিল বলে বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পী ও জ্ঞানী-গুণিরা ভিড় জমাতেন হেরাতে। তার আমলেই হেরাতের চিত্র-কলা ও সুলেখন-শিল্প বিশেষ সুখ্যাতির অধিকারী হয় এবং এইসব শিল্প আলীশির নাওয়ায়ির পৃষ্ঠপোষকতার সুবাদে হেরাতের আশপাশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে।

আমির আলীশির নাওয়ায়ির প্রতিষ্ঠিত নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞান ও নানা ধরনের শিল্প বিষয়ে শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি সুলেখন শিল্পের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং এ শিল্পের প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হেরাতের নিজামিয়া মাদ্রাসা, শাফায়িয়ে মাদ্রাসা,এখলাসিয়ে মাদ্রাসা ও মার্ভের খসরুইয়ে মাদ্রাসার নাম উল্লেখযোগ্যআলীশির নাওয়ায়ির প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরিটি ছিল সে যুগের বিখ্যাত লাইব্রেরিগুলোর অন্যতম। এ লাইব্রেরি ছিল সুলেখন-শিল্প ও চিত্রকলাসহ নানা ধরনের সুকুমার ও সৌখিন শিল্পে দক্ষ এবং প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের শিল্প-চর্চার এক বড় কেন্দ্র। আলীশির নাওয়ায়ি বহু মূল্যবান ও দুর্লভ বইয়ের কপি লেখা ও সঙ্কলনের কাজে সুলেখন শিল্পী এবং বইয়ের চিত্রকর ও সাজ-সজ্জার শিল্পীদের ব্যবহার করেছেন। আর এসব কাজে তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থও ব্যয় করেছেন। যেসব বই তিনি কপি করাতেন সেসবের মধ্যে থাকতো পবিত্র কুরআনসহ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বই এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বই। আলীশির নাওয়ায়ির কপি-করানো সেইসব বই এখনও টিকে আছে।

সুলেখন শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, কল্যাণ ও বিশ্রাম বা বিনোদনের জন্যও ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন আলীশির নাওয়ায়িআর এ জন্যই সে যুগে নির্বাহী, প্রশাসনিক ও শিল্প-কর্ম সৃষ্টির কাজে লিখন-শিল্পীদের ব্যবহার করা হত।  আমির আলীশির নাওয়ায়ির উৎসাহ ও সুদৃষ্টির কারণে মির আলী তাব্রিজি, জাফর বয়সাঙ্কারি ও আজহার তাব্রিজির মত  প্রখ্যাত সুলেখন-শিল্পীরা বিপুল বা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিল্প-কর্ম উপহার দিতে পেরেছিলেন।

আমির আলীশির নাওয়ায়ির লাইব্রেরিতে হস্তলিখন শিল্পের কাজ করতেন মাওলানা সুলতান আলী মাশহাদি, খাজা মোহাম্মাদ হাফেজ, মাওলানা সুলতান আলী কয়েনির মত প্রখ্যাত সুলেখন-শিল্পীরা। তারা নাস্তা'লিক স্টাইলসহ নানা  স্টাইলের লেখায় অভ্যস্ত ছিলেন। তারা নাস্তা'লিক স্টাইলটি বেশি মাত্রায় ব্যবহার করতেন বই কপি করার কাজে। আর অন্যান্য লেখার কাজে ব্যবহার করতেন সোল্‌স, রাইহান, মুহাক্কাক, নাস্‌খ, তৌকিই, রেকা ও কুফি স্টাইল। তাদের শিল্পকর্মের নানা নমুনা দেখা যায় ইরান ও বিশ্বের নানা অঞ্চলের জাদুঘরে।

নাস্তা'লিক স্টাইলের লিখন শিল্পের বিখ্যাত শিল্পী মাওলানা সুলতান আলী মাশহাদি যৌবনে হেরাতে আসেন সুলতান আবু সায়িদ মির্জার আমন্ত্রণে এখানে আসার পর এক সময় তিনি সুলতান হোসাইন বয়কারো ও আমির আলীশিরের সুদৃষ্টি পান। রাজকীয় লাইব্রেরিতে ঠাঁই-পাওয়া সুলতান আলী মাশহাদিকে বলা হত সুলতানুল খাত্তাতিন বা সুলেখন শিল্পীদের সুলতান। তিনি তার শিল্পকর্মের মধ্যে নিজের পরিচয় হিসেবে কেবল সুলতান নামটি উল্লেখ করতেন।

আমির আলীশির তার 'মাজালেসুন্নাফায়িস' শীর্ষক বইয়ে সুলতান আলী মাশহাদির উচ্চতর যোগ্যতার প্রশংসা করেছেন। এ বইটির মূল কপি সুলতান আলীর হাতেই লেখানো হয়েছিল। তৈমুরি যুগের বেশিরভাগ শাহজাদা ও দরবারের লোকদের  মাজারে বা কবরের পাথরের ওপর লিখেছেন সুলতান আলী মাশহাদি।  সুলতান আলী ক্যালিগ্রাফিতে এতটাই জনপ্রিয় হন যে বড় বড় সুলেখন শিল্পীরাও তার শিল্প-কর্মের কপি সংগ্রহ করতেন। খাজা আবদুল্লাহ আনসারীর মাজারসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির মাজারের পাথরের ওপর নিজের লিখন-শিল্পের চমৎকার নমুনা রেখে গেছেন সুলতান আলী মাশহাদি।

মাওলানা সুলতান আলী মাশহাদি তার অনিন্দ্য-সুন্দর হস্তলিপিতে লিখেছেন তথা কপি করেছেন বেশ কয়েকটি বিখ্যাত বই। যেমন, ওমর খৈয়ামের 'রুবাইয়াতে খাইয়াম', নিজামির 'মাখজানুল আসরার',  মহাকবি হাফিজের 'দিওয়ানে হাফেজ', শেখ সা'দির 'বুস্তান' ও খাজা আবদুল্লাহ আনসারির 'মুনাজাতনামেহ' ইত্যাদি।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ

মন্তব্য