এপ্রিল ২২, ২০২০ ২২:০০ Asia/Dhaka

আজ আমরা ইরানে গেরিলা যুদ্ধের কমান্ড সেন্টার স্থাপন সম্পর্কে কথা বলব এবং এ ব্যাপারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর স্মৃতিচারণ শুনব।

গত কয়েকটি আসরে আমরা বলেছি, ইরাকের তৎকালীন সাদ্দাম সরকার এমন সময় ইরানে আগ্রাসন চালিয়েছিল যখন সাবেক স্বৈরাচারী শাহ সরকারের পতনের পর দেশের  রাজনৈতিক, সামরিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোগুলোকে পুনর্গঠনের কাজ চলছিল। একইসঙ্গে ইসলামি বিপ্লবকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়ার লক্ষ্যে দেশি –বিদেশি ষড়যন্ত্রেরও মোকাবিলা করতে হচ্ছিল। এরকম অবস্থায় ইরানের দেশপ্রেমিক জনগণ আগ্রাসী সাদ্দাম বাহিনীকে পরাজিত করার লক্ষ্যে দলে দলে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হয়। এ সময় তেহরান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ড.মোস্তফা চামরান ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ করার জন্য দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় খুজিস্তান প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর আহওয়াজে একটি কমান্ড সেন্টার স্থাপন করেন। এই কাজে তাকে সহযোগিতা করেন ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী।

সে সময় আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী ছিলেন সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা পরিষদে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা ইমাম খোমেনী (রহ.)’র প্রতিনিধি,সংসদ সদস্য এবং তেহরানের জুমার নামাজের খতিব। আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে সাধারণ জনগণ ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে গেরিলা যুদ্ধ করার লক্ষ্যে অনিয়মিত যুদ্ধের কমান্ড সেন্টার স্থাপন করা হয়। দুর্বল সামরিক বাহিনী ও তুলনামূলক কম যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে একটি সুসজ্জিত ও নিয়মিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হলে গেরিলা যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই। ড. চামরান আগ্রাসী সাদ্দাম বাহিনীকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে সঠিক সময়ে এই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন।

সে সময় ইরাকি বাহিনী খুজিস্তান প্রদেশের সবচেয়ে বড় ও জনবহুল শহর আহওয়াজের প্রবেশমুখের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। আহওয়াজ শহরের পতন হলে যুদ্ধের মোড় পাল্টে যেতে পারত এবং ইরাকি শাসক সাদ্দাম গোটা খুজিস্তান প্রদেশ দখলের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে অনেকখানি এগিয়ে যেত।

 

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী যুদ্ধের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করতে গিয়ে বলেন, “ইরাকিদের আড়াই ডিভিশন সেনার মোকাবিলায় আমাদের ছিল মাত্র এক ব্রিগেড সৈন্য। কিন্তু সেই ব্রিগেডের যুদ্ধ করার পারদর্শিতা একটি ব্যাটেলিয়ানের সমানও ছিল না! অথচ আমাদের সেই এক ব্রিগেড সেনার ভয়ে ইরাকিরা সামনে অগ্রসর হচ্ছিল না। আগ্রাসী সেনারা আহওয়াজ শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে থেমে গিয়েছিল।”

গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কে আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী আরো বলেন, “আমাদের সেই দুর্বল একটি ব্রিগেডের ভয়ে ইরাকিরা সামনে অগ্রসর হচ্ছিল না। আমাদের যুদ্ধের ধরণ দেখে ওরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আমাদের জওয়ানরা ৫০/৬০ জনের দল গঠন করে শত্রু সেনাদের ভেতরে ঢুকে গিয়ে হামলা চালাত। ইরাকি সেনাদের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, তাকে সেনাসমুদ্র বললেও অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু তারপরও তাদের ভেতরে ঢুকে আমাদের যোদ্ধারা হামলা চালিয়ে আসত। দেখা যেত, এক আক্রমণে কয়েকটি ইরাকি ট্যাংক ধ্বংস করে দিয়ে ফিরে আসত।  ইরানি যোদ্ধারা শত্রুসেনাদের সংখ্যা দেখে ভয় পায়নি। তারা উল্টো ইরাকি বাহিনীকে দুর্বল মনে করে তাদের দিকে এগিয়ে যেত এবং অকুতোভয় হামলা চালিয়ে ফিরে আসত। ”

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তাঁর দেশের যোদ্ধাদের এই সাহসিকতার পেছনে ঐশী মদদ ছিল বলে মনে করেন। তিনি এ সম্পর্কে আরো বলেন, “আমি এই ঐশী মদদের বিষয়টি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের যোদ্ধাদের চোখে যে নিজেদের অল্প সংখ্যাকে অনেক বেশি এবং শত্রুদের বেশি সংখ্যাকে অনেক কম বলে প্রতীয়মান হচ্ছিল সেটি আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। আর আল্লাহর সাহায্য এসেছিল আমাদের যোদ্ধা ও জওয়ানদের একনিষ্ঠ চিত্তে আল্লাহর ইবাদত ও তাকে স্মরণ করার কারণে।

আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী সাদ্দামের আগ্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন এবং শাহাদাতের দরজা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসেন। তিনি এ সম্পর্কে বলেন, একদিন শহীদ চামরানের সঙ্গে আহওয়াজ শহরের পশ্চিমে অবস্থিত ‘দাব্বে হারদান’ ফ্রন্টে যাই।  সুসাংগার এলাকার পাশ দিয়ে যে মহাসড়কটি চলে গেছে সেটি নিয়ে আমরা অগ্রসর হই। ফ্রন্টে গিয়ে দেখি আমাদের যোদ্ধারা কামান প্রস্তুত করে শত্রুসেনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমরা আরেকটু সামনে এগিয়ে যাই শত্রুর অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য। এ সময় ড. চামরান আমাকে বলেন, আপনি এখানে অবস্থান করুন আমি কয়েকজনকে নিয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছি। আমি তার সঙ্গে যেতে চাইলে তিনি আমাকে যেতে নিষেধ করেন।

এরপরের ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, হঠাৎ করে আমাদের আশপাশে কামানের গোলাবর্ষণ শুরু হয়ে যায়। গ্রীষ্মের ভরদুপুরে আমরা একটি বড় গাছের নীচে বসেছিলাম। আগ্রাসী ইরাকি বাহিনী দূর থেকে ওই গাছটি লক্ষ্য করে কামানের গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় আমরা সবাই শুয়ে পড়ে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা যায়, ইরাকিরা গোলাবর্ষণ বন্ধ করছে না বরং গোলাবর্ষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। এ সময় সহযোদ্ধাদের নিয়ে আমি পেছনে তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আমরা সরে যাওয়ার পরও গোলাবর্ষণ অব্যাহত থাকে কিনা তা দেখা। পেছনে সরে যাওয়ার মুহূর্তে আবারো গোলাবর্ষণ করলে আমরা আবার শুয়ে পড়ে আত্মরক্ষা করি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, এত গোলাবর্ষণের মধ্যেও আমাদের গায়ে কোনো গুলি লাগেনি। এটি আল্লাহর বিশেষ রহমত ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। এরইমধ্যে একটি গোলা এসে ঠিক আমাদের পাশে মাটিতে আঘাত হানে। গোলাটি থেকে চারদিকে স্প্লিন্টার ছুটে বের হচ্ছিল। আমাদের পাশেই ছিল একটি ছোট্ট পানির নালা। সেই নালার মধ্যেও গিয়ে স্প্লিন্টার পড়ছিল এবং পানিতে সে শব্দ শোনা যাচ্ছিল। প্রচণ্ড উত্তপ্ত লোহা পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিশেষ শব্দ করে তলিয়ে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় আমরা আরেকটু পেছনে সরে যাই। এমন সময় দেখি, আমরা কয়েক মুহূর্তে আগে বড় গাছটির নীচে যে জায়গায় বসেছিলাম ঠিক সেই জায়গায় একটি কামানোর গোলা আঘাত হেনেছে। আমরা যদি সে সময় সরে না আসতাম তাহলে আমাদের দলের ৬/৭ জনের মধ্যে এসে গোলাটি পড়ত এবং আমরা সবাই শহীদ হয়ে যেতে পারতাম। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ২২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য