এপ্রিল ২৩, ২০২০ ২০:১৬ Asia/Dhaka

গত আসরে আমরা আলোচনা করেছিলাম ইরানের সবুজ জিরা এবং গোলাপ ফুল তোলা ও গোলাপ দিয়ে তৈরি বিচিত্র প্রোডাক্ট নিয়ে। ইরানের ফার্স প্রদেশ, কেরমান ও ইস্পাহান প্রদেশ, চহর মাহল ভা বাখতিয়রি প্রদেশ, হামেদান, সেমনান এবং ইয়াজদ প্রদেশেও গোলাপের চাষ হয়। অন্তত আঠারো প্রকারের গোলাপ ফুলের চাষ হয় ইরানে।

এগুলো থেকে নেয়া নির্যাস মানে গোলাপজলের মধ্যেও একটি থেকে অন্যটির পার্থক্য রয়েছে। তবে সবচেয়ে ভালো মানের গোলাপজল হয় কাশানে। কাশানের গোলাপজল বিশ্বব্যাপী সমাদৃতি পেয়েছে। এই কাশানের গোলাপজল দিয়েই মক্কায় আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা শরিফের দেয়াল ধোয়া হয়। কাশানের কামসারে গড়ে উঠেছে গোলাপজল তৈরির অসংখ্য কারখানা। গোলাপফুল তোলার উৎসব হয় কাশানে। শুধু কাশানই নয় যেসব এলাকায় গোলাপ চাষ হয় প্রায় সব এলাকাতেই এই উৎসব হয়। এই উৎসব দেখার জন্য উপভোগ করার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তো বটেই বাইরে থেকেও বহু লোকজন এসে জড়ো হয়। আজকের আসরে আমরা আলাপ করবো অন্য একটি ফুল নিয়ে। এই ফুলটিকে ফার্সিতে বলা হয় গোলে গভজাভন। ইংরেজিতে এর দুটি নাম পাওয়া যায় - একটি একিয়াম অপরটি বোরেজ।

শুরুতেই দুটি নামের রহস্য উন্মোচন করা যাক। গোলে গভজাভন আসলে ইরানি এবং ইউরোপীয়-এই দুই ভাবে পরিচিত। ইরানি গভজাভনকে ইসিয়াম আর ইউরোপীয় গভজাভনকে বোরেজ বলে অভিহিত করা হয়েছে। বাইন্নার দোকান নামে এক ধরনের দোকান আছে বাংলাদেশে। ইরানে এ জাতীয় দোকানকে বলা হয় আত্তরি। এই আত্তরি বা বাইন্নার দোকানে বিচিত্র মশলা এবং ভেষজ ওষুধ জাতীয় জিনিসপত্র বিক্রি হয়। ইরানে এই আত্তরি পেশাটির ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ। যারা এই পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা বিশ্বস্ত এবং প্রভাবশালী ছিলেন। এর কারণ হলো তারা মোটামুটি জ্ঞানী ছিলেন বিশেষ করে বিচিত্র ফুলের নির্যাস এবং আতরের সঙ্গে তাদের পরিচিতি ছিল এবং তারা জানতো কোন ফুল ও ভেষজের কী গুণ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোন অসুখের জন্য কোন হার্বাল ওষুধ প্রযোজ্য।

ইউনানি চিকিৎসায় এইসব ভেষজের ব্যবহার বেশি। আমাদের দেশে এই চিকিৎসাকে কবিরাজি চিকিৎসা বলে চেনে সবাই। আর চিকিৎসকদেরকে বলা হয় কবিরাজ বা হেকিম। কবিরাজরা যখন কোনো রোগিকে চিকিৎসা দেন তখন রোগি তার প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ করতে এইসব আত্তরি বা বাইন্নার দোকানে আসে। আত্তররা মানে বাইন্নার দোকানদাররা ওইসব ওষুধ তৈরি করে দিতে দিতে নিজেরাও অভিজ্ঞ হয়ে যায় এবং সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেরাই রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত হয়। অবশ্য উত্তরাধিকারসূত্রে বাবা-দাদা কিংবা ওস্তাদদের কাছ থেকেও এই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতেন তারা। অতীতের ইতিহাস মোটামুটি এরকমই ছিল। বলাবাহুল্য এই হারবাল চিকিৎসা একসময় ইরানের অন্যতম চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু ছিল এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ওই চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনও চালু আছে।

সাধারণত হার্বাল ওষুধ তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক উপাদান সংগ্রহ করতে এমন একজন চেষ্টা চালাতেন যিনি এই ওষুধি উদ্ভিদ সংগ্রহ করেই নিজের জীবিকা নির্বাহ করতেন। সুতরাং ওষুধ তৈরি করার স্বার্থে প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ সংগ্রহ করার জন্য ওই ব্যক্তিকে চলে যেতে হতো দুর্গম পাহাড়ের বনে জঙ্গলে, মরু প্রান্তরে।সেখান থেকে উদ্ভিদ সংগ্রহ করে করে এনে দিতেন কবিরাজ বা হেকিম এবং বাইন্নার কাছে। এখনও রাসায়নিকভাবে প্রস্তুত মানে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের পাশাপাশি সেই প্রাচীন আমলের হারবাল বা কবিরাজি ওষুধের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বেড়েই যাচ্ছে। সমগ্র বিশ্বেই এই ভেষজ ওষুধের উৎপাদন, ব্যবহার ও বাণিজ্য এখন উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের শতকরা প্রায় আশি ভাগ মানুষ বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকার মানুষ, দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জনগণ এই হারবাল ওষুধই ব্যবহার করে এসেছে এবং এখনও করছে।

এই হারবাল মেডিসিনের ব্যবহার বেড়ে যাবার বিষয়টি নিয়ে ভেবে চিন্তে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন একবিংশ শতাব্দী হয়ে উঠতে পারে হারবাল মেডিসিনের প্রত্যাবর্তনের শতাব্দী। অসুস্থতা দেখা দিলে সবার আগে হারবাল মেডিসিনকেই প্রাধান্য দিতে পারে ব্যবহারকারীরা। ট্র্যাডিশনাল চিকিৎসায় ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার ছিল প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। ভেষজ ওষুধকে তাই কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অলটারনেটিভ মেডিসিনের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্ণনা অনুযায়ী ট্র্যাডিশনাল চিকিৎসা পরিভাষাটি চীনা চিকিৎসা, ভারতীয় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা, আরবি ও ইউনানি চিকিৎসার মতোই একটি সামগ্রিক পরিভাষা। মানুষের মনোদৈহিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে এবং রোগ-ব্যাধি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ভেষজ চিকিৎসার ব্যবহারকে এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও গুরুত্ব দিচ্ছে। ট্র্যাডিশনাল চিকিৎসার দুটি মৌলিক বিভাগ রয়েছে। একটি হলো ওষুধের সাহায্যে এবং অপরটি ওষুধবিহীন। ওষুধবিহীন চিকিৎসার মধ্যে রয়েছে মেসেজ, আকুপাংচার এবং মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা।

যেসব দেশে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রাধান্য রয়েছে কিংবা আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু নেই সেসব দেশে ট্র্যাডিশনাল চিকিৎসা পরিভাষার পরিবর্তে কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অলটারনেটিভ মেডিসিন বা সম্পূরক ও বিকল্প ওষুধ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়। বিশ্বব্যাপী এখন জনগণের মাঝে এই কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অলটারনেটিভ মেডিসিন সংক্ষেপে সিএএম ব্যবহারের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। সিএএম চিকিৎসার বেশ কিছু শাখা রয়েছে। যেমন হারবাল মেডিসিন, মেসেজ, আকুপাংচার, কাইরোপ্রাকটিক, ইয়োগা, আয়ুর্বেদ ইত্যাদি। কাইরোপ্রাকটিক ট্রিটমেন্ট করা হয় শরীরের বায়োমেকানিকস এর উপর ভিত্তি করে। শরীরের অঙ্গবিন্যাস এবং শিরদাঁড়া বা মেরুদণ্ড সমন্বয় করে এবং কিছু নির্দিষ্ট ব্যায়ামের মাধ্যমে এই কাইরোপ্রাকটিক ট্রিটমেন্ট করা হয়।

কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অলটারনেটিভ মেডিসিনের যেসব শাখার কথা আমরা বললাম এগুলোর সবই আঞ্চলিকভাবে মানে স্থানীয় জনগণ ও জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য