এপ্রিল ২৬, ২০২০ ২০:৪০ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি,খ্রিস্টিয় উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে যেসব প্রাচ্যবিদ ইসলাম এবং মহানবী ও তাঁর শিক্ষার পক্ষে কথা বলেছেন তাদের অন্যতম ছিলেন জার্মান কবি ক্যারোলিনভন গুন্দারোদ (Karolinevon Gunderode) ।

মহানবীর (সা) প্রশংসা করে ও তাঁকে অসাধারণ মহামানব হিসেবে তুলে ধরে তিনি একটি নাটক লিখেছিলেন। নাটকটির নাম মুহাম্মাদ মক্কার নবী। গুন্দারোদ 'মরুভূমিতে মোহাম্মাদের স্বপ্ন' বা Mahomet's dream in the desert শীর্ষক একটি কবিতাও লিখেছিলেন। এই কবিতা প্রকাশ হয় ১৮০৪ সালে।

মানবজাতির হৃদয়-রাজ্যে মহানবীর (সা) গভীর প্রভাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই জার্মান মহাকবি গ্যাটে মহানবীকে কুলবিহীন এমন এক নদীর সঙ্গে তুলনা করেছেন যে নদীর মহত্ত্ব ও গৌরব দিনকে দিন উজ্জ্বলতর হচ্ছে এবং তিনি মানুষকে নিজের সঙ্গে করে সৌভাগ্য ও শুভ পরিণতির চিরন্তন আবাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন বলে উল্লেখ করেছেন।

জার্মান মহাকবি গ্যাটে জীবন ও আচার-আচরণকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। আত্মাকে শক্তিশালী করার জন্য সাধু-সন্ন্যাসী ও সুফিরা যেসব উপদেশ দিতেন এবং কষ্ট সহ্য করার যে পরামর্শ দিতে তা তার কাছে ভালো লাগত না। গ্যাটে মৃত্যুকে ধ্বংস হওয়া বলে মনে করতেন না,বরং একে রূপান্তর বা পরিবর্তন বলে মনে করতেন। গ্যাটে মনে করতেন সব সত্তা বা অস্তিত্বই মৌলিক ও চিরন্তন। আর এ দৃষ্টি দিয়েই তিনি মহানবীর শিক্ষাকে মুক্তির প্রেরণা হিসেবে হৃদয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন। ২৩ বছর বয়সে গ্যাটে তার বন্ধু হেরদের-এর কাছে পবিত্র কুরআনের ইরফানি বিষয়বস্তু বা ভাবধারার আকর্ষণ সম্পর্কে কথা বলেছিলেন এবং সুরা ত্বাহায় মহান আল্লাহ ও মুসা নবীর কথোপকথন সম্পর্কে যে বর্ণনা এসেছে সে দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি তার বন্ধুকে লিখেছিলেন: মুসার মত ইবাদত করতে চাই যেমনটি পবিত্র কুরআনে এসেছে- হযরত মুসা (আ) বলেছেন,হে আমার প্রতিপালক! আমার বক্ষকে প্রশস্ত করে দিন!

জার্মান মহাকবি গ্যাটে ইসলামের মহানবীর (সা) চিরন্তন মোজেজা পবিত্র কুরআনের কারণে তাঁর প্রশংসা করেছেন: তিনি বলেছেন,মুহাম্মাদের কুরআন অবশ্যই ঐশী বা খোদায়ি। এ বইকে শিক্ষামূলক বা বিনোদনমূলক  অন্যান্য বইয়ের মত মনে করা ঠিক হবে না। কুরআনের রীতি অত্যন্ত শক্তিশালী,মহত্ত্বে পরিপূর্ণ, এটি পরিপূর্ণ ফলময় ও বিস্ময়কর নানা সত্যতা বা বাস্তবতায় ভরা এবং বাস্তবেই সম্মানজনক বই।

গ্যাটে ইসলামের প্রশংসা করে লিখেছেন,'যারা কেবলই ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রশংসা করে তারা বোকা। ইসলামের অর্থ যদি হয় মহান আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করা তাহলে আমরা সবাই ইসলামের মধ্যেই বাঁচি ও ইসলামের মধ্যেই মরি।'

মহানবীর (সা) মহানুভবতা,ক্ষমাশীলতা ও দয়াসহ অসাধারণ মহতী গুণগুলোর চৌম্বকীয় আকর্ষণ কেবল মূর্তি পূজারী অজ্ঞ আরবদের হৃদয়েই নয় যুগে যুগে নানা জাতির বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত মহলেও গভীর প্রভাব রেখেছে।

উনবিংশ শতকে মহানবীর চরিত্র ও শিক্ষাগুলো অনেক রুশ কবির দৃষ্টিও আকর্ষণ করেছিল। বহু রুশ কবি পবিত্র কুরআনের বাণী ও ইসলামী শিক্ষার ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে  অনেক কবিতা লিখেছেন।

 রুশ-ইরান যুদ্ধে ইরানের পরাজয়ের প্রেক্ষাপটে  খ্রিস্টিয় ১৮১৩ সনে ইরান ও রাশিয়া গোলেস্তান চুক্তি স্বাক্ষর করে। ফলে ইরান হারায় গোটা জর্জিয়া এবং আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের এক  বিশাল অংশ। এ সময় এ অঞ্চলে রুশদের যাতায়াত বেড়ে যাওয়ায় তারা ইসলাম ও পবিত্র কুরআন সম্পর্কে অনেক বেশি জানার সুযোগ পায়।

বড় বড় রুশ লেখকদের লেখায় প্রাচ্য সব সময়ই বড় রকমের গুরুত্ব পেয়েছে। প্রাচ্যের মোহনীয় ও বিস্ময়কর প্রকৃতি পুশকিন,লেরমন্তভ ও লিও টলস্টয়সহ অনেক রুশ লেখক ও কবির অনন্য শিল্প রচনায় প্রেরণা যুগিয়েছে। ইসলামের মহানবীর (সা) জীবনী ও ব্যক্তিত্বও তাদেরকে একই ধরণের শিল্প সৃষ্টিতে প্রেরণা যুগিয়েছে। এক্ষেত্রে রুশ কবিদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন রুশ মহাকবি অ্যালেক্সান্ডার পুশকিন। প্রাচ্য-প্রেমিক এই মহাকবি তার অনেক চিঠিতেই ইসলামের মহানবীর জীবনী ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করেছেন।

পুশকিন (1837-1799)প্রাচ্য সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার সাহিত্যে থাকত সামাজিক বিষয় সম্পর্কিত চিন্তাধারা ও বাস্তবতার প্রতিফলন। কবিতা, গল্প ও নাটক লেখক পুশকিন রুশ সাহিত্যে আধুনিক ধারার পথিকৃৎ। তিনি ছিলেন সংগ্রামী ও মুক্তিকামী। বিশ্বের বড় বড় গবেষক ও ব্যক্তিত্বদের জীবনী এবং ঐশী ধর্মগ্রন্থগুলো তার দৃষ্টি গভীরভাবে আকর্ষণ করত। সামাজিক প্রয়োজনগুলো নিয়ে লেখা তার কবিতা বা গানগুলো খুব দ্রুত রুশ সমাজের নানা স্তরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করত। ফলে তাকে দেয়া হয় নির্বাসন। পবিত্র কুরআনের বাণী তাকে গভীরভাবে টানত এবং এ মহাগ্রন্থের বাণী তাকে অজ্ঞতা ও বস্তুবাদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করত।

পুশকিন 'কুরআন সৃষ্টি' শীর্ষক একটি কাব্য লিখেছিলেন। এই কবিতাগুলোর উৎস ছিল রুশ ভাষায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদ। কুরআনই প্রথমবারের মত তার মধ্যে ধর্মের অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছিল এবং তার ব্যক্তি জীবনে ধর্ম অসাধারণ গুরুত্ব পেয়েছিল।

কুরআন ও মহানবীর (সা) জীবন যে পুশকিনকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল তার অন্যতম সাক্ষ্য বহন করছে তারই লেখা 'রাসুল'শীর্ষক কবিতা। তিনি কবিতাটি লিখেছিলেন ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে। পুশকিন ১৮২৪ সনে উপহার দিয়েছিলেন 'কুরআনের আলোকরাজি ও মহানবী (সা)' শীর্ষক অসাধারণ এক রচনা।#

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ২৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য