মে ১০, ২০২০ ১৪:১০ Asia/Dhaka

বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। গত আসরে আমরা ইরানের নামকরা প্রদেশ চহর মাহলে বাখতিয়রির কয়েকটি শহর ঘুরে ঘুরে দেখেছি। সবশেষে গিয়েছিলাম কোর্দ শহরের দিকে।

এখানকার কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শনের সঙ্গে খানিকটা পরিচিত হবার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে এখানকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে একটি নিদর্শন হলো এই শহরের পুরাতত্ত্ব মিউজিয়াম। বহু প্রাচীন নিদর্শনে ভরপুর এই মিউজিয়ামটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চহর মাহলে বাখতিয়রি প্রদেশের প্রাচীন নিদর্শন এমনকি নয় হাজার বছরের পুরনো জিনিসপত্রও এই যাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

হাড়,পাথরের ছোট-বড় বিভিন্ন জিনিসপত্র এবং মাটি দিয়ে তৈরি ভাস্কর্য, মৃৎপাত্র,জ্যামিতিক ফর্মে নির্মিত  কালো রঙের বিভিন্ন তৈজস, বাটি, গ্লাস এমনকি নব্য প্রস্তরযুগের বহু নিদর্শন এই যাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি কয়েক হাজার বছরের পুরনো এতোসব নিদর্শনে সমৃদ্ধ এই প্রদেশ যে মনে হয় যেন প্রদেশটি অচেনা এক গুপ্তধন ভাণ্ডার। চহর মাহলে বাখতিয়রি প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহরের নাম হলো কোর্দ। এই শহরটি ইরানের শীতপ্রধান এলাকাগুলোর একটি।

কোর্দ শহরের অপর একটি সুন্দর ও ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখার জন্য আমাদের যেতে হবে এই শহর ছেড়ে একটু দূরে চলেশতোর শহরে। না, খুব বেশি দূরে নয় মাত্র আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চলেশতোর শহরটি। ওই শহরে প্রাচীন ইরানের ঐতিহাসিক এবং মূল্যবান একটি কমপ্লেক্স রয়েছে। কমপ্লেক্সটি 'চলেশতোর কেল্লা' নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক এই স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীকে ইউরোপীয় স্থাপত্যের সঙ্গে কাজারি শাসনামলের স্থাপত্যের মিশ্রণে তৈরি বলে মনে করা হয়। চলেশতোরি সুতুদে বিল্ডিং চলেশতোর দুর্গ বা কেল্লারই একটা অংশ। কাজারি শাসনামলের শেষ দিকে এই কেল্লাটি নির্মাণ করা হয়েছে শাসকের বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করার লক্ষ্যে। হিজরি চতুর্দশ শতকের শুরুতে তের শ তেইশ হিজরিতে কেল্লার মূল অংশটি ব্যবহার করার জন্য কাজে লাগানো হয়।

যেহেতু শাসক এর ভেতরে বসবাস করতেন সেজন্য ভেতরের অংশকে খুবই সুন্দর করে সুসজ্জিত করা হয়েছে। ঐতিহাসিক এই কমপ্লেক্সের ভেতরে তিনটি যাদুঘর রয়েছে। জীবন ও কর্ম যাদুঘর, নৃতত্ত্ববিদ্যা যাদুঘর এবং পাথুরে নিদর্শন যাদুঘর। এইসব যাদুঘরে জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় বিচিত্র সামগ্রী, কৃষি সরঞ্জামাদি, গ্রামীণ জামা কাপড়, প্রস্তর লিখন এবং শিলালিপি ইত্যাদি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কোর্দ শহরে অপর একটি দর্শনীয় নিদর্শন হলো আমিরে মোফাখখাম দুর্গ বা দেজাক কেল্লা। দেজাক একটি গ্রাম। ওই গ্রামের নামানুসারে কেল্লার নাম হয়েছে দেজাক কেল্লা। এটি দেজাক গ্রামের শৈল্পিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক একটি নিদর্শন। কোর্দ শহর থেকে আনুমানিক বত্রিশ কিলোমিটার দূরে এই কেল্লাটি অবস্থিত। হিজরি তের শ পঁচিশ সালে কেল্লাটি নির্মাণ করা হয়েছে। আমিরে মোফাখখাম নামে পরিচিত লুৎফ আলি খানের নির্দেশে দেজাক কেল্লা নির্মাণ করা হয়। দুই তলা এবং চার টাওয়ার বিশিষ্ট এই কেল্লার আয়তন পাঁচ হাজার বর্গমিটার। এই স্থাপনার প্রথম তলায় বেশ কিছু শৈল্পিক স্থাপত্যশৈলী এবং অনন্য সাধারণ শিল্পকর্মের নিদর্শন আছে। এসবের মধ্যে পাথরের নকশা যেমন আছে তেমনি আছে চক-প্লাস্টারের মনোরম কারুকাজ।

বিরাট ডাইনিং হলের এইসব কারুকাজ যে কারুরই নজর কাড়বে নি:সন্দেহে। আরও রয়েছে আয়নার চোখ ধাঁধানো কারুকাজ। রয়েছে কাঠের চকচকে কারুশিল্পময় দরোজা। শীতকালে রুম গরম করার জন্য যেসব রেডিয়েটার ব্যবহার করা হয় সেগুলোকে ঢেকে রাখার জন্য কাঠের তৈরি সুন্দর ফ্রেমগুলোও দেখার মতো। রুমের ছাদগুলোকে কাঠ দিয়ে সাজানো হয়েছে এই ভবনে। সেখানেও সুন্দর ফ্রেমে শৈল্পিক ডিজাইন করা হয়েছে। এসবরে বাইরে সিরামিকের চকচকে কারুকাজ আর ইটের কাজও রয়েছে অসংখ্য। এই ভবনের সবচেয়ে সুন্দর এবং দৃষ্টি আকর্ষণীয় অংশটি হলো উপরের তলা। সেখানে রয়েছে আয়না কেটে বানানো সুসজ্জিত রুম এবং ডাইনিং হল।

দেজাক কেল্লা নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। ইতিহাসের কাল পরিক্রমায় এই দেজাক কেল্লা বহু চড়াই উৎরাইয়ের সাক্ষী। আলি আকবর দেহখোদা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কিছুদিন এই কেল্লায় অবস্থান করেছিলেন। সে সময় তিনি তাঁর লেখা বিখ্যাত ফার্সি অভিধান লোগাতনমেয়ে দেহখোদা রচনা করেন। কেল্লার ভেতর একটি বড় লাইব্রেরি ছিল। ওই লাইব্রেরিতে মূল্যবান অনেক বইয়ের সংগ্রহ ছিল। এটা প্রমাণ করে এই ভবনে বসবাসকারীরা ছিলেন উন্নত রুচির অধিকারী। দেহখোদা সেইসব বই কাজে লাগিয়ে ঐতিহাসিক 'দেহখোদা'ডিকশনারি লেখার কাজ শুরু করেছিলেন। দেজাক কেল্লা প্রাসাদে সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে সম্প্রতি পোশাক যাদুঘর এবং পাথরের যাদুঘরও সহযোজন করা হয়েছে। পোশাক যাদুঘরে শহর, গ্রাম এবং চহর মাহলে বাখতিয়রি প্রদেশের বিশেষ বিশেষ এলাকার ঐতিহ্যবাহী পোশাকে বেশ সমৃদ্ধ।

পাথরের যাদুঘরও রয়েছে এখানে। পাথরের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে পিলার, পিলারের উপরের অংশে ছাদের সঙ্গে লাগোয়া কারুকাজ, পাথরের তৈরি সিংহের ভাস্কর্যসহ আরও অনেক নিদর্শন। যারাই চহর মাহলে বাখতিয়রি প্রদেশে বেড়াতে যাবেন এখানকার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো না দেখাটা সুখকর হবে না কোনোভাবে। এই কেল্লার ভেতরে ঐতিহাসিক কিছু ফিল্ম তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবছর এই গ্রামের মানুষেরা তো বটেই বাইরে থেকে আসা বহু ভ্রমণকারীও এই কেল্লা পরিদর্শনে আসেন। উল্লেখ করা অত্যুক্তি হবে না যে উনিশ শ উননব্বুই সালে ঐতিহাসিক দেজাক কেল্লাকে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য