মে ১৬, ২০২০ ১৬:০৭ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ জালিম শাসকদের জুলুম নির্যাতনের কারণে দিশেহারা। মজলুমদের চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠলেও জালিমদের জুলুম যেন থামতেই চায় না। জালিমরা মনে করে- তাদের অন্যায়ের বোধহয় কোন বিচার হবে না।

অথচ পবিত্র কুরআনের সূরা ইবরাহীমে বলা হয়েছে, "জালিমদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো উদাসীন মনে করো না। আল্লাহতায়ালা তাদেরকে শুধু একটি নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত বিলম্বিত করেন।"

অন্যদিকে সূরা শুরাতে বলা হয়েছে, "জুলুমবাজরা তাদের জুলুমের পরিণতি অচিরেই জানতে পারবে।" রাসূল (সা.) বলেছেন, "আল্লাহতায়ালা জালিমকে দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন, অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেন না।"

পৃথিবীর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অনেক জালিম শাসকের চরম শাস্তি হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। আর কিয়ামতের দিন তাদের জন্য অপেক্ষা করেছে চরম লাঞ্ছনা ও অপমান।

বন্ধুরা, আজকের আসরে তোমাদের জন্য রয়েছে দুই জালিম রাজার গল্প। এছাড়া থাকবে একটি গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই ইরানি কবি শেখ সা'দীর লেখা একটি গল্প শোনা যাক।

এক দেশে এক অত্যাচারী রাজা ছিলেন। বিভিন্ন রকমের অত্যাচার তিনি করতেন। লোকজনের ঘোড়া-গাধা জোর করে কেড়ে নিতেন। রাজা একদিন সৈন্যসামন্ত সঙ্গে নিয়ে শিকার করতে গেলেন। দলবল নিয়ে শিকার করতে আসা রাজাদের একটা অভিজাত্য এবং এটা একটা বড় উৎসব। রাজা একা একা একটা শিকারের পেছনে ধাওয়া করতে করতে অনেকদূর চলে গেলেন। তাঁর অন্য কোনদিকে খেয়াল নেই।

তখন সন্ধ্যা। রাজা টের পেলেন বনের মাথায় ঘন আঁধার নামছে। সঙ্গে কোনো অনুচর নেই। সম্পূর্ণ অপরিচিত স্থান। তিনি কাছাকাছি এক গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। এক ধনবান ব্যক্তির বাড়িতে রাত্রিযাপন করবেন বলে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি দেখলেন, ধনী ব্যক্তিটি তার গাধাকে বেদম প্রহার করছে। গাধা কাতর হয়ে চিৎকার করছে। লোকটি নির্বিকার। সে গাধার একটা পা ভেঙে দিল। রাজা তাই দেখে লোকটিকে বললেন-

কী হে, অবলা জীবটাকে এভাবে পিটাচ্ছ কেন? গাধার ঠ্যাং ভেঙে তুমি নিজের শক্তি পরীক্ষা করো?

লোকটি উত্তেজিতভাবে জবাব দিল: আমার কাজ ভালো কি মন্দ, আমিই সেটা খুব ভালোভাবে জানি। গায়ে-পড়ে তোমার কথা বলার কোন প্রয়োজন নেই।

জবাব শুনে রাজা খুব দুঃখ পেলেন। বললেন- 'এইভাবে এই নিরীহ প্রাণটাকে মারা কী কারণ থাকতে পারে দয়া করে সেটা আমাকে বুঝিয়ে বলবে কি? আমার মনে হচ্ছে, তুমি যে শুধু নির্বোধ তাই নয় বরং আস্ত একটা পাগল।'

লোকটি এ কথায় হেসে বলল: 'হ্যাঁ, আমি পাগলই বটে। তবে সব শুনলে তুমিও বুঝবে, আমি নির্বোধের মতো গাধাটার পা ভেঙে দিইনি। এরমধ্যে একটা উদ্দেশ্য আছে আমার। আমাদের রাজা খুব অত্যাচারী। একথা সবাই জানে। আমার সুস্থ সবল গাধাটির খবর পেলে নিশ্চয়ই তিনি জোর করে এটা নিয়ে যাবেন। শুনেছি, আমাদের এই এলাকায় রাজা এসেছেন। তাই গাধাটাকে রাজার অত্যাচার থেকে রক্ষা করবার জন্যে খোঁড়া করে দিলাম। রাজা গাধাটিকে কেড়ে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে খোঁড়া অবস্থায় এটা আমার কাছে থাকা অনেক ভালো। আমাদের অত্যাচারী রাজাকে জানাই শত ধিক!'

রাজা গ্রামবাসী লোকটির মুখে নিন্দা শুনে খুবই দুঃখ পেলেন। কোন জবাব দিলেন না। রাগে, অপমানে, দুঃখে সারারাত দু'চোখের পাতা এক করতে পারেননি। ঘুমহীন রাত কাটল। ভোরের আলো ফুটল পুব আকাশে। মৃদু বাতাস বয়ে যাচ্ছে। পাখির কলকাকলিতে মুখর চারদিক। সৈন্য-সামন্ত রাজাকে খুঁজতে খুঁজতে সাত-সকালে হাজির হল সেই গ্রামে। ধনী লোকের বাড়ির সামনে এল তারা। শত শত লোকজনের মুহূর্তে ভিড় হয়ে গেল। সুসজ্জিত ভৃত্যেরা রাজা'র সেবায় নিয়োজিত হল। সেই বাড়ির সামনে জাঁকজমকপূর্ণ বিশাল দরবার বসে গেল। রাজ্যের প্রধান প্রধান ব্যক্তি রাজার সামনে এসে আসন গ্রহণ করলেন। রাজকীয় খানা-পিনার আয়োজন করা হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই এলাকার সম্পূর্ণ পরিবেশ পালটে গেল। সৈন্যদল ও ঘোড়ার পদভারে থরথর করে কাঁপতে লাগল সেই এলাকা।

বাড়ির সেই লোকটি ব্যাপার-স্যাপার দেখে একেবারে থ! গতরাতে স্বয়ং রাজা ছিলেন তার অতিথি। অর্থাৎ বিপদ ঘনিয়ে এসেছে। রাজা ডেকে পাঠালেন লোকটিকে। ধরে বেঁধে তাকে আনা হল রাজা’র সামনে। লোকটি বুঝল, তার আত্মরক্ষার আর কোন উপায় নেই। এই মুহূর্তেই তার জীবন শেষ হবে। আর ভয় করা বৃথা। কারণ উদ্যত তরবারির নিচেই মানবের ভাষা অধিকতর শক্তিশালী হয়ে থাকে।

তাই লোকটি সাহসের সঙ্গে বলল- 'হে মহামান্য রাজা, আমি একাই শুধু আপনার নিন্দা করি নাই। খবর নিয়ে দেখুন, জনসাধারণ সকলেই একই কথা বলে থাকে। আমাকে সহজেই হত্যা করা আপনারপক্ষে সম্ভব। আমার কথায় আপনি মনে আঘাত পেয়েছেন–সেজন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু আপনার উচিত হবে ভালো কাজ করা– যেন কেউ আপনার বদনাম করতে না পারে। অন্যায় করে কখনই সুনাম অর্জন করা সম্ভব নয়। আপনার কর্মচারীরা সারাক্ষণ আপনার গুণকীর্তন করে থাকে। এতে রাজার সম্মান বৃদ্ধি পায় না। প্রজারা যদি রাজা’র সুনাম করে, তাতেই রাজা’র সম্মান বাড়ে।'

রাজা এই সাহসী সত্যকথা শুনে দারুণ উদ্দীপ্ত হলেন। লোকটিকে মুক্ত করে দিলেন। সকলের উদ্দেশ্যে বললেন: আমি আজ থেকে চেষ্টা করব ন্যায়পরায়ন, ‍সুশাসক হতে। আমি চাই একজন ভালো রাজা হতে। যেন আমার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দিক দিগন্তরে।

অত্যাচারী রাজা ও শিশুর গল্প

বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে আরেক অত্যাচারী রাজা ও একটি শিশুর গল্পটি শোনাব। এটি লিখেছেন বাংলাদেশের শিশু-সাহিত্যিক বিএম বরকতউল্লাহ।

এক ছিল অত্যাচারী রাজা। কারণে-অকারণে মানুষ ও পশু-পাখিদের ধরে অত্যাচার করে আনন্দ পেতেন তিনি। কেউ ভালবাসত না রাজাকে। মনে মনে সবাই ঘৃণা করত তাঁকে। এটা রাজা জানত। তবুও কমতি ছিল না তাঁর অত্যাচারের।

রাজা তাঁর মন্ত্রী, পাইক-পেয়াদা নিয়ে রাজপ্রাসাদ থেকে বের হতেন। রাজাকে অত্যাচার করতে সাহায্য করত তারা। কারণ রাজা এতে অনেক খুশি হতেন।

একদিন রাজা শিকার করতে পথে বের হলেন। তার সাথে মন্ত্রী, সিপাই, পাইক-পেয়াদা রয়েছে। সবাই হাতির পিঠে চড়ে বেরিয়েছেন। পথে বসে খেলা করছিল একটা শিশু। রাজাকে দেখে সবাই পথ ছেড়ে পালিয়ে গেল। পথের শিশুটি আপনমনে খেলা করতে লাগল।

সবার সামনে রাজার হাতি। পথের মাঝে শিশুটিকে দেখে রাজার হাতি দাঁড়িয়ে গেল। আর সাথে সাথে পেছনের সব হাতিও গেল দাঁড়িয়ে।

রাজা কঠিন গলায় বললেন, দাঁড়ালে কেন?

হাতিচালক বলল, একটি শিশু পথের ঠিক মাঝখানে বসে খেলা করছে রাজামশাই।

রাজা শিশুটিকে ধমক দিয়ে বললেন, আমার পথে খেলা করে শিশু? সাহস তো কম নয়! এই ছোকরা, সর।

একথা শুনে শিশুটি বলল: তোমরা সরে যাও। দেখছ না আমি যে রাজা রাজা খেলছি। আমার পুতুলসেনা এখন যুদ্ধ করতে যাচ্ছে। পথ ছেড়ে দিলে যুদ্ধে যাবে কিভাবে?

রাজা শিশুর কথা শুনে রেগে আগুন হয়ে গেলেন। বললেন, এই ছোকরা, জানিস কার পথ আগলে বসে আছিস আর কার সাথে কথা বলছিস তুই?

শিশুটি কারো দিকে না তাকিয়ে বলল, আমার পুতুল যুদ্ধে যাবে। আমি তাকে রেডি করে দিচ্ছি। তলোয়ার কই খুঁজে পাচ্ছি না।

এ কথা বলার পর শিশুটি মাথা ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজে কিছুই না পেয়ে শেষে একটা দুর্বঘাসের ডগা ছিঁড়ে পুতুলের কাঁধে বসিয়ে দিয়ে বলল, এই হলো তোমার তলোয়ার। যুদ্ধ করে অত্যাচারী রাজাকে পরাজিত করবে। কি পারবে না তুমি? ভয় পাও? কোন ভয় নেই। আমি আছি তোমার সাথে। যুদ্ধ করতে করতে রাজাকে শেষ করে ফেলবে তুমি। তারপর তুমি হবে সেনাপতি আর আমি হব রাজা।

এসব কথা শুনে অধৈর্য হয়ে উঠলেন রাজা। তিনি কঠিন গলায় বললেন, এই ছোকরা কত বড় দুঃসাহস তোর। সরবি তো সর- নইলে এই তলোয়ারের আঘাতে টুকরো টুকরো করে ফেলব তোকে।

শিশুটি বলল, আমি যুদ্ধ করে রাজাকে মারব। তারপর আমি হব রাজা। আমি সরব কেন? তুমি চলে যাও ওপাশ দিয়ে।

রাজা উত্তেজিত হয়ে আদেশ করল, পিষ্ট করে ফেলো বেয়াদব ছোকরাটাকে।

রাজার হুকুমে হাতিকে আদেশ করা হলো। হাতি সামনে এগিয়ে গেল। রাজা পেছনে তাকিয়ে দেখে শিশুটি আগের মতোই বসে খেলা করছে।

রাজা আবারও হাতিকে নির্দেশ দিল শিশুটিকে পিষ্ট করার জন্য। কিন্তু হাতি শিশুটিকে পিষ্ট না করে হেঁটে গেল। আবারও হুংকার দিয়ে রাজা বলল, শিশুটিকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে বুঝিয়ে দাও, রাজার পথ সবার পথ নয়। রাজার পথে থাকলে মরতে হয় পিষ্ট হয়ে।

পথের দুপাশে প্রজাদের বাড়িঘর। প্রজারা ভয়ে যার যার ঘরে আশ্রয় নিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে এসব। তারা এই অত্যাচারী রাজার হাত থেকে শিশুটিকে রক্ষা করার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে করুণ মিনতি করছে।

শিশুটি পথ ছাড়ল না। আপন মনে খেলছে। হাতি এবারও শিশুটিকে পাশ কেটে চলে গেল।

অত্যাচারি রাজা থামলেন। খাপ থেকে সটান বের করলেন তলোয়ার। এবং হাতিকে গালমন্দ করে রাগে কাঁপতে কাঁপতে ছেলেটির দিকে এগিয়ে গেলেন। রাজা তলোয়ার উচু করে যেই শিশুটিকে আঘাত করতে গেলেন এমন সময় হাতিটি প্যাঁচিয়ে ধরল রাজাকে। তারপর হাতিটি একটা হ্যাঁচকা টানে অত্যাচারী রাজাকে পায়ের নিচে ফেলে পিষে ফেলল। এবং শিশুটিকে পিঠে তুলে সোজা চলে গেল রাজপ্রাসাদে।

এরপর শিশুটিকে বসিয়ে দেওয়া হলো রাজসিংহাসনে। অত্যাচারী রাজার বদলে পুতুলরাজার শাসনে রাজ্যে ফিরে এল শান্তি।

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য