মে ১৮, ২০২০ ২১:০২ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ১৬১ থেকে ১৭৩ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ১৬১ থেকে ১৬৩ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَإِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ (161) مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ بِفَاتِنِينَ (162) إِلَّا مَنْ هُوَ صَالِ الْجَحِيمِ (163)

 “অতএব তোমরা এবং তোমরা যাদের উপাসনা কর,” (৩৭:১৬১)

“তোমরা (মানুষকে আল্লাহর) বিরুদ্ধে বিভ্রান্ত করতে পারবে না।” (৩৭:১৬২)

“শুধুমাত্র তাদের ছাড়া যারা (নিজেদের ইচ্ছায়) জাহান্নামে পৌঁছাবে।” (৩৭:১৬৩)

গত আসরে ফেরেশতা ও জিন জাতি সম্পর্কে মুশরিকদের ভ্রান্ত বিশ্বাস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এরপর এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: তোমরা মূর্তিপূজকরা নিজেদের ভ্রান্ত বিশ্বাস দিয়ে অন্যদেরকে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না। কারণ, মানুষের বিচার-বুদ্ধি ও পবিত্র আত্মা তোমাদের বক্তব্য গ্রহণ করবে না। তারা তোমাদের অযৌক্তিক কথাবার্তায় কান দেবে না। তবে যারা নিজেদের ইচ্ছায় জাহান্নামবাসীকে অনুসরণ করে তারাই কেবল মুশরিকদের ভ্রান্ত কথায় বিশ্বাস করে তাদের দেখানো পথে চলবে।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:

১- মহান আল্লাহ মানুষকে স্বাধীন করে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই মানুষ নিজের চলার পথ ও পন্থা নির্বাচন করার ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং কেউ আরেকজনকে তার চলার পথ গ্রহণে বাধ্য করতে পারে না।

২- মানুষ নিজের চলার পথ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন। তবে বুদ্ধিমান মানুষ পরিণতির কথা বিবেচনা করে নিজের চলার পথ বেছে নেয়।  কোনো মানুষ যদি শিরক, কুফর ও জুলুমের পথ বেছে নেয় তাহলে সে পরকালে জান্নাতের আশা করতে পারে না।

সূরা সাফফাতের ১৬৪ থেকে ১৬৬ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَمَا مِنَّا إِلَّا لَهُ مَقَامٌ مَعْلُومٌ (164) وَإِنَّا لَنَحْنُ الصَّافُّونَ (165) وَإِنَّا لَنَحْنُ الْمُسَبِّحُونَ (166)

“আমাদের (অর্থাৎ ফেরেশতাদের) প্রত্যেকের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট স্থান।” (৩৭:১৬৪)

“এবং আমরাই (আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য) সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান থাকি।" (৩৭:১৬৫)

“এবং আমরাই আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করি।” (৩৭:১৬৬)

মক্কার কাফের ও মুশরিকরা ফেরেশতাদের সম্পর্কে মারাত্মক ভুল ধারনা পোষণ করত। তারা কন্যা সন্তানকে দুর্বল ও দুর্ভাগা মনে করত এবং ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তায়ালার কন্যা সন্তান বলে ভাবত। তাদের এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের বিপরীতে এই তিন আয়াতে ফেরেশতাদের মুখের ভাষা বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, তোমাদের ধারনার বিপরীতে আমরা যেমন কন্যা সন্তান নই তেমনি পুত্র সন্তানও নই। আমরা আল্লাহ তায়ালার এমন এক শক্তিশালী সৃষ্টি যাদের প্রত্যেক দলের জন্য মহান আল্লাহ সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করে রেখেছেন। আর আমরা সারাক্ষণ সে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত থাকি। আমরা আল্লাহ তায়ালাকে তোমাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র  বলে জানি এবং সব সময় তাঁর তসবিহ পাঠ করি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

এ তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- মহান আল্লাহ পার্থিব ও আধ্যাত্মিক কার্য-কারণের মাধ্যমে এই বিশ্বজগত পরিচালনা করেন এবং এ কাজে ফেরেশতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২- ফেরেশতারা আল্লাহর সন্তান নন। তারা আল্লাহ তায়ালার এমন এক সৃষ্টি যারা তাঁর নির্দেশ পালন করার জন্য সদা প্রস্তুত অবস্থায় সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান থাকে।

৩- ফেরেশতাদের জগতে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত সেসব দায়িত্ব পালন করে।

এই সূরার ১৬৭ থেকে ‌১৭০ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَإِنْ كَانُوا لَيَقُولُونَ (167) لَوْ أَنَّ عِنْدَنَا ذِكْرًا مِنَ الْأَوَّلِينَ (168) لَكُنَّا عِبَادَ اللَّهِ الْمُخْلَصِينَ (169) فَكَفَرُوا بِهِ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ (170)  

“মুশরিকরা জোর দিয়ে বলত:” (৩৭:১৬৭)

“যদি আমাদের কাছে পূর্ববর্তীদের কোন উপদেশ (ঐশী কিতাব হিসেবে) থাকত,” (৩৭:১৬৮)

“তবে আমরা অবশ্যই আল্লাহর মনোনীত বান্দা হতাম।” (৩৭:১৬৯)

“অথচ (যখন কুরআন তাদের কাছে এল তখন) তারা এই কুরআনকে অস্বীকার করল। এখন শিগগিরই তারা জেনে নিতে পারবে।” (৩৭:১৭০)

ইতিহাসে এসেছে, বিশ্বনবী (সা.)’র নবুওয়াতপ্রাপ্তির আগে মক্কার মুশরিকরা আরব উপত্যকায় বসবাসরত ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বলত: আল্লাহ তায়ালা যদি আমাদের কাছে কোনো নবী ও আসমানি কিতাব পাঠান তাহলে আমরা তার প্রতি ঈমান আনব। এ সম্পর্কে এই আয়াতগুলোতে বলা হচ্ছে: মহান আল্লাহ ঠিক তা-ই করলেন যা মক্কার মুশরিকরা বলে বেড়াত। তিনি তাদের হেদায়েতের জন্য কুরআনুল কারিম নাজিল করলেন। কিন্তু মক্কার কাফির ও মুশরিকরা নানা অজুহাতে সেই কুরআন ও আল্লাহর নবীকে মেনে নিতে অস্বীকার করে।  আল্লাহ তায়ালা বলছেন: তারা তাদের এ কাজের পরিণতি শিগগিরই দেখতে পাবে।

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- মহান আল্লাহ মানুষের প্রতি নিজের দায়িত্ব সম্পন্ন করার জন্য নবী-রাসূল ও ঐশী গ্রন্থ নাজিল করেছেন যাতে কাফির ও মুশরিকরা এই অজুহাত তুলতে না পারে যে, তাদের হেদায়েতের জন্য পৃথিবীতে কাউকে পাঠানো হয়নি।

২- মিথ্যার দাবিদারদের সংখ্যা অগণিত। পৃথিবীতে বহু মানুষ আছে যারা মুখে ঈমানদারির দাবি করে অথচ বাস্তবে ধর্মকে গ্রহণ করে না বরং তার বিরোধিতা করে।

সূরা সাফফাতের ১৭১ থেকে ১৭৩ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে বলা হয়েছে:

وَلَقَدْ سَبَقَتْ كَلِمَتُنَا لِعِبَادِنَا الْمُرْسَلِينَ (171) إِنَّهُمْ لَهُمُ الْمَنْصُورُونَ (172) وَإِنَّ جُنْدَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ (173)

“এবং নিঃসন্দেহে রাসূল হিসেবে পাঠানো আমার বান্দাগণের ব্যাপারে আমার এই প্রতিশ্রুতি সত্য হয়েছে যে,” (৩৭:১৭১)

“তারা অবশ্যই সাহায্য প্রাপ্ত হয়।” (৩৭:১৭২)

“আর আমার বাহিনীই হয় বিজয়ী।” (৩৭:১৭৩)

আগের আয়াতগুলোতে মুশরিকদের পক্ষ থেকে সত্য প্রত্যাখ্যানের ঘটনা বর্ণনা করার পর এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: ঈমানদার ব্যক্তিরা যেন তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে কখনো সংশয় বা দ্বিধাদ্বন্দ্বে না ভোগেন এবং আমলের দিক থেকে যেন পিছিয়ে না পড়েন। কারণ আল্লাহ তায়ালা এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, ঈমানদার ব্যক্তিরা যদি নবী-রাসূলদের অনুসরণে অটল ও অবিচল থাকেন তাহলে তাদের বিজয় সুনিশ্চিত এবং এর বিপরীতে মিথ্যার অনুসারীদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের এবং কুফরের ওপর ঈমানের বিজয় হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার অলঙ্ঘনীয় রীতি।

২- অন্য সব ধর্ম ও মতাদর্শের ওপর নবী-রাসূল ও তাদের রেখে যাওয়া ধর্মের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

৩- মুমিনদের সংখ্যা অল্প হলেও তাদের প্রতি মহান আল্লাহর সাহায্য রয়েছে। কিন্তু কাফেররা সংখ্যায় যত বেশি হোক এবং তারা পার্থিব জীবনে উন্নতির যত শীর্ষেই পৌঁছে যাক না কেন তাদের প্রতি আল্লাহর সাহায্য নেই।#

 

ট্যাগ

মন্তব্য