জুন ০৩, ২০২০ ১৮:২৬ Asia/Dhaka
  • রওজাতুশ শুহাদা ওয়ায়েজ কাশেফির সবচেয়ে জনপ্রিয় বই

গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি আলেম, চিন্তাবিদ, বক্তা ও লেখক মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি সম্পর্কে আলোচনা করব।

গত পর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি, হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের বিশিষ্ট ইরানি আলেম, চিন্তাবিদ, বক্তা ও লেখক মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির বইয়ের সংখ্যা কাশেফির অন্তত ৪০। তার ৪০টি বই তুর্কি অথবা ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদও করা হয়েছে।

'ফতুউয়াত নামেহ সুলতানি' ও রওজাতুশ শুহাদা শীর্ষক দুটি বই ছাড়াও কাশেফির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বইয়ের নাম হল:  আখলাকে মোহসেনি, আসরারই কাসেমি, তাফসিরই কুরআন মাজিদ ও জাওয়াহিরুততাফসির। তার বইগুলোর বিষয়বস্তু ধর্ম, ইরফান বা ইসলামী আধ্যাত্মিক রহস্যময় জ্ঞান ও দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, ইতিহাস, তাফসির ও নৈতিকতা এবং সাহিত্য। ফার্সি গদ্য ও পদ্য এবং অলঙ্কার শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন কাশেফি। চিঠি-পত্র লেখার বিষয়ে তিনি একটি বই লিখেছিলেন যার নাম মাখজানুল ইনশা। কাশেফির গদ্যকে সমসাময়িক যুগের আদর্শ গদ্য বলা যায়। অন্য অনেক কবি-সাহিত্যিক ও পণ্ডিতদের সান্নিধ্য তার লেখার ওপর প্রভাব ফেলেছিল এবং তিনি পেশাগত প্রয়োজনে ব্যাপক পড়াশুনা করতেন।

মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির সবচেয়ে জনপ্রিয় বইয়ের নাম হল রওজাতুশ শুহাদা। কারবালার শহীদদের শোকাবহ ঘটনা ও মহররম মাসের শোক সম্পর্কিত বর্ণনা এবং এ সংক্রান্ত  কবিতা বা শোক-গাঁথা এ বইয়ের প্রধান বিষয়বস্তু। হযরত ইমাম হুসাইনের (আ) মর্সিয়া বা শোক-গাঁথা বর্ণনাকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে বিবেচিত হয় কাশেফির এ বইটি। তাদের মধ্যে এ বইটি বহুল প্রচলিত হওয়ায় বইটির হাজার হাজার কপি করা হয়েছিল। রওজাতুশ শুহাদা বইয়ের শোক-গাঁথা আয়ত্তকারী ব্যক্তিরা সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তার অধিকারী হতেন। ইরানের সাহিত্য-অঙ্গনে এ বইটিকে একটি অমূল্য সম্পদ হিসেবে ধরা হয়। অনেকেই মনে করেন যে ইরান অঞ্চলে আশুরার মর্সিয়া বা শোক-গাঁথার মাধ্যমে শোক-প্রকাশ 'রওজে বা রওজেখ'নি' হিসেবে খ্যাত হয়েছে 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইটির এই বিশেষ নামের কারণেই।

ইরান অঞ্চলে তৈমুরি শাসনামল ছিল শিয়া মুসলিম মাজহাব বিকাশের যুগ। অন্য কথায় তৈমুরি বংশ ক্ষমতায় আসার পর ইরান অঞ্চলের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতি শিয়াদের জন্য বেশি অনুকূল হতে থাকে। আর তৈমুরি শাসকরাও এই মাজহাবের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখতে পেয়ে নিজ স্বার্থেই শিয়া মুসলমানদের মন জয় করা বা তাদের সন্তুষ্ট রাখাকে গুরুত্ব দিতেন এবং মাজহাবি সংঘাত দেখা দেয়ার মত কোনো কাজ করতেন না। অনেক গবেষক ও ইতিহাসবিদের মতে তৈমুরি শাসকরা যে ইরানের শিয়া মুসলমানদের আন্তরিকভাবে পছন্দ করতেন তা নয়। কিন্তু শিয়াদের মধ্যে জুলুম-বিরোধী লড়াকু মনোভাবের কারণে তাদেরকে সমীহ করতেন তৈমুরি শাসকরা। তৈমুরি বংশ যখন প্রথমবারের মত ইরানে আসে তখন স্থানীয় শিয়া মুসলমানরা বিশেষ করে গিলান ও ম'জান্দারান অঞ্চলের লোকজন তাদের শাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তৈমুরি শাসকরা ইরানে তাদের শাসন সংহত করার পর এ বিষয়ে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করেননি। বরং তারা শিয়া মুসলমানদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

তৈমুরি শাসকরা শিয়া মুসলমানদের মধ্যে সাইয়্যেদদেরকে তথা নবী বংশের সদস্যদেরকে বিশেষভাবে সমাদর করতেন। অন্যদিকে শিয়া মাজহাবের গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থান ধরে রাখতে ও শিয়া মুসলমানদের শক্তি জোরদার করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন। তৈমুরি যুগে শিয়া চিন্তা-চেতনার প্রভাব এতটাই বেড়ে যায় যে মুদ্রার ওপর নবী বংশের মাসুম ইমামদের নাম লেখা হত। এ যুগে শিয়া মুসলিম পণ্ডিতরা সুলতানের দরবারের সদস্য হতেন এবং এমনকি তাদের কেউ কেউ মন্ত্রীও হতেন। 

তৎকালীন পূর্ব ইরান বা  বৃহত্তর খোরাসানের অন্যতম প্রধান শহর ছিল হেরাত। এ শহরটি ছিল তৈমুর-বংশের শক্তি-কেন্দ্র বা রাজধানী। কিন্তু সে যুগের শিয়া মুসলমানরা হেরাতকে তাদের কর্তৃত্বাধীনে আনেন। তাদের প্রভাব এতটাই জোরালো হয়ে ওঠে যে  তৈমুরি শাসক সুলতান হুসাইন বয়কারো একবার শিয়া মাজহাবকে ইরানের রাষ্ট্রীয় মাজহাব হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু একদল নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের প্রতিবাদের মুখে তিনি ওই পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। শিয়া মুসলমানদের এমন প্রভাবের যুগে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্প-অঙ্গনে এবং ঐতিহাসিক ক্ষেত্রেও শিয়া চিন্তা-চেতনার ছাপ জোরদার হতে থাকে।

যাই হোক মাওলানা হুসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইটি শিয়া মুসলিম সংস্কৃতি ও চিন্তা-চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়ায় দীর্ঘকাল ধরে ইরানের জনগণের মধ্যে বহুল প্রচলিত বা জনপ্রিয় বই হিসেবে খ্যাত ছিল। এ বইটি পরবর্তী যুগের লেখক সমাজের ওপর বিশেষ করে সাফাভি যুগ থেকে শুরু করে কাজারদের শাসনামল পর্যন্ত  ব্হু লেখকের ওপর প্রভাব রেখেছে।

মাওলানা কাশেফি 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইটি রচনা করেছিলেন বৃদ্ধ বয়সে। দশ অধ্যায়ের এ বইয়ের শুরুতে নবী-রাসুলদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বর্ণনার পর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা)'র জীবনীর বর্ণনা রয়েছে। এরপর বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে ইমামদের জীবনী। তবে 'রওজাতুশ শুহাদা'য় কারবালার ঘটনা সম্পর্কেই সবচেয়ে বিস্তারিত ও বেশি বর্ণনা রয়েছে। আর এ থেকে বোঝা যায় মহররম ও কারবালার ঘটনা তুলে ধরাই ছিল এ বই রচনার প্রদান উদ্দেশ্য। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ

মন্তব্য