আগস্ট ০১, ২০২০ ১৬:৩২ Asia/Dhaka
  • প্রখ্যাত ইরানি কবি নাজিরি নিশাপুরির জীবন ও অবদান

আজ আমরা খ্রিস্টীয় ষোড়শ- সপ্তদশ শতকের তথা হিজরি দশম-একাদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি মোহাম্মাদ হোসাইন নাজিরি নিশাপুরির জীবন ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

হিজরি দশম-একাদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি মোহাম্মাদ হোসাইন নাজিরি নিশাপুরি সমসাময়িক যুগের কাব্য রীতি বা ধারার ওপর প্রভাব ফেলেছিলেন। তার সমসাময়িক যুগে তিনি এত জনপ্রিয় ছিলেন যে তার অনেক কবিতার চরণ ও  পঙক্তি  জনগণের দৈনন্দিন কথ্য ভাষায় বাগধারা  বা প্রবাদ-বাক্যের মত ব্যবহার করা হত। নাজিরি নিশাপুরিকে ফার্সি গজলের সবুজ রংয়ের ফিরোজা পাথরের মতই দুর্লভ রত্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোহাম্মাদ হোসাইন নাজিরি নিশাপুরির জন্ম হয়েছিল দশম হিজরির মাঝামাঝি সময়ে নিশাপুর শহরে। জ্ঞানী-গুণী ও সাহিত্যিকদের লালন-কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত এই শহরেই প্রাথমিক শিক্ষা ও ফার্সি সাহিত্যের প্রাথমিক পাঠ নেন তিনি। পরিবারের অন্য সদস্যদের মতই তার মূল পেশা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। কিন্তু  খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। নাজিরি নিশাপুরি যৌবনেই খোরাসান অঞ্চলের জনগণের মধ্যে কবি হিসেবে পরিচিত হন। 

কবি হিসেবে মোহাম্মাদ হোসাইন নাজিরি নিশাপুরির খ্যাতি যখন ইরানের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে তখন তিনি সফরে বের হন। প্রথমে তিনি তার কবিতার গুরুত্ব ও মান পরীক্ষার জন্য কাশানে যান। সে যুগে ইরানে কবি-সাহিত্যিকদের প্রধান তিনটি কেন্দ্রের অন্যতম ছিল কাশান। অন্য দুটি শহর ছিল ইস্পাহান ও ক্বাজভিন। কাশানে দক্ষ ও খ্যাতিমান কবিদের সভায় স্বরচিত কবিতা শোনানোর মজলিশে নিজের চমৎকার কবিতা ও গজল শুনিয়ে অভিভূত করে দেন উপস্থিত কবি-মহলকে।  বিশেষ করে সেখানে তার স্বরচিত একটি মিষ্টি গজলের আবৃত্তি ওই গজলটিকে আশপাশের অঞ্চলের সবার কণ্ঠে স্থান করে দেয়। ওই গজলের ক'টি লাইনের ভাবার্থ হল:  (ফালাকে মজদুর ইমায়ে তো ব'শাদ/ নাওয়াজাদ হার কে র' রায়ি তো ব'শাদ..../নাইয়াজারাম যে খোদ হারগেজ দেলি র'/ কে মিতারসাম দার উ য'য়ি তো ব'শাদ ...  )

তোমার ইশারার মজদুর-কারিগর বিশ্ব-চরাচর /তুমি যা চাও তা-ই হয় বরাবর!

দেব না কারো হৃদয়ে যাতনা শপথ আমার! পাছে ভয় হয় সেখানে আছে আসন তোমার!

হোসাইন নাজিরি নিশাপুরি যৌবনের শুরুতে ইরাকে যান ও সেখানকার কবিদের সঙ্গে কবিতার চর্চা করেন এবং দিনকে দিন তার খ্যাতি বাড়তে থাকে। এরপর তিনি নির্ভাবনায় কাব্য চর্চা করা যায় এমন স্থান খুঁজতে থাকেন। এ অবস্থায় সম্রাট আকবরের অভিভাবক ও গাইড বৈরাম খানের পুত্র খ'নে খ'নান নামে খ্যাত  মির্জা আবদুর রহিম বৈরামের সাহিত্যমোদিতা বা কাব্য-প্রেমের সুখ্যাতি শুনে ভারত সফর করেন নিশাপুরি। ভারতের মোগল রাজদরবারে তখন ইরানি শিল্পী, কবি-সাহিত্যিক, পণ্ডিত ও গুণীদের ব্যাপক কদর ছিল।  ভারতে গিয়ে মোগল সাম্রাজ্যের তৎকালীন প্রধান সেনাপতি খ'নে খ'নানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন হোসাইন নাজিরি নিশাপুরি। তিনি খ'নানকে তার একটি কাসিদা শোনান। ওই কাসিদা শুনে খ'নে খ'নান মন্ত্রমুগ্ধ হন ও নাজিরিকে তার সঙ্গী করে নেন।

খ'নে খ'নান ছিলেন ইরানি গুণী, কবি ও শিল্পীদের অসাধারণ অনুরাগী। গুজরাটের এক যুদ্ধে তিনি মাত্র ৫ হাজার সেনা নিয়ে ৫০ হাজার সেনার এক বাহিনীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। দাক্ষিণাত্যের শাসক হিসেবে তার দরবার ছিল কবি-সাহিত্যিক, গুণী ও পণ্ডিতদের আশ্রয়স্থল। নাজিরি নিশাপুরি ছাড়াও ওরফি শিরাজি এবং আরও অনেক বিখ্যাত ইরানি কবি তার দরবারে ছিলেন। গুণী ও পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতার এই ধারা তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছিলেন। আল্লামা শিবলি নোমানির মতে ভারত উপমহাদেশে ফার্সি সাহিত্য ও শিল্পের সূচনা, বিকাশ ও এ ধারার চরম উন্নতি খ'নে খ'নানের সহায়তা এবং উদারতার কাছে ঋণী। খ'নে খ'নান নিজেও ছিলেন একজন দক্ষ কবি এবং তুর্কি ও ফার্সি ভাষায় কবিতা লিখতেন।  বেশিরভাগ কবি ও কথা-শিল্পী তার অধীনস্থ কার্যালয়ে নানা পদ ও পেশায় নিয়োজিত থাকতেন বলে আল্লামা শিবলি নোমানি 'শে’রুল আযম' বইয়ে উল্লেখ করেছেন।

নাজিরি নিশাপুরি খ'নে খ'নান ও সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রশংসাসূচক কবিতা লিখে এত বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন যে তা রূপকথার কাহিনীর তুল্য ঘটনা বলে মনে করা যায়। কিন্তু এই বিপুল সম্পদ নাজিরি নিজের জন্য কুক্ষিগত করে রাখেননি। তিনিও একটি বড় দরবার খুলে বসেন এই অর্থ-সম্পদ দিয়ে এবং এই দরবার হয়ে ওঠে ইরান থেকে আসা অভিবাসী ও বিশেষ করে সেখান থেকে আসা কবি, সাহিত্যিক ও গুণীদের আশ্রয়স্থল। ফলে ভারতে আসা ইরানিরা নাজিরিকে তাদের পিতামাতার সমতুল্য অভিভাবক বলে মনে করতেন। এই ইরানি কবিরা যেমন মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও তার দরবারের আমিরদের প্রশংসা করতেন তেমনি তারা নাজিরি নিশাপুরিরও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেন ও বখশিশ নিতেন। তবে তারা জানতেন যে নাজিরি একজন বড় কবি হওয়ায় তার জন্য লেখা প্রশংসাসূচক কবিতাও মানসম্পন্ন হতে হবে। ফলে বিকাশ ঘটে নাজিরি-ধারার কবিতা-শিল্পের। নাজিরি নিশাপুরি বহু বছর ধরে সম্রাট জাহাঙ্গীর ও খ’নে খ’নান-এর সান্নিধ্যে বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী হয়ে ও উচ্চ পদে আসীন থাকা অবস্থায় হিজরি ১০২১ সনে গুজরাটে মারা যান। এ শহরেই তাকে দাফন করা হয়।

 নাজিরির সমসাময়িক যুগে ফার্সি কবিতায় বিচিত্রময় নতুনত্বের জোয়ার বইছিল। কত ধরনের নতুন স্টাইল, নতুন বক্তব্য ও কাব্য-শৈলী উপহার দেয়া যায় তা ছিল কবিদের লক্ষ্য। ফার্সি কবিতার ভারতীয় রীতি ছিল এই তোলপাড়ের ফসল। কিন্তু খুব বেশি বৈচিত্র্য ও নতুনত্বের দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে এ ধারা এক সময় পাঠকদের মনোযোগ ও উচ্চ-মান থেকে বিচ্যুত হয়ে পরিত্যক্ত হয়। কিন্তু নাজিরি একই সময়ে নব-উদ্ভাবন, উচ্চ-মান ও নতুনত্বের ধারা বজায় রাখার পাশাপাশি ফার্সি কবিতার ঐতিহ্যবাহী ধারার সঙ্গেও সমন্বয় রেখে পাঠকদের নজর কাড়েন। এভাবে তিনি ফার্সি কবিতার বিচিত্রময় উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে সক্ষম হন।

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/০১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ

মন্তব্য