আগস্ট ০১, ২০২০ ১৭:০৪ Asia/Dhaka

গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি দশম-একাদশ শতকের তথা খ্রিস্টীয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি ও লেখক তাকিউদ্দিন আওহাদি বালিয়ানির জীবন ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

হিজরি দশম-একাদশ শতকের তথা খ্রিস্টীয় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি ও লেখক তাকিউদ্দিন আওহাদির বিচিত্রময় জীবনের নানা দিক সম্পর্কে আমরা গত পর্বের আলোচনায় কিছুটা জেনেছি। তাকি বা আওহাদি তার ছদ্মনাম। আওহাদি বালিয়ানি কাজিরুনির জন্ম হয়েছিল ৯৭৩ হিজরির তেসরা মুহররম ইস্পাহান শহরে। শৈশবেই তার কবিত্ব শক্তির প্রকাশ ঘটেছিল। ইরান ও ভারতের নানা শহরে তার সফর সম্পর্কেও আমরা অনেক তথ্য জেনেছি। ভারতে তিনি রচনা করেছিলেন কবিদের পরিচিতি সংক্রান্ত আরাফাতুল আশেকিন নামের বিখ্যাত বইটি। আওহাদির মৃত্যুর সন নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। বলা হয় তিনি হিজরি ১০৩৯ সনেও বেঁচে ছিলেন। অবশ্য একটি বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী আওহাদি হিজরি ১০৫০ সনে ইন্তেকাল করেন।

আওহাদি বালিয়ানি কেবল একজন কবিই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একাধারে জীবনী লেখক, শব্দ ও অভিধান-বিশেষজ্ঞ এবং কবি। ভারতে অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের অধিকারী হওয়ায় আওহাদি সেখানে অনেক কবিতা লেখার পাশাপাশি কয়েকটি বই লিখেছিলেন। এসব বইয়ের মধ্যে রয়েছে আরাফাতুল আশেকিন শীর্ষক বইটি। কবিদের পরিচিতি বা জীবনী সংক্রান্ত এ বইয়ের পুরো নাম হল 'আরাফাতুল আশেকিন ওয়া ওরাসাতুল আরেফিন'। কা'বেইয়ে এরফান বা এরফানের কাবা, ফেরদৌসে খিয়াল বা কল্পনার স্বর্গ, সুরমেইয়ে সোলায়মানি বা সোলায়মানি সুরমা এবং কুল্লিয়াতে আশয়ার বা কবিতা-সমগ্র নামক তার কাব্য-গ্রন্থ  আওহাদির আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বইয়ের নাম। এসব বইয়ের কোনো কোনোটির হাতে-লেখা কপি বিশ্বের নানা জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে।

আওহাদি গদ্য ও পদ্য রচনায় দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও কাব্য-সমালোচকদের কেউ কেউ তাকে দ্বিতীয় বা মধ্যম শ্রেণীর কবি বলে উল্লেখ করেছেন।  সমসাময়িক যুগের কবিদের মধ্যে ওরফি শিরাজির প্রতি আওহাদির শ্রদ্ধা ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি তার অনেক কবিতাই লিখেছেন এই কবির কবিতার স্টাইল অনুসরণ করে। আওহাদি দ্বিপদী কবিতা, কাসিদা, গজল ও খণ্ড-কবিতাসহ অনেক ধরনের কবিতা লিখেছেন। প্রশংসাসূচক কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি ব্যাঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক কবিতাও লিখেছেন। আওহাদি তার ব্যাঙ্গ-বিদ্রূপাত্মক কবিতায় অতিরঞ্জন না করে ন্যায়-বিচার বজায় রেখেছেন বলে দাবি করেছেন।

আরাফাতুল আশেকিন ওয়া ওরাসাতুল আরেফিন শীর্ষক বইটি আওহাদির শ্রেষ্ঠ কীর্তি। এতে তিনি ইরানের প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে তার যুগ পর্যন্ত সময়ের তিন হাজার ৪০০ জনেরও বেশি কবির সংক্ষিপ্ত জীবনী ও তাদের নির্বাচিত কবিতা তুলে ধরেছেন। বইটিতে কবিদের জীবনী ফার্সি বর্ণমালার ধারাক্রম অনুযায়ী সাজানো হয়েছে।

কা'বেইয়ে এরফান বা এরফানের কাবা আওহাদির আরেকটি বই। আসলে আরাফাতুল আশেকিন বইটিকেই  সংক্ষেপে ও সর্বসাধারণের উপযোগী করে সহজ ভাষায় লিখে তিনি এই নতুন নাম দিয়েছিলেন। সম্রাট জাহাঙ্গিরই আরাফাতুল আশেকিন বইটিকে সংক্ষিপ্ত ও সরল রূপে প্রকাশের উৎসাহ দিয়েছিলেন। বইটি তিনি লিখেছিলেন ভারতের গুজরাটের আহমদাবাদে। আওহাদি মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতি এ বইটি নিবেদনের কথা উল্লেখ করেছেন। কা'বেইয়ে এরফান বা এরফানের কাবা বইটি এখনও ছাপাখানার মুখ দেখেনি। তবে  হাতে-লেখা এ বইয়ের কয়েকটি কপি এখনও টিকে আছে। এ বইটির হাতে-লেখা একটি কপি  ব্রিটেনের রাজকীয় জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে। কা'বেইয়ে এরফান বা এরফানের কাবা শীর্ষক বইয়ে তিনি ইরানের কবিদেরকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন, প্রথম শ্রেণীর, দ্বিতীয় বা মধ্যম শ্রেণীর এবং তৃতীয় শ্রেণীর কবি। এ বইটিতেও কবিদের জীবনী ফার্সি বর্ণমালার ধারাক্রম অনুযায়ী সাজানো হয়েছে।

আওহাদির কা’বেইয়ে এরফান বইয়ের প্রভাব প্রসঙ্গে জানা যায় তার মৃত্যুর বহু বছর পর আবদুল ওয়াহ্‌হাব আলমগির বিন সাইয়্যেদ মানসুর খান নামের এক ভারতীয় লেখক হিজরি ১১৫৫ সনে একটি তাজকিরা বা জীবনী-গ্রন্থ লেখেন। বইটির নাম ছিল গোলদাস্তে বা মিনার। মজার ব্যাপার হল বইটির বেশিরভাগ বক্তব্য ও তথ্যই নেয়া হয়েছে কা’বেইয়ে এরফান বই থেকে।

কল্পনার স্বর্গ বা ফেরদৌসে খিয়াল শীর্ষক বইটি লেখার ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় আওহাদি ভারতে আসার সময় তার অন্যতম সফর-সঙ্গী হায়দার হামেদানি তাকে সব কবিদের কবিতার নমুনা সম্বলিত একটি কবিতা সংকলন প্রকাশ করতে বলেন। আওহাদি তার এই প্রস্তাব মেনে নেন এবং দীর্ঘ ছয় বছর ধরে পরিশ্রম করে এই কবিতা সংকলনটি রচনা করেন। ফেরদৌসে খিয়াল বইটির রচনা শেষ হয়েছিল হিজরি ১০২০ সনে। এ বইয়ে কবিদের জীবনীর পরিবর্তে কেবল তাদের কবিতাই স্থান পেয়েছে। তা সত্ত্বেও এটা স্পষ্ট এ বইটিরও মাল-মশলা নেয়া হয়েছিল আওহাদির আরাফাতুল আশেকিন বই থেকেই।

'ফেরদৌসে খিয়াল' বইটির হাতে লেখা কোনো সংকলন পাওয়া যায়নি। এ বইয়ে আওহাদি তার সফরগুলোর অবস্থা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছিলেন এবং তিনি তার আরাফাতুল আশেকিন বইয়ে এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।    

আওহাদির আরেকটি অমূল্য ও অমর বইয়ের নাম 'সুরমেইয়ে সোলায়মানি'। এটি আসলে ফার্সি শব্দের একটি অভিধান। এই অভিধানে অপ্রচলিত অনেক ফার্সি শব্দ স্থান পেয়েছে। এ ছাড়াও ভূগোল আর ইতিহাস বিষয়ক অনেক নাম ও পরিভাষা এবং ওষুধের নামও 'সুরমেইয়ে সোলায়মানি' শীর্ষক এই অভিধানে দেখা যায়। ৩২টি অধ্যায়ের এ বইয়ে শব্দগুলো ফার্সি বর্ণমালার ধারাক্রম অনুযায়ী সাজানো হয়েছে।  প্রত্যেক অধ্যায়ে রয়েছে ৩২টি ছোট উপ-অধ্যায় যা বিন্যস্ত হয়েছে শব্দের শেষ অক্ষরের দিক থেকে ফার্সি বর্ণমালার ধারাক্রম অনুযায়ী।

আওহাদি 'সুরমেইয়ে সোলায়মানি' শীর্ষক অভিধান রচনা করেছিলেন ইরানের ইস্পাহানে থাকার সময়।  এ বইটিতে আওহাদি ও মুহাম্মদ সুরুরি কাশানি নামের অন্য একজন অভিধান লেখকের একটি বিতর্কও স্থান পেয়েছে। আওহাদির আরাফাতুল আশেকিন বইয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এসেছে। 'সুরমেইয়ে সোলায়মানি' আওহাদির একমাত্র বই যা ছাপাখানা থেকে প্রকাশ করা হয়েছে। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/০১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ

মন্তব্য