আগস্ট ০১, ২০২০ ২১:২৮ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সোয়াদের ৫ থেকে ১১ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। প্রথমেই এই সূরার ৫ থেকে ৭ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  أَجَعَلَ الْآَلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ (5) وَانْطَلَقَ الْمَلَأُ مِنْهُمْ أَنِ امْشُوا وَاصْبِرُوا عَلَى آَلِهَتِكُمْ إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ يُرَادُ (6) مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي الْمِلَّةِ الْآَخِرَةِ إِنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلَاقٌ (7)

“(মুশরিক নেতারা বলল) সে কি বহু উপাস্যের পরিবর্তে এক উপাস্যের উপাসনা সাব্যস্ত করে দিয়েছে? নিশ্চয় এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার।” (৩৮:৫)

“তাদের কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তি একথা বলে প্রস্থান করে যে, তোমরা চলে যাও এবং তোমাদের বহু উপাস্যের পূজায় অটল থাক। নিশ্চয়ই এই দৃঢ়তাই তোমাদের কাছে চাওয়া হয়েছে।” (৩৮:৬)

“আমরা সাবেক ধর্মে এ ধরনের কথা শুনিনি। এটা মনগড়া কথা ছাড়া আর কিছু নয়।” (৩৮:৭)

গত আসরে আমরা বলেছি যে, সাধারণ মানুষ যাতে নবীর কথায় আকৃষ্ট হতে না পারে সেজন্য মক্কার মুশরিক নেতারা আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যাবাদী ও যাদুকর আখ্যায়িত করে। এরপর আজকের এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: সেই মুশরিক নেতারা তাদের অনুসারীদের বলে, এখন তোমাদের অনেক উপাস্য রয়েছে। এক এক কাজের জন্য তোমরা এক একজন উপাস্যের কাছে ধর্না দিতে পারো। কিন্তু এই ব্যক্তি (অর্থাৎ আল্লাহর নবী) তোমাদের কাছ থেকে তোমাদের এসব উপাস্যকে কেড়ে নিয়ে মাত্র একজন উপাস্যকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করতে চায়। তার চেয়েও বড় কথা সেই উপাস্যকে দেখা বা ছোঁয়া যায় না।

কাফের দলপতিরা তাদের অনুসারীদের আরো বলে, তোমরা যদি তোমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে চাও তাহলে মূর্তিপূজায় অটল থাকো। মূর্তিপূজা ত্যাগ করে এই ব্যক্তির (অর্থাৎ বিশ্বনবীর) অদ্ভুত কথায় কান দিও না। কারণ, সে যা বলছে তা অতীতে কেউ কখনো শোনেনি। আমাদের পূর্বপুরুষরা উপাসনার ব্যাপারে আমাদেরকে যা শিখিয়ে দিয়ে গেছেন তা হচ্ছে বহু উপাস্যের পূজা। পূর্বপুরুষদের সেই ধর্মে আমরা এমন কথা কখনো শুনিনি।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- নবী-রাসূলদের প্রধান দায়িত্ব ছিল বহু উপাস্যকে প্রত্যাখ্যান করে এক আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করা। বিষয়টি কাফের ও মুশরিকদের কাছে অভিনব ও বিস্ময়কর মনে হয়।

২- বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ তাদের পিতৃপুরুষদের ধর্ম অনুসরণ করতে চায়। এ কারণে নতুন কোনো ধর্ম গ্রহণ করা তাদের জন্য কঠিন ও অবিশ্বাস্য মনে হয়।

৩- কাফের নেতারা সব সময় মহান আল্লাহর ব্যাপারে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে ইসলামের প্রকৃত আলোচনা থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে রাখা। 

সূরা সোয়াদের ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:

أَؤُنْزِلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ مِنْ بَيْنِنَا بَلْ هُمْ فِي شَكٍّ مِنْ ذِكْرِي بَلْ لَمَّا يَذُوقُوا عَذَابِ (8)

“আমরা এত লোক থাকতে কুরআন শুধু কি তারই প্রতি অবতীর্ণ হলো? বস্তুতঃ ওরা আমার কুরআন সম্পর্কে সন্দিহান; বরং ওরা এখনও আমার শাস্তি আস্বাদন করেনি।” (৩৮:৮)

ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াতে মক্কার কাফেরদের একটি অজুহাত ছিল এই যে, কুরাইশ বংশে এত নেতা থাকতে কীভাবে একজন এতিমের কাছে তাও আবার যার কোনো ধনসম্পদ বা প্রতাপ নেই তার কাছে কীভাবে আল্লাহর ওহী নাজিল হয়? যদি আল্লাহ তায়ালা কারো কাছে তাঁর ফেরেশতা নাজিল করতে চাইতেন তাহলে তিনি অবশ্যই কুরাইশ নেতাদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নিতেন। এমন কারো কাছে ওহীর ফেরেশতা আসত যার ধনসম্পদ ও প্রভাব প্রতিপত্তি রয়েছে।

এ ধরনের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য তাদের পক্ষেই দেয়া সম্ভব যারা বস্তুবাদী এবং যারা পার্থিব ধনসম্পদ ও ক্ষমতার অহংকারকে সম্মান ও মর্যাদা লাভের একমাত্র যোগ্যতা মনে করে। তাদের ধারনা, যার যত বেশি সম্পদ ও ক্ষমতা রয়েছে সমাজকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা তার তত বেশি। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ঐশী নেতৃত্ব আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয় এবং এই নেতৃত্ব পাওয়ার জন্য গুনাহমুক্ত জীবনযাপন ও পবিত্র আত্মার অধিকারী হওয়া জরুরি। কাজেই আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন কার মধ্যে এসব খোদায়ী গুণাবলী বিদ্যমান এবং কে রিসালাতের মহান দায়িত্ব গ্রহণ ও তা পালন করতে পারেন।

আয়াতের শেষাংশে বলা হচ্ছে: যারা আত্মম্ভরিতা, বিদ্বেষ ও গোয়ার্তুমির কারণে সত্য গ্রহণ করেনি তাদের জন্য আল্লাহর শাস্তি অপেক্ষা করছে।

এ আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- আত্মগৌরব ও বিদ্বেষ মানুষকে সত্য গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখে।  

২- দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সন্দেহ একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে কোনো বিষয়ে সন্দেহ দেখা দিলে মানুষের উচিত বিষয়টি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনা করা। বিচারবিশ্লেষণের মাধ্যমে বিষয়টি এক সময় তার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু শুধুমাত্র সন্দেহ হয়েছে বলেই কোনো বিষয়কে অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়।

সূরা সোয়াদের ৯ থেকে ১১ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

أَمْ عِنْدَهُمْ خَزَائِنُ رَحْمَةِ رَبِّكَ الْعَزِيزِ الْوَهَّابِ (9) أَمْ لَهُمْ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَلْيَرْتَقُوا فِي الْأَسْبَابِ (10) جُنْدٌ مَا هُنَالِكَ مَهْزُومٌ مِنَ الْأَحْزَابِ (11)

“তাদের কাছে কি আপনার পরাক্রান্ত দয়াবান পালনকর্তার রহমতের কোন ভাণ্ডার রয়েছে?” (৩৮:৯)

“নাকি নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর উপর তাদের আধিপত্য রয়েছে? (যদি তা হয়ে থাকে তাহলে) তাদের উচিত যেকোনো কিছুর সাহায্যে (আকাশে) আরোহণ করা (এবং আপনার প্রতি ওহী নাজিল হওয়ার বিষয়টি প্রতিহত করা।” (৩৮:১০)

“এরা হচ্ছে বহু দল ও বাহিনীর মধ্য থেকে একটি পরাজিত ক্ষুদ্র বাহিনী।” (৩৮:১১)

এই তিন আয়াতের শুরুতে কাফেরদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা কি নবুওয়্যাত দেয়ার দায়িত্ব তাদের কাছে অর্পণ করেছেন যে, তাদের খুশিমতো রাসূল নির্ধারিত হবেন? প্রকৃতপক্ষে এমন কিছু আত্মম্ভরী মানুষ রয়েছে যারা নিজেদেরকে সবজান্তা মনে করে। তারা নিজেদেরকে এতটা জ্ঞানী ভাবে যে, আল্লাহর কর্তব্যও তারা নির্ধারণ করে দিতে চায়। পরের আয়াতে রাসূল (সা.) ও মুসলমানদেরকে উদ্দেশ করে আল্লাহ বলছেন: কাফেরদের এসব ভ্রান্ত কথাবার্তা শুনে আপনি দুর্বলচিত্ত হবেন না। কারণ তারা বহু দল ও বাহিনীর মধ্যে এমন একটি দুর্বল দল বা বাহিনী যারা নবীর সত্যবাণীর প্রচারকে স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম হবে না।”

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১- মহান আল্লাহ মানুষকে ভালোবাসেন বলেই তাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন।

২- মানুষের জন্য বিধিবিধান দেয়ার ক্ষমতা একমাত্র তাঁরই রয়েছে যিনি এই বিশ্বজগত সৃষ্টি ও তা প্রতিপালন করছেন।

৩- যারা আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীতে অবস্থান নেয় প্রবল প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও তাদের পরিণতি পরাজয় ও ধ্বংস ছাড়া আর কিছু নয়।#

 

ট্যাগ

মন্তব্য