সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০ ২০:১৫ Asia/Dhaka

গত কয়েক পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি তৃতীয় শতকের প্রখ্যাত ইরানি ঐতিহাসিক, পবিত্র কুরআনের মুফাস্‌সির ও দার্শনিক মুহাম্মাদ বিন জারির ত্বাবারির জীবন ও অবদান সম্পর্কে কথা বলব।

মুহাম্মাদ বিন জারির ত্বাবারির তারিখে ত্বাবারি নামে খ্যাত বইটি সম্পর্কে আমরা কিছু তথ্য তুলে ধরেছি গত দুই পর্বে। ত্বাবারি তার বিশ্ব-ইতিহাস অংশের শুরুতে মানব-সৃষ্টির সূচনা, শয়তানের মাধ্যমে আদম ও হাওয়ার প্রতারিত হওয়া এবং আদমের সন্তান হাবিল ও কাবিলের ঘটনা তুলে ধরেছেন। এরপর তিনি নবী-রাসুলদের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। ফলে আদমের ঘটনার পরই স্থান পেয়েছে হযরত নুহ নবীর ঘটনা। এরপর ধারাবাহিকভাবে অন্য নবী-রাসুলদের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। এভাবে শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)'র ঘটনাও স্থান পেয়েছে ত্বাবারির বিশ্ব-ইতিহাস অংশে। এরপর ত্বাবারির ইতিহাস গ্রন্থে এসেছে নবীদের উম্মত বা জাতিগুলোর ও ইরানের ইতিহাস। ইরানের ইতিহাস অংশে এসেছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে তথা মানুচেহরের যুগ থেকে খসরু পারভিজের শাসনামলের ইতিহাস। এরপর ত্বাবারি উল্লেখ করেছেন জু-ক্বার নামক যুদ্ধের ঘটনা। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে ইয়াজদ্‌গের্দ বিন শাহরিয়ারের ঘটনা যিনি আরব মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে বার বার পরাজয় সত্ত্বেও দীর্ঘকাল ধরে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। 

মুহাম্মাদ বিন জারির ত্বাবারির ইতিহাসে বনি ইসরাইলের ঘটনাও উঠে এসেছে।  ত্বাবারি তার ইতিহাস বইয়ে রোমের রাজাদের ঘটনা ও খ্রিস্ট ধর্মের সূচনার কথাও তুলে ধরেছেন।  আদ ও সামুদ জাতির ঘটনাও দেখা যায় তার বইয়ে। ইয়েমেনের রাজাদের ও কোনো কোনো প্রখ্যাত আরব ব্যক্তিত্বদের ঘটনাও তিনি তুলে ধরেছেন। এরপর ত্বাবারি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)'র পূর্বপুরুষদেরও বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি ইতিহাসের এইসব বর্ণনায় সনের ধারাক্রম রক্ষা করেননি। ইতিহাসের বিষয়-ভিত্তিক বর্ণনা দিতে গিয়ে ত্বাবারি এখানে বিষয় বা ঘটনার গুরুত্ব অনুযায়ী বর্ণনার ধারাক্রম সাজিয়েছেন তবে অপেক্ষাকৃত পুরনো ঘটনাকে নতুন ঘটনার পরে বর্ণনা করেননি। ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো বর্ণনার পর তিনি নানা ধর্ম ও জাতিগুলোর বিশ্বাস তুলে ধরেছেন। এসবের মধ্যে স্থান পেয়েছে অগ্নি-উপাসক ইরানি জরাথ্রুস্টদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিন্তাধারা। 

পৃথিবীতে কিভাবে আদমের বংশধররা ছড়িয়ে পড়ল সে প্রসঙ্গে ত্বাবারি মহানবীর (সা) কয়েকটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। আর এসব হাদিসের পক্ষে কুরআনের একটি আয়াত তুলে ধরে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। তার বইয়ের এই অংশেই অন্যদের মতামতের চেয়ে ত্বাবারির নিজের মতামত সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। 
সৃষ্টির সূচনা ও বনি-ইসরাইলের নবীদের ইতিহাস তুল ধরতে গিয়ে ত্বাবারি মূলত মুসলিম বর্ণনাকারীদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন এবং এসব বক্তব্যের পক্ষে কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যাও যুক্ত করেছেন। সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে ইরানিদের বিশ্বাসও স্থান পেয়েছে এই ইতিহাস বইয়ে। অনেক ইরানির মতে প্রথম মানুষ হলেন কিউমার্স। ত্বাবারির মতে অতীতের জাতিগুলোর মধ্যে কেবল ইরানি রাজাদের ইতিহাসই পাওয়া যায় অবিচ্ছিন্ন ধারায়। কিন্তু অন্য অঞ্চলের রাজবংশ বা শাসকদের ইতিহাস বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে সময়ের ধারাক্রমের দিক থেকে।

ত্বাবারির ইরানের ইতিহাস পড়ার সময় তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াও ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে ইরানের ইতিহাসের যোগসূত্রের বিষয় মাথায় রাখতে হবে। ইরানের ইতিহাস লেখার সময় ত্বাবারি তথ্যের সূত্রগুলো বর্ণনা করেননি। তিনি এক্ষেত্রে ওয়াকিবহাল সূত্র বা পারস্যের পণ্ডিতরা জানিয়েছেন বা কথিত আছে- এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন। অন্যদের ইতিহাসের সঙ্গে ত্বাবারির ইতিহাস বইয়ের তুলনা করলে দেখা যায় তার এ বইয়ের ইরান অধ্যায়ের তথ্যগুলো ইরানি সূত্র থেকে নেয়া, বিশেষ করে অ্যালেক্সান্ডারের হামলা ও সমসাময়িক ইরানি রাজবংশ সংক্রান্ত বিষয়ের তথ্যগুলো তিনি ইরানি সূত্রগুলো থেকেই তুলে ধরেছেন। ইরানের আশকানি বা পার্থিয়ান রাজাদের শাসনকাল ত্বাবারির ইতিহাস বইয়ে খুব সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ এ সংক্রান্ত অধ্যায়ের ইতিহাস অন্য ঐতিহাসিকদের লেখায় খুব বিস্তারিতভাবে দেখা যায়। অবশ্য অন্য ঐতিহাসিকদের এসব লেখায় অনেক অবাস্তব ঘটনা ও বিষয়ও স্থান পেয়েছে। ত্বাবারি ইতিহাসের এ অধ্যায় বর্ণনার সময়ও তথ্যের সূত্রগুলো উল্লেখ করেননি। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুসলিম লেখকদের বর্ণনা তুলে ধরার সময় তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। 
ইরানের সাসানিয় রাজবংশের ইতিহাস তুলে ধরার সময় দেশি-বিদেশী বিচিত্রময় তথ্য-সূত্র ব্যবহার করেছেন ত্বাবারি। ফলে তার লেখা ইতিহাসের এ অধ্যায়টি সমসাময়িক অন্য লেখকদের বর্ণনার চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। ত্বাবারির ইতিহাস বইয়ে ইয়েমেনের রাজাদের কাহিনীও তুলে ধরা হয়েছে।  ত্বাবারি তার ইতিহাস লেখার সময় বিশেষ করে দ্বিতীয় অধ্যায়ের তথা ইসলামের ইতিহাস বর্ণনায় অনেকটা হাদিস সংগ্রহের পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। ত্বাবারি নিজেও ছিলেন একজন মুহাদ্দিস বা হাদিস-বিশেষজ্ঞ। হাদিস সত্যায়নের পদ্ধতিতে ইতিহাস লেখার পদ্ধতির গোড়া পত্তন মূলত ত্বাবারিরই কৃতিত্ব। তার এই পথ ধরেই ইসলামের ইতিহাস লেখার বিশেষ একটি ধারা সৃষ্টি হয়েছে#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/১৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ

মন্তব্য