সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০ ২০:৩০ Asia/Dhaka

জামিআল বায়ান আন তাওয়িল আই আল কুরআন' শীর্ষক বই তথা তাফসিরে ত্বাবারির লেখক আবু জাফর মুহাম্মাদ বিন জারির ত্বাবারি তাফসির লেখার সময় প্রতিটি বাক্যের পটভূমি বা ভূমিকা সম্পর্কিত বক্তব্যে ওই বাক্যের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন এবং বাক্যটি যে কতভাবে পড়া যেতে পারে তাও উল্লেখ করেছেন।

এরপর তিনি শানে নুজুল বা ওই বাক্য বা আয়াত নাজিলের পটভূমি তুলে ধরেছেন।
ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী গবেষণা বিষয়ের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু রিপিনের মতে, শানে নুজুল পরিভাষাটি সম্ভবত সবার আগে ত্বাবারিই ব্যবহার করেছেন।  

যাই হোক্, কুরআনের আয়াত বা বাক্যগুলোর পটভূমি তথা শানে নুজুল তুলে ধরার পর ত্বাবারি তার তাফসির গ্রন্থে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হাদিস ও ইসলামী বর্ণনাগুলোর সনদও তুলে ধরেছেন এবং এসব বর্ণনা ও হাদিসের বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন নিরপেক্ষ বিচারকের দৃষ্টি দিয়ে।  সবশেষে তিনি নিজের মতামত উল্লেখ করেছেন খুবই সতর্কভাবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ত্বাবারি নিজের মত উল্লেখ করেছেন সংক্ষিপ্তভাবে।

তাফসিরে ত্বাবারিতে পবিত্র কুরআনের প্রথম দিকের সুরাগুলোর তাফসির অংশে দেখা যায় ত্বাবারি প্রথমে একটি বাক্যের বা আয়াতের অংশ বিশেষের তাফসির করেছেন এবং এরপর ক্রমেই তাফসির এগিয়ে চলে ও এক পর্যায়ে একটি বাক্য বা আয়াতের তাফসির সম্পন্ন হয়। আর শেষের দিকের সুরার ক্ষেত্রে কয়েকটি আয়াতের তাফসির বা ব্যাখ্যা এভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ প্রথমে এক আয়াত বা একটি বাক্যের অংশ বিশেষের

ব্যাখ্যা দিয়ে শুরু হয়েছে ও আলোচনা এগুতে এগুতে কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।  
পবিত্র কুরআনের বাক্যগুলোর পটভূমি সংক্রান্ত আলোচনায় ত্বাবারি নিজের ব্যাখ্যামূলক মতামত তুলে ধরতে গিয়ে শব্দগুলোর ও কঠিন পরিভাষাগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ ছাড়াও একই লক্ষ্যে জাহেলি যুগের কবিতা ও অভিধান-বিদ্যা, ব্যাকরণ ও আরবি অলঙ্কার শাস্ত্র বা বাগ্মিতা-বিদ্যা ব্যবহার করেছেন। জাহেলি যুগের তথা ইসলাম-পূর্ব যুগের কবিতা ব্যবহার করার প্রথা ত্বাবারির আগেও প্রচলিত ছিল।  

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে পবিত্র কুরআনের তাফসির তুলে ধরার ক্ষেত্রে ত্বাবারি শব্দের অর্থ ও পরিচিতি তুলে ধরার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে তিনি কোনো কোনো আয়াতের বিষয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনা যুক্ত করে তার তাফসির গ্রন্থটিকে কেবল শব্দ ও পরিভাষার ব্যাখ্যাকেন্দ্রীক তাফসিরের গণ্ডী থেকে বের করে এনে তাকে ঐতিহাসিক তাফসির গ্রন্থের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন।

ত্বাবারি আয়াত সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোকে সংশ্লিষ্ট যুক্তি ও প্রমাণের সঙ্গে সঙ্গতির আলোকে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন। ফলে প্রথাগত উপলব্ধি থেকে পাঠকের উপলব্ধির গতিধারা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেয়া ত্বাবারির জন্য সহজ হয়েছে। এ ছাড়াও এ ধরনের শ্রেণী বিন্যাস ত্বাবারির তাফসির গ্রন্থটিকে বর্ণনার এলোমেলো পাহাড়ে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করেছে।  

তাফসিরে ত্বাবারির লেখক আবু জাফর মুহাম্মাদ বিন জারির ত্বাবারি তার এই মহতী রচনায় নানা বর্ণনা ও হাদিস তুলে ধরার ক্ষেত্রে আরবি ভাষা, উচ্চারণ পদ্ধতি ও ইতিহাস বিষয়ে তার গভীর জ্ঞানকে খুব সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন। ত্বাবারি বহু দেশে তার দীর্ঘ সময়ের সফরের মাধ্যমে এইসব বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। বিধি-বিধান সংক্রান্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি ইসলামী আইন সংক্রান্ত সমালোচনার অবতারণা করেছেন এবং ইসলামী যুক্তি-শাস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত আয়াতগুলোর ক্ষেত্রে তিনি এ সংক্রান্ত নানা মাজহাবের বক্তব্য তুলে ধরে সব শেষে নিজের বক্তব্য যোগ করেছেন।

অবশ্য তাফসিরে ত্বাবারিতে কোনো কোনো দুর্বল বর্ণনা কিংবা হাদিস ত্বাবারির কোনো সমালোচনা বা বিশ্লেষণ ছাড়াই রয়ে গেছে যা গবেষক ও সমালোচকদের বিস্মিত করে।  নানা বর্ণনার মধ্য থেকে সঠিকতর বা সবচেয়ে নিখুঁত বর্ণনাটি বেছে নেয়ার যে সামগ্রিক যে নীতি ত্বাবারি অনুসরণ করে থাকেন তা এসব ক্ষেত্রে ব্যহত হয়েছে।

সঠিক বর্ণনা বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে তাফসিরে ত্বাবারির নীতিমালা বিশেষ কয়েকটি বিবেচনা-নির্ভর। যেমন, যেখানে কোনো বর্ণনার ক্ষেত্রে অভিধানবিদদের সঙ্গে তাফসিরকারকদের মতের ভিন্নতা দেখা গেছে সেখানে ত্বাবারি  তাফসিরকারকদের মতামতকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ছাড়াও ত্বাবারি কুরআনের আয়াতের বাহ্যিক অর্থ রক্ষা করাকে প্রাধান্য দিয়েছেন যতক্ষণ না ওই অর্থ বাদ দেয়ার ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসের দলিল বা যুক্তি খুঁজে পেয়েছেন। তাই অনেকেই ত্বাবারিকে বাহ্যিকতাবাদী বলে দোষারোপ করেন। 

ত্বাবারির তাফসিরের বর্ণনাগুলোর সূত্র বা উৎস বেশ বিচিত্র বলে মনে করা হয়। এইসব বর্ণনার অনেকাংশই তার পূর্ববর্তী মনীষী ইয়াক্বুত হামাভির লেখায় দেখা যায়। অবশ্য ত্বাবারি নিজে তার তাফসিরের সূত্র বা উৎস সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করেননি বলে এ ব্যাপারে কোনো দাবিকে নিখুঁত বলা যায় না। যেসব সনদ ত্বাবারির তাফসিরে ব্যবহৃত হয়েছে তার আলোকে বলা যায় তিনি অতীতের অন্তত ৫০ থেকে ১০০টি বই ব্যবহার করে এ তাফসির লিখেছেন। নানা বিষয়ের এসব বই লেখা হয়েছে ৫০ থেকে ২৫০ হিজরিতে তথা ৬৭০ থেকে ৮৬৪ সনের মধ্যে। ত্বাবারি তার সমসাময়িক যুগের লেখকদের লেখার দিকে দৃষ্টি দেননি।

ত্বাবারি বহু তথ্য-সূত্র বা উৎস ও বহু বই ব্যবহার করে তার তাফসির বইটি লিখেছেন বলে কুপারের মত কোনো কোনো পশ্চিমা প্রাচ্যবিদের মতে ত্বাবারি একজন তাফসিরকারক নন বরং তিনি একটি তাফসির গ্রন্থের সংকলক মাত্র। তাফসিরে ত্বাবারির বেশিরভাগেরই উৎস লিখিত ও এতে সমসাময়িক লেখকদের নানা বিষয় ও বক্তব্য স্থান পেয়েছে বলে এ বইয়ের বেশির ভাগ দলিল বা সনদ সাহাবি ও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম তথা তাবেয়িনদের যুগের দলিল-সনদেই সীমিত। ত্বাবারির তাফসিরের খুব কম দলিলই মহানবীর (সা) কাছ থেকে নেয়া হয়েছে। আর এ জন্যই ত্বাবারির তাফসিরে ইসরাইলি বর্ণনা স্থান পেয়েছে। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ ২৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন। 

ট্যাগ

মন্তব্য