সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০ ১৬:৪২ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি যে সুন্দরতম ও শ্রেষ্ঠ নামগুলো মহান আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য। এসব তাঁরই এক একটি মহান নাম। যেমন, রাহমান, রাহিম, লাতিফ, হাকিম, আজিজ ইত্যাদি।

মহান আল্লাহ চান আমরা আল্লাহকে এসব নামেই ডাকি ও প্রার্থনা করি! এইসব নামে আল্লাহকে ডাকা ও প্রার্থনা করা নানা ধরনের সমস্যার সমাধান করে।
সুরা যুমারের ৬২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: 
আল্লাহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই সবকিছুর রক্ষক বা অভিভাবক। অন্য কথায় আল্লাহর খালিক্ব বা সৃষ্টিকর্তা নামটি হচ্ছে সব কিছুকে অস্তিত্ব দেয়ার তথা সৃষ্টি করার বা জন্ম দেয়ার চাবি। একইভাবে আল্লাহর আরেকটি নাম ফালিক্ব। এর অর্থ তিনিই বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটান। ফলে জন্ম হয় এক নতুন বাস্তবতার। যেমন, উদ্ভিদ। কুরআনের ভাষায়: তিনি মৃত থেকে জীবন্তকে বের করেন ও জীবন্তকে করেন মৃত। তবুও মানুষ কিভাবে বিভ্রান্ত হয়! 
মহান আল্লাহ তাঁর সুনির্দিষ্ট নানা গুণের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করতে সুনির্দিষ্ট নানা নাম সৃষ্টি করেছেন। এইসব নাম মহান আল্লাহর নানা পরিপূর্ণতার অন্যতম। এইসব পরিপূর্ণতার পরিধির মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা। তাই ব্যাপ্তি বা পরিধির দিক থেকেও আল্লাহর নামগুলোর মধ্যেও রয়েছে পার্থক্য। অন্য কথায় এসবের একেকটি ক্ষমতা বা শক্তির মাত্রা সমান নয়। যেমন, মহান আল্লাহ শাফি তথা আরোগ্য দানকারী। আল্লাহর এ নামটি আবার রাজ্জাক তথা রিজিকদাতা নামের আওতাধীন।  রাজ্জাক নামটি আবার খালিক্ব নামের তথা স্রস্টা নামের আওতাধীন। কারণ সৃষ্টি করার পরই সৃষ্ট কিছুকে রিজিক দেয়ার প্রশ্ন আসে ও অসুস্থ হলে সুস্থ করার প্রশ্ন আসে। খালিক্ব নামটি আবার ক্বাদির বা ক্ষমতাধর নামের আওতাভুক্ত। কারণ আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাধর বলে সৃষ্টি করার মত গুণের ওপরও কর্তৃত্বশীল। এভাবে আল্লাহর নানা পর্যায়ের নানা নাম আছে। কিন্তু মহান স্রস্টার এইসব নামের মধ্যে সর্বোচ্চ, সবচেয়ে বড়, পরিপূর্ণ ও সর্বাত্মক নাম হল আল্লাহ যা অন্য কোনো নামের আওতাধীন নয় বরং এই নামের আওতায় রয়েছে আল্লাহর অন্য সব নাম স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই। 

আল্লাহ নামটি মহান আল্লাহর অন্য সব নামেরই ক্ষমতা ও পরিপূর্ণতার ধারক। আল্লাহ নামটিই মহান প্রতিপালকের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ও বিশিষ্ট নাম। আল্লাহ শব্দটিতে রয়েছে আল ও ইলাহ নামক দুটি শব্দের সন্ধি। আল ও ইলাহ শব্দ দুটি যোগ করলে হয় আল ইলাহ্। কিন্তু সংক্ষিপ্ত করার সুবিধার্থে একটি আলিফ বাদ দিয়ে তা হয়েছে আল্লাহ।  
ইলাহ বলতে উপাস্যকে বোঝায়। ইলাহ অন্য অর্থও বোঝায়। যেমন, ইলাহ হলেন এমন কেউ যে তাঁর পরিচিতি তুলে ধরতে আক্বল বা বুদ্ধির দিশাহারা অবস্থা এবং তাঁর প্রেমে বা তাঁর বিরহে বেসামাল অবস্থা যার। ইলাহ বলতে এমন কাউকেও বোঝায় যার অতি উচ্চতা, বিশালতা ও মহত্ত্ব বা মহানত্ব বুঝতে পারলে তাঁকে ভয় করে ও সম্মান করে। খোদাকে কেন আল্লাহ বলা হয় তা এ বিশ্লেষণ থেকেই স্পষ্ট।আল্লাহ দৃশ্যাতীত ও গোপন এবং জ্ঞান-বুদ্ধি বা চিন্তা তাঁর গোপন পর্দা সরিয়ে তাঁকে দেখতে বা বুঝতে সক্ষম হয় না পুরোপুরি। ফলে আল্লাহর পরিচয় নিয়ে মানুষ সত্যিই দিশাহারা ও বেসামাল এবং গভীর প্রেমার্ত অবস্থায় থাকে। অন্যদিকে আল্লাহর স্মরণ মানুষকে দেয় প্রশান্তি। একমাত্র আল্লাহই মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসেন।

 আল্লাহকে ভুলে থাকা বা তাঁর থেকে দূরে থাকা মানুষকে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। প্রাচীন নাম আল্লাহ শব্দটি এ জন্যই পবিত্র কুরআনে আড়াই হাজারেরও বেশি বার স্থান পেয়েছে। এ নাম মানুষের অন্তরে যোগায় আলো ও আল্লাহর প্রতি আশার মাধ্যমে প্রশান্তি। অবশ্য আল্লাহর নামগুলোর উচ্চারণই যথেষ্ট নয়। আমাদের কাজকর্ম ও স্বভাবে এই নামগুলোর আলোর প্রতিফলন বা অনুসরণও থাকতে হবে। 'আল্লাহ' নামের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর সব গুণ ও পরিপূর্ণতার ইশারা এবং সব নামের সমষ্টি। আর এ জন্যই আল্লাহর অন্য সব নামকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আল্লাহ' নামটির গুণবাচক নানা দিক বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্মরণ করা হয়। যেমন, কুরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু তথা গাফুর এবং রাহিম। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব জানেন ও শোনেন তথা তিনি সামিই্‌ ও আলিম। 

 সুরা হাশরের ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:  আল্লাহ-ই সেই মহান সত্তা যিনি ছাড়া কোন মা’বুদ নেই৷ তিনি নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী মালিক বা বাদশাহ, কুদ্দুস বা অপবিত্রতাগুলো থেকে পুরোপুরি পবিত্র, সালাম বা পূর্ণাঙ্গ শান্তি,  জুলুম ও অবিচারের মোকাবেলায় মু'মিন বা নিরাপত্তা দানকারী,  সব কিছুর মুহাইমিন বা সংরক্ষক তথা হিফাযতকারী, আযিয আল যাব্বার তথা সর্বশক্তিমান ও অপরাজেয় বা সবার ওপর বিজয়ী ও শক্তি বলে নিজের নির্দেশ কার্যকরী করতে সক্ষম এবং সবার চেয়ে বড় হয়েই সগৌরবে বিরাজমান থাকতে সক্ষম৷ আল্লাহ সেই সব শিরক থেকে পবিত্র যা লোকেরা করে থাকে ৷ 
২৪) সেই পরম সত্তা তো আল্লাহ-ই যিনি বিশ্বজগত ও এর সৃষ্টিকুল সৃষ্টির পরিকল্পনাকারী, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দানকারী এবং সেই অনুপাতে সৃষ্টির চেহারার রূপদানকারী৷  আসমাউল হুস্‌না বা উত্তম নামসমূহ তাঁরই৷ আসমান ও জমিনের সবকিছু তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করে চলেছে৷ তিনি পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী৷  
আল্লাহর অন্য নামগুলোর তুলনায় খোদ্ আল্লাহ নামটির গুরুত্ব এতই বেশি ও প্রাধান্যযুক্ত যে মুসলমান হতে হলে যে সাক্ষ্য দিতে হয় সেই কলেমার বা বাক্যের মধ্যে তথা আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বাক্যটির মধ্যেও তা স্থান পেয়েছে। আল্লাহ নামটি একত্ববাদ-এর নির্দেশক। আর তাই মুসলমানদের উপাস্য -এর নাম  উল্লেখ করতে গিয়ে অন্য ধর্মের অনুসারীরাও আল্লাহ নামটিই উল্লেখ করেন- ঈশ্বর বা অন্য কোনো দেব-দেবীর নাম বলেন না। 
সবচেয়ে বিখ্যাত ও মহাবরকতময় নাম আল্লাহ শব্দটির প্রচলন ইসলাম-পূর্ব যুগেও ছিল। কাফির মুশরিকরাও এ নামটিকে অস্বীকার করত না। তাদের মতে কথিত দেব-দেবিরূপ মূর্তিগুলোর স্রস্টাও হলেন আল্লাহ! তারা আল্লাহর শরিক, সঙ্গী-সাথী ও পুত্র-কন্যা আছে বলেও দাবি করত। জাহেলি যুগের কবিতায় অবশ্য আল্লাহকে স্রস্টার পবিত্র সত্ত্বা হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।  আল্লাহই যে আকাশ ও জমিনগুলোর স্রস্টা তা কাফেরদের জিজ্ঞাসা করা হলে তারাও তা স্বীকার করবে বলে কুরআনে উল্লেখ রয়েছে। 

 মুসলমান বা অতীত যুগের একত্ববাদীরা আল্লাহর নাম নিয়েই সব কাজ শুরু করেন। আল্লাহ নামটি সব ধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত। আল্লাহর সব গুণের স্মারক আল্লাহ নামটি স্মরণ করলে সব সময় পাপ থেকে মুক্ত থাকা যায়। কুরআনের ভাষায় একমাত্র আল্লাহর স্মরণেই রয়েছে অন্তরের প্রশান্তি।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৩০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য