অক্টোবর ০৩, ২০২০ ১৯:৪৭ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা মহান আল্লাহর নানা নাম এবং বিশেষ করে সবচেয়ে বড়, পরিপূর্ণ ও সর্বাত্মক নাম হিসেবে 'আল্লাহ' নাম-এর ব্যাখ্যা ও এই নামের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি।

মহান আল্লাহর আরও একটি বড় নাম হল রাহমান। 
মহান আল্লাহকে চেনার এক বড় মাধ্যম হল আসমাউল হুসনা বা মহান আল্লাহর নামগুলো। মহান আল্লাহর সত্ত্বা সবার কাছেই গোপন। মহান আল্লাহ ছাড়া আর কেউই তা জানে না। এ প্রসঙ্গে আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ) বলেছেন, 'মহান আল্লাহর সত্ত্বাকে ঠিক যেভাবে জানা দরকার তা একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন।' তবে মহান আল্লাহর নাম ও গুণ সম্পর্কে ধারণ-ক্ষমতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী সামগ্রিক  কিছু ধারণা অর্জন করা সম্ভব।    
আমরা বিশ্ব-জগতে যত প্রভাব ও গুণ বা বৈশিষ্ট্য দেখি তার সবই মহান আল্লাহর নাম ও বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন বা প্রভাব। এ জন্যই আমরা রোগাক্রান্ত হলে আল্লাহকে ডাকি ইয়া শাফিইয়ু বা হে আরোগ্যদাতা বলে। সম্পদের অভাব অনুভব করলে মহান আল্লাহকে ডাক দেই ইয়া গ্বানিউ বা হে সম্পদশালী বলে। আর মন্দ কাজ করে অনুতপ্ত হলে মহান আল্লাহ'র দিকে ফিরতে ও তাঁর সাহায্য নিতে মহান আল্লাহকে 'ইয়া তাওয়াবু' বা হে ক্ষমাশীল বলে ডাকি। আল্লাহর নামগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটির আওতা বা পরিধি বেশি এবং সেসব নামের আওতাধীন হল আল্লাহর অন্য কয়েকটি বা বেশ কয়েকটি নাম। আর মহান আল্লাহর সব নামই হল আল্লাহ নামের আওতাধীন এবং সব নামেরই পূর্ণতার অধিকারী হল এই নাম।

মহান আল্লাহর আরও একটি বড় নাম হল রাহ্‌মান। সুরা আসরার ১১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, হে নবী! আপনি বলুনঃ আল্লাহ বলে আহবান কর কিংবা রাহ্‌মান বলে, যে নামেই আহবান কর না কেন, সব সুন্দর নাম তাঁরই। রাহমান নামটির উৎস হল মহান আল্লাহর অপরিসীম দয়া ও করুণার বৈশিষ্ট্যসূচক গুণের অর্থবোধক শব্দমূল রাহমাত। দয়া হচ্ছে এমন এক গুণ বা হৃদয়ের অনুভূতি যা অন্যদের উপকার বা সাহায্যের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। মানুষের মতো আল্লাহর মধ্যেও দয়ার চেতনা বা অনুভূতি জেগে ওঠে-এমনটা বলা যাবে না। কারণ মহান আল্লাহর সত্ত্বায় কোনো পরিবর্তন ও অচলাবস্থা নেই। আল্লাহর রাহমাত সৃষ্টিকুলের সবার মধ্যে ছড়িয়ে আছে। মহান আল্লাহ দাতা বা দানশীল ও দয়ালু বলেই তিনি মানুষকে রিজিক দেন ও সুপথ দেখান এবং পূর্ণতা অর্জনের পথগুলো দেখিয়ে দেন। মহান আল্লাহ তাঁর অজস্র নেয়ামত তাঁর সৃষ্টিকুলকে দেয়ার ব্যাপারে কখনও দ্বিধান্বিত নন ও কার্পণ্য করেন না। সুরা আরাফের ১৫৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, 
আমার রাহ্‌মাত সব কিছুতে পরিব্যাপ্ত। অর্থাৎ মানুষ, জিন, ফেরেশতা, উদ্ভিদকুল, প্রাণীকুল, জড় বস্তু ও বেহেশত এবং এমনকি জাহান্নামসহ গোটা সৃষ্টি জগতেই ছড়িয়ে আছে মহান আল্লাহর এই রাহমাত।   
মহান আল্লাহর এই রহমতের পাশাপাশি রয়েছে আরেকটি বিশেষ রাহমাত। এই রাহমাতের নাম হল রাহিম। আল্লাহর এই বিশেষ অনুগ্রহ বা দয়া কেবল তাঁরাই পান যারা ঈমান ও সৎকর্মের অধিকারী। ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ) বলেছেন, মহান আল্লাহ সবারই উপাস্য বা মাবুদ। তাই তিনি তাঁর সব সৃষ্টির জন্যই রাহ্‌মান, কিন্তু তিনি কেবল মুমিন বা বিশ্বাসীদের জন্যই রাহিম। অন্য কথায় আল্লাহর সাধারণ রাহমাত তথা রাহমাতে রাহমানি বৃষ্টি ও রোদের মত পাপী-অপাপী, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী হতে শুরু করে সবার জন্য প্রযোজ্য; আর রাহমাতে খাস্ বা রাহমাতে রাহিমি কেবল সৎকর্মশীল বিশ্বাসীদের জন্য প্রযোজ্য। 
মানুষসহ অন্য সব সৃষ্টির অস্তিত্ব লাভ আল্লাহর সাধারণ রাহমাতের ফল। কিন্তু কেবল জিন ও মানুষকেই দেয়া হয়েছে দায়িত্ব পালন করা বা না করার ব্যাপারে স্বাধীনতা। তাই তারা যদি স্বেচ্ছায় মহান আল্লাহর সঙ্গে-করা অঙ্গীকার মেনে চলে ও দায়িত্বগুলো পালন করে তাহলে তারা আল্লাহর বিশেষ রাহমাত বা দয়ার অধিকারী হবে। আল্লাহর অনুগত বান্দাহ আর অবাধ্য কেউ তো একই রকম রাহমাত পেতে পারে না। মুমিন তার সমগ্র সত্ত্বা দিয়ে আল্লাহর বিশেষ দয়ার অর্থবোধক নাম রাহিমকে উপলব্ধি করে। 

মহান আল্লাহর রাহমান নামেরই আওতাধীন হল রাহিম নাম। রাহমান ও রাহিম নামের বিষয়টা যেন এমন যে আপনার ঘরে একটি গুপ্ত ধনের ভাণ্ডার রয়েছে। কিন্তু আপনি তা জানেন না বলে সেখান থেকে এক পয়সাও আপনি ব্যবহার করছেন না। তাই আল্লাহর এই দুই দয়ার ছায়া গুপ্ত ধনের মত সবার মধ্যেই আছে। কিন্তু কেবল বিশ্বাসী ব্যক্তিই ওই গুপ্ত ধনের খবর রাখেন। 
মহান আল্লাহ মানুষকে যে কত দয়া করেছেন তা মুমিন অন্যদের চেয়ে বেশি বোঝেন বলেই এ অনুভূতিই তার কাছে স্বর্গীয় আনন্দের মত তৃপ্তিদায়ক। আর এই অনুভূতির দুয়ার যখন খুলে যায় তখন আল্লাহর অন্য নামগুলোর প্রতিফলনও উপলব্ধি করেন বিশ্বাসী বা মুমিন। ফলে তিনি প্রথমেই আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানান। সুরা ইব্রাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর তাহলে তোমাদের জন্য আমার নেয়ামত বাড়িয়ে দেব। এভাবে বর্ধিত নেয়ামতের জন্য আবারও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পর নেয়ামত আবারও বাড়বে এবং এই ধারা অব্যাহতই থাকবে একইভাবে। কিন্তু কাফের বা অকৃতজ্ঞরা আল্লাহর রাহমাতকে অনুভব করে না বলে ভালো কিছু তাদের হাতে আসে না।
মহান আল্লাহর নামগুলোর মধ্যে রাহমান ও রাহিম এতই গুরুত্বপূর্ণ যে পবিত্র কুরআনের কেবল একটি সুরা ছাড়া অন্য সব সুরা তথা ১১৩টি সুরা শুরু হয়েছে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এই বাক্যটি দিয়ে এবং তা সুরা 'নাম্‌ল্‌'-এ সাবার রানী বিলকিসের প্রতি হযরত সুলায়মান (আ)'র চিঠি শুরুর অংশ হিসেবেও হয়েছে উল্লেখিত। বার বার আল্লাহর নামের পাশে এই দুই নাম স্থান পাওয়ায় এ দুই নামের বিশেষ গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। রাহিম নামটি সব সময়ই বাহ্যিক এবং সুপ্ত দয়া ও ভালবাসাযুক্ত। কিন্তু রাহিম নামের বিপরীতে রাহমান নামটি কখনও কখনও দুঃখ, বিপদ ও শাস্তির মাধ্যমেও প্রকাশ পায়। আল্লাহর মুন্তাকিম বা প্রতিশোধকামী ও মুয়াজ্জিব বা আযাব তথা শাস্তি দাতা নামটিও রাহমান নামের আওতাধীন। তবে রাহমান নামের এই দিকটি তারই আওতাধীন রাহিম নামকে স্পর্শ করে না।
 রাহমান নামের আওতায় সাধারণ রাহমাত জালিম ও খোদাদ্রোহীরাও পেয়ে থাকে। আর জালিম ও খোদাদ্রোহীদের জুলুমটা কেবল অন্যদের ওপরই নয় নিজেদের ওপরও ঘটে থাকে বলে আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তিজ্ঞাপক নামের প্রকাশও এদের ওপর ঘটে থাকে। জাহান্নামও আল্লাহর এক ধরনের রাহমাত। কারণ এর ভয়েই অনেকে পাপ ও জুলুম থেকে দূরে থাকে। আর জালিমদের শাস্তি দেয়ার জন্য জাহান্নামের ব্যবস্থা না থাকলে আল্লাহর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হত না। আল্লাহ অত্যন্ত দয়াশীল বলে মুশরিক ও কাফেররাও আল্লাহর দয়া পেতে পারত। কিন্তু বৃষ্টির পানি যেমন উল্টো করে রাখা পাত্রে বর্ষিত হলেও তা যেমন জমে না তেমনি কাফেররা নিজ আচরণ ও অযোগ্যতার কারণেই আল্লাহর রহমতের এক বিন্দুও ধরে রাখতে পারে না। সুরা তওবার ৮০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মহানবীকে (সা) সম্বোধন করে বলেছেন, তাদের জন্য যদি আপনি সত্তুর বারও ক্ষমা প্রার্থনা করেন তাতে কোনো লাভ নেই! আমরা যে ক্ষমা করব না তা নয়, বরং ওরাই গ্রহণ করে না!  মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর সব নেয়ামতের জন্য শোকরগুজার হওয়ার তৌফিক দান করুন ও আল্লাহর প্রিয়পাত্রদের মতই আমরাও যেন তাঁর অশেষ রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় পাই।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য