অক্টোবর ১৩, ২০২০ ১৬:৩০ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা মহান আল্লাহর নানা নাম এবং বিশেষ করে সবচেয়ে বড়, পরিপূর্ণ ও সর্বাত্মক নাম হিসেবে 'আল্লাহ' নাম-এর ব্যাখ্যা ও এই নামের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি।

এর আগের পর্বে আমরা মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় নাম তথা আল্লাহ নামের গুরুত্ব ও নানা দিক নিয়ে কথা বলেছি। আজ আমরা মহান আল্লাহর রব বা রাব্ নামটি সম্পর্কে কথা বলব। পবিত্র কুরআনে আল্লাহর অনেক নামের মধ্যে আল্লাহ নামটি সবচেয়ে বেশি ও এর পর মহান রাব্ নামের পুনরাবৃত্তি হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
আরবি রব বা রাব্ শব্দের অর্থ মালিক, প্রতিপালক, প্রভু বা মনিব ও সংশোধনকারী বা পরিচালক। যেমন, কুরআনে মহান আল্লাহকে রাব্বিল আ'লামিন, রাব্বিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্‌ অর্থাৎ জগতসমূহের প্রভু, আকাশমণ্ডল ও ভূভাগের প্রতিপালক বা প্রভু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মহানবীর দাদা হযরত আবদুল মোত্তালিব নিজেকে নিজ উটগুলোর মালিক হিসেবে সেসবের রব বা রাব্ বলে উল্লেখ করেছিলেন। 

আবরাহার সেনারা কাবা ঘর ধ্বংস করতে এসে আবদুল মোত্তালিবের উটগুলো নিয়ে গেলে তিনি তা ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন জানান। ওই সেনাদলের প্রধান তখন এ বার্তা দেন যে আবদুল মোত্তালিব যেহেতু গোত্রের প্রধান তাই তিনি অনুরোধ করলে আমরা কাবা ঘর ধ্বংস করব না ও তাঁর উটগুলোও ফেরত দেব। কিন্তু আবদুল মোত্তালিব জানান যে আমি কেবল আমার উটগুলোর রাব‌ বা মালিক; আর এই কাবাঘরেরও একজন রাব বা মালিক রয়েছেন  এবং তিনিই তা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবেন। 
খোদাদ্রোহী জালিম ও তাগুতি রাজারা এবং ফিরআউন-নমরুদ তথা কুফর্ ও শির্কের দলপতিরা কখনও নিজেদেরকে মানুষের স্রষ্টা বলে দাবি করেনি। তবে তারা মানুষের ওপর নিরঙ্কুশ প্রভুত্বের, কর্তৃত্বের ও শ্রেষ্ঠ পরিচালক হওয়ার দাবি করত। যেমন, ফিরআউন দাবি করেছিল যে সে তার রাজত্বের জনগণের বড় রব বা রাব্! তথা জনগণের জীবনের উন্নয়ন ও পরিচালনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সবচেয়ে বড় কর্তৃপক্ষ ও সব উপাস্যের চেয়েও বড় বা বেশি মর্যদাশীল! 
রব বা রাব্ শব্দের আরেকটি অর্থ হল প্রশিক্ষক ও পূর্ণতা দানকারী এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ঘাটতি পূরণকারী।  তাই প্রকৃত রব বা রাব্ হলেন মহান আল্লাহ যিনি সব অস্তিত্বের উৎস ও মালিক। একমাত্র মহান আল্লাহই অন্য সবার চেয়ে সবচেয়ে বেশি জানেন যে সৃষ্টিকুল তথা সব সৃষ্টির পূর্ণতার জন্য কি কি দরকার। অন্য কথায় ইসলামী পরিভাষা অনুযায়ী রব বা রাব্ হচ্ছেন পরিপূর্ণ প্রশিক্ষক তথা জীবনের শুরু থেকে পরিপূর্ণতায় পৌঁছে দেয়ার জন্য যে সিস্টেম বা ব্যবস্থা তাঁরই প্রতিষ্ঠাতা তিনি। 
রব বা রাব্ মহান আল্লাহর পরিপূর্ণ নামগুলোর অন্যতম। আল্লাহর অন্য অনেক নাম এই নামের মধ্যে শামিল রয়েছে। যেমন, খালিক্ব বা স্রস্টা, মালিক, ইলাহ বা উপাস্য, মুদাব্বির বা পরিচালক বা বিচক্ষণ, হাদি বা পথ-প্রদর্শক, আলিম বা জ্ঞানী, মুহ্‌য়ি বা জীবন্তকারী, মুমিত বা মৃত্যু দানকারী, রাজ্জাক বা রুজি দানকারী, হাফিজ বা সংরক্ষক, ওয়াকিল বা অভিভাবক... ইত্যাদি। 
পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে রব বা রাব এমন এক সত্ত্বা যার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মানুষসহ সব অস্তিত্বের মূল। সৃষ্টিকুলের সৃষ্টি থেকে শুরু করে সেসবের টিকে থাকা, উন্নতি ও পূর্ণতা পাওয়াও মহান আল্লাহর ওপরই নির্ভরশীল। তাই যিনি রব বা রাব্ তিনিই খালিক্ব বা স্রষ্টা। কারণ মহান আল্লাহর সৃষ্টি করার গুণটি এমন নয় যে সৃষ্টি করেই তিনি সৃষ্ট বস্তুকে নিজ অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন। প্রতিটি মুহূর্তে সৃষ্টিকুলের ওপর আল্লাহর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে।
রবুবিয়াত হল কোনো কিছু বা অস্তিত্বকে সৃষ্টি করে প্রতি মুহূর্তে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাকে এমন পূর্ণতায় পৌঁছানো হয় যা তার হওয়া উচিত। আসলে সৃষ্টিকুলের সব বিষয় যেমন তাদের রক্ষা করা, জীবন দেয়া ও মৃত্যু ঘটানো, রিজক্‌ বা জীবনের উপকরণাদি দেয়া, উন্নত করা, পথ দেখানো ও পূর্ণতা দেয়া- এসবই পুরোপুরি মহান আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। 
রাব ও খালিক্ব শব্দের অর্থে রয়েছে পার্থক্য। সৃষ্টিকুলকে পরিচালনা করা রাবের বৈশিষ্ট্য। যেমন বাগানের মালি গাছের যত্ন নেয় ও সেগুলোকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে -এই অর্থে তিনি সেসবের রাব্। কিন্তু খালিক্ব মানে তাদের স্রষ্টা বা জন্মদাতা। মুশরিকরা বিশ্ব জগতের স্রষ্টাকে ও বিশ্ব-জগতের রাব্ বা রবকে ভিন্ন মনে করত। তারা মনে করত বিশ্ব জগতের সৃষ্টি ও মৌলিক ব্যবস্থাপনা মহান আল্লাহর হাতেই রয়েছে, কিন্তু রবুবিয়াত বা পরিচালনা ও ছোটোখাটো কাজগুলো অন্য শরীকদের হাতে সমর্পণ করা হয়েছে। আর এইসব কাজের দেখাশুনাকারীরা বিশ্ব জগত পরিচালনায় নিয়োজিত।

কিন্তু পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে আল্লাহ একইসঙ্গে খালিক্ব ও রাব্ বা মুরব্বি। এমন নয় যে সৃষ্টির পর সৃষ্টিকুল স্বয়ংক্রিয় ঘড়ির মত নিজেই কাজ করছে ও আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং এখন সৃষ্টি জগতের ঘটনা-প্রবাহে আল্লাহর কোনো ভূমিকা নেই। এ জন্যই পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে রব বা রাব শব্দকে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে অস্তিত্ব-জগতের পরিচালনার পাশাপাশি তাদের সব বিষয়ই ও সব সত্ত্বাই মহান আল্লাহর রবুবিয়াত-এর আওতাধীন।

উল্লেখ্য আমরাও সবাই মহান আল্লাহর কোনো কোনো নামের রঙ্গে রঙ্গিন হতে পারি। যেমন, মুমিনের প্রতি ভালবাসা ও দয়া দেখিয়ে রহিম নামের রঙ্গে এবং  শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ভূমিকা রেখে রব বা রাব নামের রঙ্গে রঙ্গিন হতে পারি।  
আজকের আলোচনা শেষ করব রব বা রাব্‌যুক্ত শব্দ দিয়ে শুরু হওয়া পবিত্র কুরআনের দুটি দোয়া দিয়ে: রাব্বি জিদনি ইলমা, (সুরা ত্বাহা:১১৪)। অর্থাৎ হে আমার পারওয়ারদেগার বা প্রতিপালক! আমার জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়িয়ে দিন। রাব্বি ইরহামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা (সুরা বনি-ইসরাইল:২৪)। অর্থাৎ হে আমাদের পারওয়ারদেগার বা প্রতিপালক! আমার পিতা-মাতার প্রতি রহম করুন যেমনটি তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য