অক্টোবর ১৬, ২০২০ ২০:৩০ Asia/Dhaka

আশা করছি আপনারা প্রত্যেকে ভালো আছেন। গত আসরে আমরা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী খোররামশাহর মুক্ত করার অভিযান শুরু এবং এর প্রথম দফা আক্রমণ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করেছি।

খোররামশাহর মুক্ত করার ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ অভিযান এত বিশাল এলাকা নিয়ে পরিচালিত হয়েছিল যে, তার কৌশলগত গুরুত্ব ইরান এবং ইরাকের সাদ্দাম সরকার উভয়ের জন্য ছিল অনেক বেশি। এ কারণে, দু’দেশই নিজেদের সামরিক শক্তির একটা বড় অংশকে এখানে কাজে লাগিয়েছিল। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় এই এলাকা দখলে রাখার জন্য সাদ্দাম সরকার প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সামরিক সহযোগিতা এবং আরব দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভর করেছিল। অন্যদিকে তৎকালীন দুই পরাশক্তির অবরোধের মধ্যে থেকেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ভরসা ছিল মহান আল্লাহ তায়ালার মদদ এবং মুমিন ও সাহসি তরুণ যোদ্ধাদের ওপর। এসব যোদ্ধা আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এবং ইসলামি বিপ্লবী চেতনাকে বুকে ধারণ করে মাতৃভূমি মুক্তির লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানের বড় অংশের দায়িত্বে ছিল ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। আর এই বাহিনীর সবগুলো সেনা ইউনিটে ছিল সারাদেশ থেকে যুদ্ধ করতে ছুটি আসা আপামর জনসাধারণ যারা স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে ফ্রন্টে চলে গিয়েছিল। গত আসরে আমরা বলেছিলাম, ইরানি যোদ্ধারা ইরাকি সেনাদের চমকে দিতে খরস্রোতা কারুন নদী পার হয়েছিলেন। কিন্তু কীভাবে সেটি সম্ভব হয়েছিল আজ তার বর্ণনা দেব। কারুন নদীর ওপর অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করার জন্য একদল সুদক্ষ প্রকৌশলীর প্রয়োজন ছিল। পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের সময় ইরানের যেসব সংগঠন বিভিন্ন অভিযানে সফলতার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল তার মধ্যে ছিল ‘জিহাদে সযান্দেগি’ নামের সংগঠন। জিহাদে সযান্দেগির অর্থ গঠনমূলক জিহাদ।

ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের পিছিয়ে পড়া গ্রাম ও শহরগুলোর মানুষকে সহযোগিতা দেয়ার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে সাদ্দাম বাহিনী ইরানে আগ্রাসন চালানোর পর যুদ্ধের প্রয়োজনে নতুন নতুন মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে ‘জিহাদে সযান্দেগি’ তার কর্মপরিধি বৃদ্ধি করে। পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ সংক্রান্ত লেখালেখিতে জিহাদে সযান্দেগির কর্মীদেরকে ‘দুর্গহীন দুর্গ নির্মাণকারী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ইরান-ইরাক আট বছরের যুদ্ধে এই সংগঠনের অসংখ্য কর্মী শাহাদাতবরণ করেন।

বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জিহাদে সযান্দেগির কর্মীরা; যদিও সড়ক ও সেতু নির্মাণের কাজে সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি’র প্রকৌশলীরাও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।  জিহাদে সযান্দেগির সঙ্গে এই দুই বাহিনীর প্রকৌশলীরা মিলে কার্যত সশস্ত্র বাহিনীর একটি বিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর তৈরি করে ফেলেন।

বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানে জিহাদে সজান্দেগির কর্মীরা প্রায় ১০০ যন্ত্র ও উপকরণ নিয়ে সব রকম ইঞ্জিনিয়ারিং সহযোগিতা দেয়ার জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে সঙ্গ দেন। এই অভিযানে কারুন নদী পার হওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর তিনটি ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটেলিয়ন, একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট, এক ব্যাটেলিয়ন ভাসমান সেতু ও এক কোম্পানি জি.এস.পি সেতু কাজে লাগানো হয়। সার্বিকভাবে সেনাবাহিনী ৬৩টি ছোট-বড় যন্ত্র এবং আইআরজিসি ৬০টি যন্ত্র নিয়ে এই অভিযানে অংশ নেয়। অভিযানের প্রথম রাতে কারুন নদীর উপর পাঁচটি পিএমপি সেতু নির্মাণের দায়িত্ব পড়ে সেনাবাহিনীর পদাতিক ইউনিটের ওপর। এই অভিযানে সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি ছিল কারুন নদী পার হয়ে ইরাকি সেনাদের পেছনে গিয়ে আহওয়াজ-খোররামশাহর মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা।

প্রথম রাতে যে পাঁচটি ভাসমান সেতু নির্মাণের কথা ছিল তার তিনটি দ্রুত নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে যায়। আহওয়াজ-খোররামশাহর মহাসড়ক ধরে খোররামশাহর শহরে পৌঁছানোর পথটি ছিল সহজ। কিন্তু তাতে কারুন নদীর উপর স্থাপিত স্থায়ী সেতুটি পার হতে হতো। কিন্তু সেখানে ইরাকি সেনা মোতায়েন ছিল বলে অভিযানের পরিকল্পনা থেকে তা বাদ দেয়া হয়।  সিদ্ধান্ত হয়, অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করে এমন স্থান থেকে নদী পার হতে হবে যাতে ইরাকি বাহিনী ঘুনাক্ষরেও কিছু বুঝতে না পারে।  তথ্য-উপাত্ত প্রমাণ করে, ইরানি যোদ্ধারা যে খোররামশাহর মুক্ত করার জন্য অভিযান চালাবেন সেকথা হানাদার ইরাকি বাহিনী উপলব্ধি করেছিল। কিন্তু কখন ও কীভাবে এই অভিযান চালানো হবে সে সম্পর্কে সাদ্দাম বাহিনী ছিল সম্পূর্ণ অন্ধকারে এবং এ কারণে হামলার আকস্মিকতায় তারা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল।

শত্রু  সেনারা ধরে নিয়েছিল ইরানি যোদ্ধারা খোররামশাহর শহরের উত্তর দিক দিয়ে অভিযান পরিচালনা করবে। প্রচলিত যেকোনো যুদ্ধে সেরকমই হওয়ার কথা ছিল। তাদের ধারণা ছিল খরস্রোতা কারুন নদী পার হয়ে ছোটখাট হামলা হতে পারে এবং তা হবে সর্বোচ্চ একটি সেতু স্থাপনের মাধ্যমে। কিন্তু ইরানি যোদ্ধারা যে রাতের অন্ধকারে একসঙ্গে অনেকগুলো সেতু স্থাপন করে সকল সৈন্যকে নদী পার করিয়ে ওপার নিয়ে যাবে সেকথা তারা ভাবতে পারেনি। তবে প্রথম রাতের অভিযান সমাপ্ত হওয়ার পর ইরাকি বাহিনী যখন মূল বিষয়টি বুঝতে পারে তখন তারা বড় ধরনের পাল্টা হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

ইরাকের তৎকালীন স্বৈরশাসক সাদ্দাম তার পাল্টা হামলা পরিচালনাকারী সেনাদের উদ্দেশে এক বার্তা পাঠান। তাতে তিনি বলেন: “যেসব সেনা ইউনিট তাদের অবস্থান হারিয়েছে তাদের সবাইকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের পূর্বের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে হবে। তা না হলে বিপ্লবী আদালতে তাদের বিচার করা হবে। ” হানাদার বাহিনীর পাল্টা হামলার লক্ষ্য ছিল আহওয়াজ-খোররামশাহর মহাসড়ক এবং সারপোল এলাকা থেকে ইরানি যোদ্ধাদের হটিয়ে দেয়া।  তারা এই কাজে সফল হলে ইরানি যোদ্ধাদের গোটা অভিযান ব্যর্থ হয়ে যাবে- এরকম পরিস্থিতিতে ইরাকি বাহিনীর পাল্টা হামলা শুরু হয়।  ইরাকিদের জন্য হাতছাড়া হয়ে যাওয়া এলাকা পুনরুদ্ধার করা যেমন জরুরি ছিল তেমনি ইরানি যোদ্ধাদের জন্য আহওয়াজ-খোররামশাহর মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণধরে  রাখার ওপর বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযানের সফলতা নির্ভর করছিল।

হানাদার ইরাকি বাহিনী তাদের ১০ নম্বর আরমোর্ড ব্রিগেডকে সামনে নিয়ে ইরানি যোদ্ধাদের ওপর পাল্টা হামলা শুরু করে। এদিকে ইরানি যোদ্ধারা আরোমোর্ড ইউনিট  এবং ট্যাংক ও কামানের মতো ভারী অস্ত্রসস্ত্র ছাড়াই হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।  দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল লড়াই শুরু হয়।  লড়াইয়ের এক পর্যায়ে ইরাকিরা ট্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় মহাসড়কের একাংশ দখল করে। এ অবস্থায় ইরাকি সেনারা মহাসড়কে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারলে ইরানি যোদ্ধাদের প্রতিরোধ ব্যুহ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু দখলদার সেনারা বেশিক্ষণ তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। ইরানের বিপ্লবী যোদ্ধারা এ পর্যায়ে জীবন বাজি রেখে মাতৃভূমি পুনরুদ্ধারের চেতনা বুকে ধারণ করে হানাদার বাহিনীর ওপর বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ফলে সাদ্দাম বাহিনীর ট্যাংকগুলো একের পর এক ধ্বংস হতে থাকে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে আগ্রাসী বাহিনীর পাল্টা হামলা ব্যর্থ হয়ে যায়।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ১৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য