অক্টোবর ১৮, ২০২০ ১৯:৩০ Asia/Dhaka

গত কয়েক পর্বে মহান আল্লাহর আল্লাহ, রাহমান, রাহিম ও রাব্ বা পরিপূর্ণতাদায়ী প্রশিক্ষক ও প্রতিপালক নাম-এর নানা অর্থ, সংশ্লিষ্ট নানা দিক ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা শুনেছি আমরা।

আজ আমরা মহান আল্লাহর মালিক নাম-এর সামগ্রিক নানা দিক ও তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা করব। মালিক বলতে রাজত্বের অধিপতি বা বাদশাহ-এসবকে বোঝায়। কিন্তু মহান আল্লাহ বিশ্ব জগতের তথা গোটা অস্তিত্ব জগতেরই নিরঙ্কুশ অধিপতি ও একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধিকারী। তিনি ইহলোক ও পরলোক এবং বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক জগতসহ সব রাজত্বেরই প্রকৃত মালিক। সব রাজত্ব তারই কর্তৃত্বের আওতাধীন। সব কিছুর স্থায়িত্ব বা টিকে থাকা ও জীবন তাঁরই নির্দেশাধীন এবং আল্লাহ সব কিছুর ওপরই কর্তৃত্বশীল।
আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ) মহান আল্লাহ'র মালিক নামের অর্থ প্রসঙ্গে বলেছেন, পবিত্র অধিপতি বা শাসনকর্তা যিনি সব ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্ত। তাঁর অন্য কয়েকটি নাম হল নিরাপত্তা-দাতা ও সব কিছুর ওপর কর্তৃত্বশীল ও অপরাজেয়, ক্ষতি পূরণকারী এবং সর্বোত্তম মহত্ত্ব ও গৌরবের অধিকারী। এইসব নামকরণের মধ্যে রয়েছে প্রজ্ঞা বা হিকমাত। মহান আল্লাহ সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেছেন ও তাদের ওপর নানা ধরনের আদেশ-নিষেধ জারি করেছেন যাতে মালিক ও শাসনাধিপতি নামের বাস্তবতা ফুটে ওঠে। এই মালিক শব্দের মধ্যে রয়েছে একইসঙ্গে সক্ষমতা বা শক্তিমত্তা,  ভয়াবহতা, কর্তৃত্ব এবং আদেশ-নিষেধ। সুরা আলে ইমরানের ৪৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: .... আল্লাহ যা চান সৃষ্টি করেন ৷ তিনি যখন কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন তখন কেবল এতটুকুই বলেন, হয়ে যাও, তাহলেই তা হয়ে যায়৷’’ তাই মালিক শব্দ দিয়ে মহান আল্লাহর যেসব সক্ষমতা বোঝানো হয় তা পরিপূর্ণ এবং কোনো কিছু সৃষ্টি করার আগে মহান আল্লাহকে এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনাও করতে হয় না। বরং তিনি ইচ্ছা করা মাত্রই তা পরিপূর্ণভাবে অস্তিত্ব লাভ করে।

মালিক বলতে পরিপূর্ণ অর্থে এমন শাসনাধিপতিকে বোঝানো হয় যিনি চিন্তা-ভাবনায়, দূরদৃষ্টিতে, আদেশ-নিষেধে ও নীতি-নির্ধারণে পরিপূর্ণ কর্তৃত্বের অধিকারী এবং কেউই তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। আর কেউই আল্লাহর ওপর কর্তৃত্বশীল নয়। আর এ কারণেই সুরা নাস-এ মহান আল্লাহকে মানুষের মালিক বা মালিকিন্নাস বলা হয়েছে । লক্ষণীয় বিষয় হল সুরা নাস-এ মালিক শব্দটি রাব্বিন্‌নাস বাক্যের পরে এসেছে। এখানে এর মাধ্যমে এটা স্পষ্ট করা হয়েছে যে  মহান আল্লাহ যেহেতু মুরাব্বি বা পরিচালক এবং প্রশিক্ষক অর্থে প্রতিপালক তাই শাসনের অধিকারও একমাত্র তাঁরই। অন্যদিকে মানুষও যাকে তাকে তাদের শাসনকর্তা হিসেবে মেনে নেয় না যদি না তিনি প্রতিপালক হন। মহান আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের প্রতিপালক এবং আমার ও আপনারও প্রতিপালক। কিন্তু মালিক বা শাসনাধিপতি বলতে কেবল আমার বা আপনার শাসককে বোঝায় না সমষ্টিগতভাবে সবার শাসককে বোঝায়। আর এ জন্যই মহান আল্লাহকে মানুষের মালিক বা মালিকিন্নাস বলা হয়েছে।

মহান আল্লাহ সব সৃষ্টির স্রষ্টা। তাই তিনি তাদেরও নিরঙ্কুশ মালিক। তাই সবই তাঁর রাজত্বের আওতাধীন। অবশ্য প্রতিনিধির কাছেও রাজত্ব বা সম্পদ আমানত হিসেবে রাখা যায়। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় ব্যক্তিদের এবং অনেক নবী-রাসুলকেও রাজত্ব দান করেছেন। যেমন, সুরা নিসার ৫৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, 
অবশ্যই আমি ইব্রাহীমের বংশধরদেরকে কিতাব ও হেকমত দান করেছিলাম আর তাঁদেরকে দান করেছিলাম বিশাল রাজ্য। মানুষ সম্পদ ও রাজত্বের অস্থায়ী মালিক হতে পারে। কিন্তু সব কিছুর চূড়ান্ত ও নিরঙ্কুশ মালিক হলেন মহান আল্লাহ। মানুষ আল্লাহর মোকাবেলায় কোনো কিছুরই মালিক নয়। কারণ মানুষ নিজেই হল আল্লাহর সম্পদ। মহান আল্লাহ সুরা নুরের ৩৩ নম্বর আয়াতে বলেছেন, আল্লাহ তোমাদেরকে যে, অর্থ-কড়ি দিয়েছেন, তা থেকে তাদেরকে তথা অধিকারভুক্তদের দান কর। একইভাবে সুরা তওবার ১১১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: আল্লাহ কিনে নিয়েছেন মুসলমানদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। -অন্য কথায় মহান আল্লাহ মানুষকে এতই অনুগ্রহ করেছেন যে তিনি যে মাল বা জীবন মানুষকে দিয়েছেন তা-ই আরও বেশি মূল্য দিয়ে মানুষের কাছ থেকে কিনে নিচ্ছেন!
আমরাও চাইলে মহান আল্লাহর মালিক নামের রঙ্গে রঙ্গিন হতে পারি।

কারণ মানুষ হল দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলিফা। প্রতিটি মানুষই কি আল্লাহর খলিফা? এ প্রশ্নের উত্তর হল ঈমান, সৎকর্ম ও নিষ্ঠার মাত্রা অনুযায়ী একজন মানুষের মধ্যে মহান আল্লাহর নাম ও গুণগুলোর যতটা প্রতিফলন ঘটেছে তার আলোকেই সে মানুষ ততটাই আল্লাহর প্রতিনিধি হতে পেরেছে। একটি কোম্পানির মালিক যেমন নিজ স্থলাভিষিক্ত নির্ধারণের সময় দেখেন যে সুনিশ্চিতভাবে কে চিন্তা-চেতনা ও কাজের দিক থেকে তার সবচেয়ে বেশি সদৃশ তেমনি মহান আল্লাহও তাঁর প্রতিনিধিকে নিজের কোনো কোনো গুণ ও নামের আলো দান করে থাকেন। যেমন, আল্লাহ ত্রুটি গোপনকারী, গোনাহ ক্ষমাকারী, ধৈর্যশীল, সহিষ্ণু, দয়ালু....ইত্যাদি। তাই আল্লাহর খলিফার মধ্যেও কিছু মাত্রায় এইসব বৈশিষ্ট্যের ছায়া থাকতে হবে। 
যিনি আল্লাহর প্রতিনিধি তিনি মালিকও হবেন। নানা বিষয়ে তাঁর নির্দেশ হতে হবে কার্যকর ও কোনো নির্দেশ বাস্তবায়নই যেন তার জন্য কঠিন না হয়। আর এইসবই সম্ভব হয় যখন তার ইচ্ছা হবে আল্লাহর ইচ্ছার অনুরূপ।

 হাদিসে এসেছে: ওয়াজিব নির্দেশগুলো পালন ছাড়া বান্দাহ যেন আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা না করে। যখন ইবাদাত ও সৎকাজের প্রভাবে বান্দাহ আমার কাছে আসে তখন আমি তাকে পছন্দ করি। যখন কেউ আমার পছন্দের লোক বা বন্ধু হয় তখন আমি তার কান ও চোখ হয়ে যাই। ফলে আমি যা দেখি ও শুনি সেও তা দেখে ও শোনে। আমি তার জিহ্বা হয়ে যাই যা দিয়ে সে কথা বলে ও হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে কিছু ধরে।.... 
মানুষ গোনাহ না করলে ও ফরজ এবং সুন্নাত ও মুস্তাহাব দায়িত্বগুলো পালনে সচেষ্ট হলে খোদায়ি নুর তার মধ্যে পড়ে। তখন তার পুরো সত্ত্বা খোদায়ি হয়ে পড়ে। তার চোখ খোদায়ি আলোতে প্রোজ্জ্বল হয় ও তার কান তখন আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে এবং ফেরেশতাদের সঙ্গে সম্পর্কিত হয় ও  খোদা-প্রেমের পথে তার চেষ্টা-প্রচেষ্টা এক্ষেত্রে ফেরেশতাদের নিবেদিত কথা শুনে প্রাণবন্ত হয়। যেসব কথা আল্লাহ পছন্দ করেন কেবল সেইসব কথাই তখন তার মুখ দিয়ে বের হয় এবং তার মুখ দিয়ে অসত্য কিছু বের হয় না। এভাবে তার সব অঙ্গ হয়ে যায় খোদায়ি। আর আল্লাহর এমন প্রিয়পাত্র মালিক বা অধিপতি হওয়াসহ আল্লাহর নানা অনুগ্রহ ও নেয়ামতের অধিকারী হবেন তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। 
মহান আল্লাহ যে মহান বিচার দিবসের মালিক আমরা তা স্মরণ করছি এবং স্মরণ করছি সুরা আলে ইমরানের ২৬ নম্বর আয়াত যেখানে বলা হয়েছে:   
বলুন ইয়া আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত কর। তোমারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ১৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ

মন্তব্য