ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২১ ২০:০০ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা ওয়ালফাজ্র-৪ অভিযান নিয়ে আলোচনা করব। সেইসঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে ইরানের হাতে ধরাশায়ী হওয়ার পর ইরাকি বাহিনী কীভাবে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরানের বিভিন্ন শহরে হামলা চালিয়ে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করত সে সম্পর্কেও খানিকটা ধারনা দেয়ার চেষ্টা করব।

প্রাথমিক ওয়ালফাজর এবং ওয়ালফাজর-১ অভিযানের ব্যর্থতার পর ওয়ালফাজর-২ ও ওয়ালফাজর-৩ অভিযানে তুলনামূলক বড় ধরনের সাফল্য আসে। এর ফলে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে নতুন করে এই আশার সঞ্চার হয় যে, ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতে রয়েছে। আগ্রাসী ইরাকি সেনারা এই দুই অভিযানে শোচনীয় পরাজয়বরণ করার পর ইরানের সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যার পরিকল্পনা হাতে নেয়। ১৯৮৩ সালের ১০ আগস্ট ইরাকের ছয়টি জঙ্গিবিমান ইরানের গিলানগার্ব শহরের আবাসিক এলাকাগুলোতে গুচ্ছবোমা হামলা চালায়। এসব হামলায় অসংখ্য ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়, অন্তত ৫০ বেসামরিক ইরানি নিহত ও ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়।

ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেনী (রহ.) এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেন: “সাদ্দাম ভেবেছে সে এ ধরনের অপরাধ করে আমাদেরকে তার কাঙ্ক্ষিত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করতে পারবে। কিন্তু তার জেনে রাখা উচিত, এ ধরনের প্রতিটি অপরাধ তাকে শান্তি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে এবং আমাদের মনোবল দৃঢ় করছে। যদি এতদিন আমাদের কেউ ভেবে থেকেও থাকে যে, সাদ্দামের সঙ্গে সন্ধি করা উচিত এই অপরাধী হামলার পর কোনো বোধসম্পন্ন মানুষ আর সে চিন্তা করবে না। …অপরাধী তার অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পেতে পারে না…কাজেই সাদ্দাম যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে পেরে না উঠে নিরপরাধ মানুষ হত্যার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তার ফলে তার এতদিনের অপরাধ মুছে যাবে না।”

সাদ্দাম বাহিনী শুধু ইরানের গিলানগার্ব শহরে বিমান হামলা চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং ইরাকি সেনারা ইরানের খুজিস্তান প্রদেশের আন্দিমেশ্‌ক শহর এবং কুর্দিস্তান প্রদেশের মারিভান শহরেও একই ধরনের হামলা চালায়। এসব হামলায়ও ইরানের বহু বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়।

ইরাকের তৎকালীন বাথ সরকার ইরানের শহরগুলোতে হামলা চালানোর জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে পাওয়া ‘স্কাড-বি’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করত। ওয়ালফাজর-৩ অভিযান সফল হওয়ার এক মাস পর ইরাকি সেনারা ইরানের দেজফুল শহরে এ ধরনের চারটি এবং আন্দিমেশ্‌ক শহরে দু’টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। মধ্যরাতে যখন এসব শহরের মানুষ গভীর ঘুমে অচেতন ছিল তখন সাদ্দাম বাহিনী ওই হামলা চালায়। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দেজফুলের ৯৩০টি বাড়ি ও দোকান এবং আন্দিমেশ্‌ক শহরের ৪৩০টি বাড়ি ও দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া, দুই শহরে প্রায় ৭৫ বেসামরিক নাগরিক শহীদ ও ২৫০ জন আহত হয়।

সে সময় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিক দিয়ে ইরানের দুর্বল অবস্থান এবং তেহরানের ওপর পাশ্চাত্যের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কারণে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করা ইরানের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে ইরানি যোদ্ধাদের সঙ্গে সাদ্দামের সেনারা পেরে উঠছিল না। যখনই ইরানের কোনো অভিযানে ইরাকি বাহিনী শোচনীয় পরাজয়বরণ করত তখনই সাদ্দাম কথিত সন্ধির দাবিতে হট্টগোল শুরু করত। এ ধরনের নিরর্থক আহ্বানের জবাবে ইমাম খোমেনী (রহ.) এক ভাষণে বলেন: “আমরা ইসলাম-ভিত্তিক শান্তি চাই। যে সাদ্দাম আমাদের দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চাই। সে তার নির্বুদ্ধিতার কারণে হাজার হাজার মানুষের যে রক্ত ঝরিয়েছে তার বদলা না নেয়া পর্যন্ত আমরা থামব না।”

ইমামের এই দিকনির্দেশনামূলক ভাষণের পর ১৯৮৩ সালের ১৯ আগস্ট ইরানি যোদ্ধারা ওয়ালফাজর-৪ অভিযান শুরু করেন। ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান প্রদেশের মারিভান থেকে ইরাকের পেঞ্জউইন শহর পর্যন্ত প্রায় ১৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে ইরানের ৯ ডিভিশন ও দুই ব্রিগেড পদাতিক সৈন্য এবং ১০টি গোলন্দাজ ব্যাটেলিয়ন অংশগ্রহণ করে। অন্যদিকে ইরাকের ১৬ ব্রিগেড পদাতিক সেনা, সাত ব্যাটেলিয়ন কমান্ডো ও চার ব্যাটেলিয়ন সাঁজোয়া বাহিনী অংশ নেয়। ১০ দিন ধরে এই অভিযান চলে।  ইরাকি বাহিনীর দখলে থাকা ইরানের ভূমি উদ্ধার, ইরাক সরকারের প্রতি অনুগত সশস্ত্র কুর্দি বিদ্রোহীদের চলাচলের পথ বন্ধ করা এবং পেঞ্জউইন শহরকে বাগে আনার লক্ষ্যে এই অভিযান চালানো হয়।

অভিযানের আরেকটি লক্ষ্য ছিল কুর্দিস্তান প্রদেশের ‘বানে’ ও ‘মারিভান’ শহর এবং এর আশপাশের মহাসড়কগুলোকে ইরাকি বাহিনীর হামলার আওতামুক্ত করা। ওয়ালফাজর-৪ অভিযানটি ছিল তুলনামূলক কঠিন। কারণ, এই পাহাড়ি এলাকার উঁচু টিলাগুলোর উপর ইরাকি সেনা মোতায়েন ছিল। কাজেই ইরানি যোদ্ধাদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কসরত করে যেসব পাহাড়ে ইরাকি সেনা ছিল না সেসব পাহাড়ে উঠে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে হয়। পাহাড়ি এই অঞ্চলে ছিল ঘন জঙ্গল এবং সেখানে চলাচলের কোনো রাস্তা ছিল না। কাজেই যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বহন করে নিয়ে যাওয়া ও পাহাড়ে উঠানো ছিল অনেকটা দুঃসাধ্য ব্যাপার। তা সত্ত্বেও অভিযান চালিয়ে পাহাড়ি এলাকাগুলো পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন ইরানি যোদ্ধারা।

শেষ পর্যন্ত ওয়ালফাজর-৪ অভিযানে শত্রুসেনাদের ১১টি ব্রিগেড শতকরা ৩০ থেকে ১০০ ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয় এবং সব মিলিয়ে ১৮ হাজার ইরাকি সেনা হতাহত হয়। ইরানি যোদ্ধাদের হাতে ইরাকের এক হাজার সেনা বন্দি হয়। সেইসঙ্গে ২৭টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান, ৫০টি হালকা ও ভারী যানবাহন, ৫টি জিপগাড়ি, ১০৭টি বিমান বিধ্বংসী গোলা, ১২টি কামান, ৯ গাড়িভর্তি গোলাবারুদসহ বেশ কয়েকটি বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য সামগ্রী গনিমতের মাল হিসেবে ইরানের হস্তগত হয়।

বরাবরের মতোই এই পরাজয়ের লজ্জা ঢাকতে ইরাকি বাহিনী ইরানের দেজফুল, আন্দিমেশ্‌ক, মসজিদ সোলায়মান, বেহ্‌বাহান, খোররামাবাদ ও নাহাভান্দ শহরে দূরপাল্লার স্কাড-২ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। কাপুরুষোচিত এসব হামলায় ইরানের শত শত বেসামরিক নাগরিক হতাহত হন।  সাদ্দাম বাহিনীর নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র বেহবাহান শহরের একটি স্কুলে আঘাত হানলে স্কুলটির ৯৫ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিহত এবং প্রায় ৪০০ কোমলমতি শিশু আহত হয়।#                                                                                                                                                                                   

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ২৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ