মার্চ ০১, ২০২১ ২০:৩০ Asia/Dhaka

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন ইরান প্রাচীন সভ্যতার একটি দেশ। সুতরাং এ দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি যে বেশ সমৃদ্ধ তা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাহিত্য সংস্কৃতির নেপথ্য প্রেরণা ছিল ইরানের সাহিত্য। অসংখ্য গল্প কিংবা প্রবাদ প্রবচন যেসব আমরা প্রায়ই মুখে মুখে উচ্চারণ করি সেগুলো যে ইরানের অনেকেরই হয়তো তা জানা নেই।

খ) সেইসব গল্প রূপকথার মতো মনে হলেও এগুলো আমাদের জীবনের নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে আছে। আমরা সেইসব গল্প এবং প্রবাদের পেছনের গল্প নিয়ে এ আসরে আপনাদের সঙ্গে থাকবো বলেছি। গত আসরে আমরা শিক্ষণীয় একটি গল্প শুনিয়েছি আপনাদের। আশা করি যারা শুনেছেন ভালো লেগেছে আপনাদের। এক বাদশাহর দুই মন্ত্রীর ঘটনা নিয়ে ছিল গল্পটি। একজন মন্ত্রী ছিল ভালো মনের অপরজন ছিল হিংসুটে। ভালো মনের উজির একজন প্রজাকে বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে। তাতে বাদশাহরও মান সম্মান রক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু খারাপ উজির ভালো উজিরকে ফাঁসিয়ে দিতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে গেছেন এবং বরখাস্ত হয়েছে। আশা করি জগদ্বিখ্যাত কবি সাদি'র গোলেস্তান থেকে নেওয়া ওই গল্পটি আপনাদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি চিন্তার জগতেও নাড়া দিয়েছে।

ক) 'ডালের আগায় বসে গোড়া কাটা'-এই প্রবাদটির সঙ্গে আমাদের অনেকেরই কমবেশি পরিচয় আছে। এই প্রবাদের সাধারণ অর্থ হলো আত্মঘাতী কাজ করা। আমাদের সমাজে এরকম অনেক মানুষ আছে যারা বুঝে হোক কিংবা না বুঝে হোক অনেক রকম আত্মঘাতী কাজ করে অভ্যস্ত। অর্থাৎ তারা গাছের যেই শাখাটির আগায় বসেছে ওই শাখাটিরই গোঁড়া কেটে দিচ্ছে। গোঁড়া কাটা হলে তার কী অবস্থা হতে পারে? নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে ডালের সঙ্গে সঙ্গে তার নিজেরও পতন হবে এবং মৃত্যুও হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের একটি আত্মঘাতী প্রবাদ কী করে এলো আমাদের সাহিত্য ও জীবনে-এরকম একটি প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগতে পারে। আমরা ফার্সি ভাষার এ প্রবাদটির প্রাচীন একটি গল্প পেয়েছি। সেই গল্পটিই আজকের আসরে পরিবেশন করছি আপনাদের জন্য।

খ) কথা তো অনেক হলো। এবার সরাসরি গল্প শুরু করা যাক।

ক) হ্যাঁ ঠিক বলেছেন। শুরু করে দিন।

খ) জি! ঘটনাটি ঘটেছিল একটি বাগানে। বাগানে একটা চোর ঢুকেছিল। ফলের বাগান ছিল ওটা। চোর বাগানের এদিক ওদিক ভালো করে দেখলো। কোথাও কাউকে নজরে পড়লো না তার। ফাঁকা বাগানে ফল চুরি করার জন্য চোর ফলের গাছে উঠে গেল। ফল ছিঁড়তে ছিঁড়তে একেবারে গাছের মাথায় বেশ উপরে চলে গেল সে। মনের সুখে ফল চুরি করতে লাগলো চোর। এইবার তার সাড়ে বারোটা বাজলো। বাগানের মালি বা প্রহরী যাই বলি না কেন সে বাইরে থেকে ঢুকলো বাগানে।

ক) সর্বনাশ … তারপর কী হলো? ধরা পড়ে গেল?

খ) বলছি বলছি …! চোর মালিকে বাগানে ঢুকতে দেখে চুপটি মেরে বসে রইলো গাছের উপরের ডালে। কিন্তু গাছ তখনও নড়ছিল এবং যথারীতি মালির চোখে ধরা পড়ে গেল চোর।

ক) সঙ্গে সঙ্গে চীৎকার করে চোরকে বললো: এ…ই! বদমাশ! চোর কোথাকার! গাছের এতো উপরে কী করছিস তুই! চোর যদিও ভেবেছিল এই লোক বাগানের প্রহরী বা মালি, আসলে কিন্তু তা নয়, এই লোকই মূলত ওই ফল বাগানের মালিক ছিল। চোর তার ভাবনামতো জবাব দিলো:

খ) দেখতে পাচ্ছো না কাজ করছি? এই বলে সে গান ধরলো মনের সুখে … এই সুন্দর ফল সুন্দর ফুল …! হঠাৎ গান থামিয়ে বললো: এটা আমার ফল বাগান। আমি বাগানের এই বড় গাছটার একেবারে চূড়ায় উঠে গেছি … মিঠা নদীর পানি

ক) বাগানের মালিক চোরের কথা শুনে এদিক সেদিক খুঁজে খুঁজে একটা বড় বাঁশ হাতে নিলো। তারপরের কাহিনী শুনবো একটু মিউজিক বিরতির পর। বিরতির পরও আপনাদের সঙ্গে পাবো এই প্রত্যাশা রইলো।

খ) বন্ধুরা! বিরতির পর আবারও স্বাগত আপনাদের গল্প ও প্রবাদের গল্প অনুষ্ঠানের আজকের আসরে। বিরতির আগে বলছিলাম বাগানের মালিক চোরের কথা শুনে এদিক সেদিক খুঁজে খুঁজে একটা বড় বাঁশ হাতে নিলো। ওই বাঁশ দিয়ে এবার চোরের পায়ে পিঠে পেটাতে লাগলো। পেটাতে পেটাতে বললো: কবে থেকে তুই এই বাগানের মালিক হলি, বল, বল?

ক) চোর এবার মনে মনে বললো: আয় হায়! নাজানি এই লোকই বাগানের মালিক। হয়তো পাশের বাগানটিও তার। নিজেকে হাত-পা'সহ গুটিয়ে নিয়ে চোর এবার আরেকটু উপরে উঠে একটা ডালের আগায় গিয়ে নিজেকে লুকালো যাতে বাগানের মালিক নাগাল না পায়, পেটাতে না পারে।

খ) এরপর চোর তার পকেট থেকে একটা বড় ছুরি বের করলো। ওই ছুরি দিয়ে সে এবার ওই ডালেরই গোঁড়া কাটতে শুরু করলো। কাটতে কাটতে বাগানের মালিকের উদ্দেশে বললো: ডিস্টার্ব করো না। বাগানের মালিক বলেছে গাছের অতিরিক্ত ডালগুলো কেটে দিতে। আমি সেই কাজই করছি।

ক) চোরের কথা শুনে বাগানের মালিক হেসে দিলো …হা হা হা! বললো: এতো ডাহা মিথ্যা কথা বলতে লজ্জা করে না? এই বাগানের মালিক আমি নিজে। আমি কখন তোকে টাকা দিলাম আমার বাগানের গাছগুলোর বাড়তি ডালপালা কেটে দিতে?

খ) চোর বেচারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। নিরুপায় হয়ে সে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মৃত্যুকেই ডেকে নিয়ে এলো। বাগানের মালিক বললো: নীচে নেমে আয়। তোর আক্কেলও তো দেখি গুড়ুম! যেই ডালের আগায় বসেছিস ওই ডালেরই গোঁড়া কাটতে শুরু করেছিস! হাবা কোথাকার … আরেকটু কাটলে তো ডালটা কেটে যেত এবং এতো উপর থেকে মাটিতে পড়ে পটল তুলতিস। তুই যদি সত্যিই এই কাজের লোক হইতি তাহলে জানতি কী করে অতিরিক্ত ডালপালা কাটতে হয়।

ক) চোর এবার তার বোকামি বুঝতে পেরে ভীষণরকম অনুতপ্ত হলো, লজ্জা পেল। ধীরে ধীরে সে গাছ থেকে নীচে নেমে এলো। বাগানের মালিক যে কী শাস্তি দেবে-সেটা সে সহ্য করতে পারবে কিনা; এই চিন্তায় সে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো।

খ) কিন্তু … অবাক ব্যাপার হলো-বাগানের মালিক চোরকে একটা কথাও বললো না। মালিকের সামনে মাথা নিচু করে চোর দাঁড়িয়ে রইলো। মালিক কিছু না বলায় একটু পর মাথা নিচু করেই চোর বাগান থেকে বের হয়ে চলে গেল।

ক) বাগানের মালিক বিড়বিড় করে জগদ্বিখ্যাত কবি সাদির একটি উদ্ধৃতি আওড়ালো: যে লোক নিজেকে তার জ্ঞানের চেয়েও বেশি পণ্ডিত ভাবে, সে আসলে মূর্খ।

খ) সেদিনের পর থেকে যখনই কেউ এমন কোনো কাজে লিপ্ত হয় যে কাজ তার নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনতে পারে অর্থাৎ আত্মঘাতী হয়, তখনই মানুষের মুখ থেকে অবলীলায় এ কথাটি বেরিয়ে আসে: লোকটি 'ডালের আগায় বসে গোঁড়া কাটছে'।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ