এপ্রিল ০৪, ২০২১ ২০:৩০ Asia/Dhaka

ক) বন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। নতুন ধারাবাহিক "গল্প ও প্রবাদের গল্প" আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন ইরান প্রাচীন সভ্যতার একটি দেশ। সুতরাং এ দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি যে বেশ সমৃদ্ধ তা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না। শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে বিশ্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাহিত্য সংস্কৃতির নেপথ্য প্রেরণা ছিল ইরানের সাহিত্য। অসংখ্য গল্প কিংবা প্রবাদ প্রবচন যেসব আমরা প্রায়ই মুখে মুখে উচ্চারণ করি সেগুলো যে ইরানের অনেকেরই হয়তো তা জানা নেই।

খ) সেইসব গল্প রূপকথার মতো মনে হলেও এগুলো আমাদের জীবনের নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে আছে। আমরা সেইসব গল্প এবং প্রবাদের পেছনের গল্প নিয়ে এ আসরে আপনাদের সঙ্গে থাকবো বলেছি। গত আসরে আমরা শিক্ষণীয় একটি প্রবাদের গল্প শুনিয়েছি আপনাদের। আশা করি যারা শুনেছেন ভালো লেগেছে আপনাদের। যাই হোক আজকের আসরেও আমরা শুনবো একটি প্রবাদ এবং সেই প্রবাদের নেপথ্য গল্প।

বর্ণিত আছে যে, একটা কৃষি খেত বা বলা যায় খামারের ভেতর বাস করতো একটা মোরগ। মোরগটা দেখতে যেমন সুন্দর ছিল তেমনি সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক ছিল ওই মোরগের ডাক। সময়ে অসময়ে সেই মারগ হঠাৎ করেই ডেকে উঠতো ... কুক কুরু .... কু .. কুক কুরু .... কু। মোরগ ওই সুন্দর ডাক যে-ই শুনতো তারই ভালো লাগতো। কেবল ওই আওয়াজ উপভোগ করতো একটি প্রাণী। তার নাম শেয়াল। শেয়ালের ধুরন্ধর বুদ্ধির কথা কে না জানে। দুষ্ট বুদ্ধির জন্য পুরো বনেই শেয়ালের নাম সুপরিচিত। এই শেয়াল সবসময় মোরগের খেয়াল রাখতো। অনেক দূর থেকে সে মোরগের চলাফেরার ওপর নজর রাখতো। মোরগ কোথায় যায়, কখন কী করে-ইত্যাদি সবকিছু। মনে মনে শেয়াল বলতো: একটা বুদ্ধি বের করা দরকার যাতে এই সুন্দর আহ্বানের সুরেলা কণ্ঠধারী মোরগটাকে শিকার করে মহানন্দে খাওয়া যায়।

শেয়াল বলে কথা। তার তো ষোলোকলাই বুদ্ধিতে পূর্ণ। সুন্দর মোরগটাকে বাগে এনে শিকার করার জন্য নানা ফন্দি ফিকির করলো। শত শত ফন্দি ফিকির থেকে একটাকে সে বেছে নিলো শিকারের জন্য উপযুক্ত ভেবে। ওই ফন্দিকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে সে তার তৎপরতা শুরু করে দিলো। একদিন খুব ভোরে ভোরে ধীর ধীরে একেবারে নি:শব্দে মোরগের খুব কাছে চলে গেল এবং বললো: সালাম! এটা কি শিম-ফুল মোরগের খামার? মোরগ জবাবে বললো: আমি এই খামারের একমাত্র মোরগ। এখানে অন্য কোনো মোরগের অস্তিত্ব নেই। শিম ফুল মোরগ নামে কাউকে চিনি না আমি।

চালাক শেয়াল বললো: এই নামটা অবশ্য এখান থেকে খানিক দূরের একটি খামারের প্রাণীরা দিয়েছে। তারা সুন্দর এবং অপূর্ব কণ্ঠের একটি মোরগকে এই নাম দিয়েছে। কারণটা হলো ওই মোরগের কণ্ঠের আওয়াজে সবাই মুগ্ধ হয়ে যায়। আমি অবশ্য এখানে অপরিচিত এক আগন্তুক। কাউকে চিনি টিনি না। তবে আমিও অন্যদের মতো দূর দূরান্ত থেকে সেই মোরগের কুক কুরু .... কু শুনেছি। আ হা হা .. সে কি মধুর আওয়াজ! তুমি কি তাকে চেনো? চিনলে আমাকে একটু দেখিয়ে দাও! আমি তাকে অনুরোধ করবো অন্তত একটিবার সে যেন আমাকে তার কুকুলি কুকু গানটা শোনায়।

কুকুলি কুকু গানটা শোনানোর ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিল শেয়াল। কিন্তু মোরগ জানতো এখানকার কোনো খামারেই কিংবা এর আশেপাশেও অন্য কোনো মোরগের অস্তিত্ব নেই। সুতরাং এই প্রশংসা যে তার আওয়াজের জন্যই সেটা সে মনে মনে নিশ্চিত হয়ে ব্যাপক খুশি হয়ে গেল। মনে মনে ভাবছিল যে শেয়ালকে বলে দেবে ওই সুন্দর আওয়াজের মোরগ সে নিজেই। তার আনমনা ভাবনার ভেতরেই শেয়াল বলে উঠলো: অবশ্য আমি এটাও জানি যে তুমিও দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি সুন্দর কণ্ঠেরও অধিকারী। নাকি তুমি নিজেই সেই শিম ফুল মোরগ! তাই যদিহয় তাহলে অনুরোধ করবো অন্তত একটিবার কুকুলি কুকু করে ডাকো! তোমার ডাক শুনে আমি নিশ্চিত হবো যে সেই রূপকথার গল্পের মতো শিম ফুল মোরগের সঙ্গে দেখা করার সৌভাগ্য লাভ করেছি।

মোরগ তার চোখ দুটো বন্ধ করলো। তারপর চেষ্টা করলো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ধ্বনিতে কুকুলি কুকু ডাকতে। আর এই সুযোগটাকেই যথাযথভাবে কাজে লাগালো শেয়াল। ডাকের মাঝেই সে ঝাঁপিয়ে পড়লো মোরগের ওপর। দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ছুটলো পাশের ঝোপ-ঝাড়ের দিকে। মোরগের চীৎকার চেঁচামেচি বেড়ে গেল। সেই কুঁকিয়ে চীৎকারের শব্দ শুনতে পেল খামারের কুকুরগুলো। তারা সেই শব্দ অনুসরণ করে শেয়ালের পিছু নিলো। কুকুরগুলো দেখতে পেল শেয়াল মোরগটিকে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে দৌড়াচ্ছে। তারাও তাই শেয়ালের পেছনে দৌড়াতে শুরু করলো। মোরগ ততক্ষণে বুঝতে পেরেছে যে সে শেয়ালের মধুর কথার জালে আটকা পড়েছে। মনে মনে চিন্তা করলো এবং শেয়ালকে বললো:

মোরগ শেয়ালকে বললো: তুমি যদি কুকরগুলোর আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাও তাহলে আমার সম্পর্কে বলো যে আমি হলাম ওই নীচের খামারের মোরগ, এই খামারের না। তুমি এসেছো আমাকে সেই নীচের খামারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। শেয়াল যখন দেখলো যে কুকুরগুলো আস্তে আস্তে তার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি চীৎকার করে বললো: আরে ... এই মোরগ তো তোমাদের খামারের মোরগ নয় ...! বলেই সে বুঝতে পারলো যে সেও ফাঁদে পড়ে গেছে। চীৎকার করার সাথে সাথে তার মুখ খুলে গেছে এবং মোরগ মুখ থেকে ছুটে পড়ে গেছে। তাকিয়ে দেখলো মোরগ দৌড়ে চলে গেছে কুকুরগুলোর কাছে।

কুকুরগুলো মোরগকে মুক্তি দেওয়ার পর শেয়ালের পিছু নেয়া বাদ দিয়ে দিলো। শেয়াল যখন দেখলো যে কুকুরগুলো আর তার পিছু নিচ্ছে না, পাশেই একটু বসলো এবং যে ঘটনাটা ঘটে গেল তা নিয়ে ভাবলো। ভেবেচিন্তে সশব্দে বললো: অসময়ে খুলে যাওয়া মুখকে ঘৃণা জানাই। মোরগ শেয়ালের ওই আক্ষেপের কথা শুনতে পেল। কেন যে এ কথা বলেছে শেয়াল, মোরগ সেটা বুঝতে পারলো। তাই মোরগ একটু দাঁড়ালো এবং সেও সশব্দে বললো: অসময়ে বন্ধ হওয়া চোখের প্রতি অভিশাপ। এই ঘটনার পর থেকেই কেউ যদি বেফাঁস অসংলগ্ন কোনো কথা বলে কিংবা না ভেবেচিন্তে কোনো কাজ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন এই প্রবাদটি আওড়াতে ভোলে না: ‘অসময়ে বন্ধ হওয়া চোখ অন্ধ হোক’।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ