এপ্রিল ০৬, ২০২১ ১৬:২০ Asia/Dhaka

আগ্রাসী ইরাক সরকার যুদ্ধের তৃতীয় ও চতুর্থ বছরে এসে তার রণকৌশলে পরিবর্তন এনেছিল।

কাজেই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য ইরানকেও নতুন নতুন কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। জলাভূমিতে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইরাকিদের দুর্বলতার কথা বিবেচনা করে এবং যুদ্ধের সমীকরণকে ইরানের অনুকূলে নিয়ে আসতে দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের হোর অঞ্চলে বড় ধরনের অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন ইরানের সমরবিদরা। তারা তিনটি লক্ষ্যকে সামনে রাখেন। এক, জলাভূমিতে যুদ্ধ করতে ইরাকিদের দুর্বলতা, দুই, অতর্কিত আক্রমণ সামাল দিতে ইরাকি বাহিনীর অসহায়ত্ব এবং তিন, হোর অঞ্চলে অভিযান চালাতে ইরানি যোদ্ধাদের পারদর্শিতা।              

১৯৮৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ইরানি যোদ্ধারা সবগুলো ফন্টে একসঙ্গে অভিযান শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে ইরাকি বাহিনীকে হতবাক করে দিয়ে তারা ইরাকের অভ্যন্তরে বেশ কিছুদূর এগিয়ে যান। অভিযানের চতুর্থ দিনেই ইরানি যোদ্ধাদের একাংশ ইরাকের আল-কারনা শহরে প্রবেশ করেন। শহরের সাধারণ জনগণ ইরানি বাহিনীকে স্বাগত জানান এবং তাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী ইরানি যোদ্ধাদের চলার পথে দুম্বা জবাই করে তাদের সাফল্য কামনা করেন। অন্যদিকে অভিযানের উত্তর ফ্রন্টে ইরানি সৈন্যরা আল-আজির শহরের নিকটবর্তী নদীর তীরে পৌঁছে যান এবং বসরা-বাগদাদ মহাসড়কের যান চলাচল বন্ধ করে দিতে সক্ষম হন। 

অভিযানের এ পর্যায়ে উত্তর মাজনুন ও দক্ষিণ মাজনুন দ্বীপকে ঘিরে ফেলে শহর দু’টিকে সহজেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন ইরানি যোদ্ধারা। তাদের এই অতর্কিত হামলায় ইরাকি বাহিনী এতটা হতচকিত হয়ে যায় যে, তারা আল-আম্মারা শহরে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং ইরানি যোদ্ধাদের মোকাবিলায় হেলিকপ্টারের সাহায্যে সেনা পাঠায়। অভিযানের দ্বিতীয় অংশে মাজনুন ও তালায়িয়েহ দ্বীপকে পুরোপুরি দখল করে ইরাকের আরো গভীরে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু এ পর্যায়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় প্রাথমিক কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা থেকে বেরিয়ে ইরাকি সেনারা কিছুটা প্রকৃতিস্থ হয় এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা প্রথমে বসরা-আল-আম্মারা মহাসড়ক থেকে ইরানি যোদ্ধাদের হটিয়ে দেয় এবং এরপর তালায়িয়েহ দ্বীপে ইরানি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

এদিকে তালায়িয়েহ দ্বীপটি নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গোটা অভিযানের সাফল্য নির্ভর করছিল বলে এই ফ্রন্টে ইরানি যোদ্ধারা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই দ্বীপের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলা থেকে ইরাকি বাহিনীকে হটিয়ে দিতে পারলে এর পেছনের শুষ্ক ভূমির সঙ্গে ইরানি যোদ্ধাদের সংযোগ স্থাপন করা এবং অভিযানের পরিধি আরো বাড়ানো সম্ভব হতো। এখানকার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ইরানি যোদ্ধাদের শিবিরে চমৎকার আধ্যাত্মিক পরিবেশ বিরাজ করছিল। তারা যুদ্ধে জয় অথবা শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তালায়িয়েহ দ্বীপটি ছিল অত্যন্ত ছোট এবং ওই এলাকায় অবস্থানরত ইরানি যোদ্ধাদের ওপর ইরাকি বাহিনী মুহূর্মুহূ গোলাবর্ষণ করে যাচ্ছিল। এ সম্পর্কে ওই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধা শহীদ হুজ্জাতুল ইসলাম মেইসামি বলেন, “যারা তালায়িয়েহ যুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তারা কারবালার ময়দানে থাকলেও প্রতিরোধ করতেন। কারবালা থেকে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের দলে ভিড়তেন না।”

শত্রুর তীব্র গোলাবর্ষণের মুখে ইরানি যোদ্ধাদের পক্ষে দজলা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে; ফলে তারা উত্তর ও দক্ষিণ মাজনুন দ্বীপের দিকে পশ্চাদপসরণ করেন। দুই মাজনুন দ্বীপ দখলে রাখার উদ্দেশ্যে তালায়িয়েহ ফ্রন্টে অভিযান অব্যাহত রাখার এবং দক্ষিণ মাজনুন দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ইরাকি বাহিনী অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা এবং মাইন পেতে রাখার কারণে এই দ্বীপে যাওয়ার মতো সহজ পথ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি; ফলে এই অংশের অভিযান ব্যর্থ হয়। ইরাকি বাহিনী উত্তর দিকের নোশভে উপত্যকা দিয়ে দক্ষিণ মাজনুন দ্বীপে হামলা চালায় এবং তাদের কিছু ট্যাংক ওই দ্বীপে প্রবেশ করে।

ইরানের ‘আশুরা’ ও ‘নাজাফ’ ডিভিশনের যোদ্ধারা ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত এই ট্যাংকের মোকাবিলায় প্রতিরোধ করেন এবং দক্ষিণ মাজনুন দ্বীপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। এমন সময় এ যুদ্ধ সংঘটিত হয় যখন ওই দ্বীপে অবস্থানরত ইরানি যোদ্ধাদের কাছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও রসদ পৌঁছে দেয়ার উপায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। নৌকা এবং হেলিকপ্টারে করে সীমিত আকারে ইরানি যোদ্ধারা রসদ পাচ্ছিলেন। এ কারণে দক্ষিণ মাজনুন দ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ স্থাপনের জন্য অস্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আর ওই সেতু নির্মাণ করতে হলে তালায়িয়েহ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে রাখা ভীষণ জরুরি হয়ে পড়ে। এ কারণে ওই অঞ্চলে মোতায়েন ইরানি যোদ্ধাদের সমর্থনে নতুন করে দুই ডিভিশন সৈন্য পাঠানো হয়।

নতুন করে প্রেরিত এই যোদ্ধাদের সহযোগিতায় তালায়িয়েহ অঞ্চলে ইরাকি বাহিনীর সামনের সারির প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেঙে দিতে সক্ষম হয় ইরান। কিন্তু একই সময় দক্ষিণ মাজনুন দ্বীপ থেকে ইরানি যোদ্ধারা পূর্ব পরিকল্পিত হামলা চালাতে ব্যর্থ হন।  এ কারণে ইরানি সৈন্যরা তালায়িয়েহ সেতুতে পৌঁছাতে পারেননি; ফলে মাজনুন দ্বীপে যাওয়ার রাস্তা খুলে দেয়াও সম্ভব হয়নি।

অভিযানের তৃতীয় পর্বে ইরাকি বাহিনীর হামলা বেড়ে যাওয়ার কারণে উত্তর ও দক্ষিণ মাজনুন দ্বীপ দখলে রাখার লক্ষ্যেই মূলত ইরানি যোদ্ধারা প্রতিরোধ চালিয়ে যান। এদিকে হোর অঞ্চলে ইরানি সৈন্যদের উপস্থিতি মেনে নেয়া ইরাকি বাহিনীর পক্ষে সম্ভব ছিল না; তাই তারা যেকোনো উপায়ে ওই দুই দ্বীপ থেকে ইরানি যোদ্ধাদের হটিয়ে দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা টানা ৭২ ঘণ্টা ধরে দুই দ্বীপে অবস্থানরত ইরানি যোদ্ধাদের ওপর প্রায় ১০ লাখ কামানের গোলা ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করে।

এ অবস্থায় দুই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি সর্বশক্তি নিয়োগ করে। এই বাহিনীর কয়েকজন কমান্ডারের শাহাদাত রণাঙ্গনে ইরানি যোদ্ধাদের মধ্যে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে জয়লাভের আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দেয়। আইআরজিসি’র ২৭ ডিভিশনের কমান্ডার ইব্রাহিম হেম্মাত ও উপ কমান্ডার আকবার জাযাজি মটোরসাইকেলে করে যুদ্ধ তদারকি করার সময় ইরাকি বাহিনীর নিক্ষিপ্ত গোলার আঘাতে একসঙ্গে শহীদ হয়ে যান। এছাড়া, দক্ষিণ মাজনুন দ্বীপে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে ইরাকি সেনাদের ছোঁড়া গোলার আঘাতে শহীদ হন ৩১ আশুরা ব্রিগেডের কমান্ডার হামিদ বাকেরি। এই মহান শহীদ মৃত্যুর আগে নিজের ওসিয়তনামায় লিখেছেন: “আমরা ইমাম খোমেনীর নির্দেশে হোসেইনি চেতনা নিয়ে যুদ্ধে এসেছি এবং এই চেতনা নিয়েই শহীদ হয়ে যাব।”#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ০৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ