এপ্রিল ০৭, ২০২১ ১৫:৪০ Asia/Dhaka

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন ইরান প্রাচীন সভ্যতার একটি দেশ। সুতরাং এ দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি যে বেশ সমৃদ্ধ তা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না।

শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে বিশ্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাহিত্য সংস্কৃতির নেপথ্য প্রেরণা ছিল ইরানের সাহিত্য। অসংখ্য গল্প কিংবা প্রবাদ প্রবচন যেসব আমরা প্রায়ই মুখে মুখে উচ্চারণ করি সেগুলো যে ইরানের অনেকেরই হয়তো তা জানা নেই।

সেইসব গল্প রূপকথার মতো মনে হলেও এগুলো আমাদের জীবনের নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে আছে। মুখে মুখে উচ্চারিত বহু প্রবাদ প্রবচনের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। এসব গল্পে রয়েছে আমাদের জীবন ঘনিষ্ঠ বহু শিক্ষা ও উপদেশ। আমরা সেইসব গল্প এবং প্রবাদের পেছনের গল্প নিয়ে এ আসরে আপনাদের সঙ্গে থাকবো। গত আসরে আমরা একটি প্রবাদের গল্প শুনেছি। গল্পটি ছিল অসতর্ক মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে কাউকে ফাঁদে ফেলা নিয়ে। একটি মোরগ এবং একটি শেয়ালকে নিয়ে গড়ে ওঠা ওই গল্পটি আশা করি ভালো লেগে থাকবে আপনাদের। বিশেষ এসব গল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের জীবনে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে হবে। তবেই সার্থক হবে আমাদের প্রয়াস। আজকের আসরে শুনবো কালজয়ী আরেকটি গল্প। এ গল্প থেকেও জীবন সচেতনতার চমৎকার দিক-নির্দেশনা পাওয়া যাবে বলে আশা করি। সর্বোপরি আমাদের বিশ্বাস এ আসরটি আপনাদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি চিন্তার জগতেও নাড়া দেবে।

একটি পুকুরে সুন্দর এবং বড়োসড়ো তিনটি মাছ বাস করতো। একদিন ক'জন মাছ শিকারী ঐ পুকুরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। তাদের নজর পড়লো সুন্দর ঐ মাছগুলোর ওপর। কিন্তু শিকার করার মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তাদের কাছে সেই মুহূর্তে ছিলো না। তাই তারা শিকারের সরঞ্জাম নিয়ে পরে আসবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো। মাছগুলো কিন্তু শিকারীদের সব কথাবার্তা শুনে ফেলেছিলো। তারা তাই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। সেটাই স্বাভাবিক। তারা ভাবলো গড়িমসি করলে শিকারীদের ফাঁদে পড়ে গিয়ে মারা যেতে হবে। অতএব জীবন রক্ষার স্বার্থে একটা বুদ্ধি খুঁজে বের করতেই হবে।

তিনটি মাছের মধ্যে একটি মাছ ছিল বেশ বুদ্ধিমান এবং দূরদর্শী চিন্তার অধিকারী। একটি ছিল মোটামুটি বুদ্ধিমান আর তৃতীয়টি ছিল মূর্খ, বোকা, সময়ক্ষেপনকারী মানে কখন কোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে সে ব্যাপারে কিছুটা অলস প্রকৃতির। নেবো নেবো করে সে খামোখা সময় নষ্ট করতো সে। বুদ্ধিমান মাছটি মনে মনে ভাবলো: সময় থাকতে থাকতেই এই বিপদ থেকে কোনোরকমে প্রাণটা নিয়ে বিশাল সমুদ্রে পালাতে হবে। সে তার এই সিদ্ধান্তটি অপর দুই মাছের কাছে সতর্কতার সঙ্গে গোপন রাখতে চাইলো। কেননা বাকি দুই মাছ যদি তার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে পারে তবে তারা এই দীর্ঘ যাত্রায় বিচিত্র সমস্যার অজুহাত তুলে তাকে তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে পারে। এ কারণেই সে অন্যদেরকে কিছু না বলেই একা একা পাড়ি জমালো এবং বিপদ-সঙ্কুল সূক্ষ্ম পথ ধরে যেতে যেতে মুক্ত সমুদ্রে গিয়ে পৌঁছে গেল। নিজের বিপদের আঁধারকে আলোকের সমুদ্রে নিয়ে গেল সে।

বুদ্ধিমান মাছটি চলে যাবার পর এরইমাঝে মাছ শিকারীরা তাদের মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হয়ে গেল পুকুরের কাছে। দ্বিতীয় যে মাছটি অর্ধ বুদ্ধিমান বা মোটামুটি বুদ্ধিমান ছিল, সে যখন শিকারীদের দেখতে পেলো, বুঝে ফেললো যে সে অলসতা করেছে এবং শিকারীদের ফাঁদে পড়ে মারা যাওয়ার পথে রয়েছে। তাই নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিলো এইজন্যে যে কেন বুদ্ধিমান মাছটির মতো সেও পাড়ি জমালো না। ভাবতে ভাবতে দেখলো এখনো যেটুকু সুযোগ রয়েছে তা-ও ভেবে ভেবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অতএব এখন রাগের সময় নয় বরং মুক্তির একটা উপায় খুঁজে বের করতে হবে। যা হাতছাড়া হয়ে গেছে,তা তো গেছেই, পুনরায় তা ফিরে আসবে না।

এইবলে সে ভাবলো, মরার ভান করে নিঃসাড়ভাবে চিৎ হয়ে ভেসে থাকবে এবং শ্রোতের মাঝে নিজেকে ভাসিয়ে দেবে যাতে শিকারীরা ভাবে সে মরে গেছে, ফলে তাকে আর শিকার করবে না। যেমন ভাবা তেমন কাজ। শিকারীরা মাছটিকে মৃত মনে করে পানি থেকে তুলে নিয়ে পুকুর পাড়ে ফেলে রাখলো। শিকারীরা দূরে সরে যাবার পর মাছটি পুনরায় পুকুরে নেমে প্রাণ বাঁচালো। তবে তৃতীয় মাছটি যে কিনা বোকা, অলস এবং সময় ক্ষেপনকারী ছিল, সে তার সামনে বিপদ দেখতে পেয়ে অস্থির হয়ে গেল। ভয়ে সে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে প্রাণে বাঁচতে চাইলো। কিন্তু কাজ হলো না, শিকারীর ফাঁদে তাকে পড়তেই হলো। ফাঁদে পড়ে সে মুক্তির আশায় জালের এ ফোঁড় ও ফোঁড়ে দৌড়ালো।

কিন্তু যতোই সে দৌড়ালো ততোই আহত হলো, ততোই ক্লান্ত হলো, ততোই ফাঁদে বেশি করে আটকা পড়লো। শিকারীরা তাকে ধরে নিয়ে কাবাব বানিয়ে খেলো। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মাছটি মনে মনে বললো এইবার যদি এই ফাঁদ থেকে কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে যাই তাহলে আর ভুল করবো না, সোজা সমুদ্রে গিয়ে নিরাপদ জীবন যাপন করবো। নিজে যদি নাও পারি তাহলে বুদ্ধিমানদের হাত ধরে এবং তাদের নির্দেশনায় বিপদ থেকে মুক্তির উপায় খুঁজবো। কিন্তু সেই সুযোগ তার আর হলো কই!

এই গল্পে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হলো: পুকুরের মতো ছোট্ট এবং বিপদ সঙ্কুল এই পৃথিবীতে অলসতা করা যাবে না। সচেতন হতে হবে। আল্লাহকে ভয় করতে হবে। কর্মতৎপর হতে হবে। চোখ বুজে ঘুমালে চলবে না। দ্রুত পায়ে দৌড়তে হবে সমুদ্রের দিকে, প্রেমের কুল-কিনারাহীন সমুদ্রের দিকে, ভালোবাসা ও মানবতার দিকে, মুক্তির দিকে। এই পথে যা কিছু চলে গেছে বা হারিয়ে গেছে তার জন্য ভাবলে চলবে না, কেননা যা কিছু চলে গেছে তা আর ফিরে আসবে না।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ