এপ্রিল ১৮, ২০২১ ১৯:২৬ Asia/Dhaka

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন ইরান প্রাচীন সভ্যতার একটি দেশ। সুতরাং এ দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি যে বেশ সমৃদ্ধ তা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না।

শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে বিশ্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাহিত্য সংস্কৃতির নেপথ্য প্রেরণা ছিল ইরানের সাহিত্য। অসংখ্য গল্প কিংবা প্রবাদ প্রবচন যেসব আমরা প্রায়ই মুখে মুখে উচ্চারণ করি সেগুলো যে ইরানের অনেকেরই হয়তো তা জানা নেই।

সেইসব গল্প রূপকথার মতো মনে হলেও এগুলো আমাদের জীবনের নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে আছে। মুখে মুখে উচ্চারিত বহু প্রবাদ প্রবচনের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। এসব গল্পে রয়েছে আমাদের জীবন ঘনিষ্ঠ বহু শিক্ষা ও উপদেশ। আমরা সেইসব গল্প এবং প্রবাদের পেছনের গল্প নিয়ে এ আসরে আপনাদের সঙ্গে থাকবো। আশা করি এ আসরটি আপনাদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি চিন্তার জগতেও নাড়া দেবে। যাই হোক আজ আমরা শুনবো মাসনাবির চিরায়ত একটি গল্প ইঁদুর ও উটের গল্প। ছোট্ট ইঁদুর নিজেকে খুব শক্তিশালী এবঙ চালাক ভেবে খুব গর্ব করতো। তার ওই অহংকারের পরিণতি কী হয়েছিল সেই গল্পটিই আমরা আজকের আসরে শুনবো।

বিশাল একটি খোলা প্রান্তর পার হচ্ছিলো তরুণ এক ইঁদুর। গল্পের এই ইঁদুরটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুব ভালো ছিল-তা বলা যাবে না। সে মনে মনে সবসময় ভাবতো: পৃথিবীর সবচেয়ে চালাক চতুর এবং শক্তিশালী ইঁদুর হলো সে। মনের চোখ ছিল তার অন্ধ। সে কারণেই সে ছিল সাংঘাতিক অহংকারী আর আত্মপূজারী। সে শিস দিয়ে গান গাইতে গাইতে হঠাৎ দেখতে পেলো তার চলার পথের পাশে একটা উট সবুজ চারণভূমিতে ঘাস খাচ্ছে। ইঁদুর মনে মনে ভাবলো: এই উটটিকে চুরি করলে কেমন হয়। ভাবতেই সে মনে মনে খুশি হয়ে গেল এবং সামনে এগিয়ে গিয়ে উটের গলার রশি ধরে টানতে লাগলো। উটও কোনোরকম ঘাড় না বেঁকে তার সঙ্গে চললো। পেট ভরে সে সবুজ ঘাস খেয়েছে। সুতরাং আনন্দিত ছিল, প্রফুল্ল ছিল তার মন।

সে একটিবারও জানার চেষ্টা করে নি পিচ্চি একটা ইঁদুরের মাথায় তাকে নিয়ে কী ধান্ধা। মজাই পাচ্ছিলো সে। তাই নীরবে যাচ্ছিলো ইঁদুর যে দিকে তাকে নিয়ে যাচ্ছে সেদিকে। কী দারুন ব্যাপার! ইঁদুর যাচ্ছে উটের রশি নিয়ে, উটও যাচ্ছে ইঁদুরের পথ ধরে। ইঁদুর কিন্তু বুঝতে পারে নি যে উট মজা করেই তার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। সে বরং ভাবছিলো বিরাট এক উটকে সে নাকে দড়ি দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিজের ইচ্ছেমতো যেদিকে খুশি সেদিকে। একটা অহমিকার ভাব এসে গেল তার মনে। মনে মনে বললো: কে কোথায় কবে দেখেছে আমার মতো ক্ষুদ্র একটা ইঁদুর বিশাল আকৃতির একটা উটকে নিজের খুশি মতো টেনে নিয়ে যেতে? কতো শক্তিশালী আমি। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শক্তিশালী, বুদ্ধিমান এবং চালাক চতুর ইঁদুর হলাম আমি।

উট এবং ইঁদুর যেতে যেতে গিয়ে পৌঁছলো একটা ঝরনা প্রবাহের তীরে। মারাত্মক স্রোত ছিল ওই স্রোতস্বিনীতে। ইঁদুর সেই স্রোতোধারা দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ভাবনায় পড়ে গেল সে। ভাবলো: এখন কী করে এই তীব্র স্রোতোময় ঝরনাধারা পার হবো! নদীর মতো এতো বড়ো প্রবাহ কী করে পার হয়ে যাবো ওপারে! উট ইঁদুরের থমকে যাওয়া দেখে মনে মনে হাসলো এবং ইঁদুরকে বললো: খুব পেরেশান মনে হচ্ছে তোমাকে, কিন্তু কেন? বীরের মতো সামনে চলো, কোনোকিছুর পরোয়া করো না! তুমি হলে আমার নেতা, পথ প্রদর্শনকারী! ইঁদুর উটের কথায় লজ্জা পেলো। ভাবতে পারছিলো না কী জবাব দেবে।

অগত্যা মাথা তুলে বললো: জলের গভীরতা অনেক বেশি এবং তীব্র স্রোতোময়। তাই ভাবছি ডুবে না মরি আবার! উট হাসলো। বললো: সামান্য এই ঝরনাধারা পার হতে এতো ভয় পাচ্ছো! তুমি তো সবার চেয়ে শক্তিশালী। সেই শক্তি বলে একটা বিশাল উটকে টেনে নিয়ে যাচ্ছো তোমার ইচ্ছেমতো! আর এখন ছোট্ট একটা খাল পার হতে ভয় পাচ্ছো? ঠিক আছে, আগে আমি যাই! দেখি জলের গভীরতা কতটুকু-বেশি না কম! এই বলে উট নেমে গেল পানিতে। ঝরনাধারার ওই পানিতে যখন উট নেমে দাঁড়ালো তার হাঁটুও ডুবলো না। ইঁদুরের দিকে ফিরে তাকিয়ে বললো: দেখেছো প্রিয় ইঁদুর আমার! পানি কত কম? ভয়ের কিছু নেই। আমার হাঁটুর নীচে পানি। সুতরাং ভয় পেও না! নেমে আসো! খাল পাড়ি দিয়ে ওপারে যাবে, এসো! কীসের ভয়! ভয় পেও না।

হাঁটুজল ঝরনা প্রবাহে নেমে উট ইঁদুরকে বলছিলো: সামান্য পানি। ভয়ের কিছু নেই। এসো! পাড়ি দিয়ে ওপারে যাবে। ইঁদুর এবার উটের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। বললো: তুমি কী বলছো বুঝতে পারছো? তোমার হাঁটু ছুঁয়েছে জল। প্রিয় উট আমার! তুমি কি এর অর্থ বুঝতে পারছো? উট অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো: না তো! এর মানে কী? ইঁদুর এবার সলজ্জ ভঙ্গিতে বললো: তোমার হাঁটু আর আমার হাঁটুর মাঝে তো অনেক ফারাক। ছোট্ট ইঁদুরের কথা শুনে উট হাসলো। ইঁদুরের দেখলো যে সে সত্যিই এই খাল পার হতে পারবে না। স্রোতোময় এই খালে নামার মানেই হলো ডুবে মরা। সুতরাং উটকে সে অনুনয় বিনয় করে বললো তাকে যেন দয়া করে খালটা পার করে দেয়। ইঁদুরের সবিনয় মিনতি শুনে উটের মনে দয়া হলো। তাই ইঁদুরকে তার পিঠের কুঁজে উঠে চড়তে বললো।

উট শেষ পর্যন্ত ইঁদুরকে তীব্র স্রোতোময় খাল পার করিয়ে দিলো। ওপারে নিয়ে যাবার পর উট এবার ইঁদুরকে উপদেশ দিতে শুরু করলো। তাকে বললো: অনর্থক অহংকারী হয়ো না! এমন কোনো কাজে হাত দেবে না যা তোমার পক্ষে করা সম্ভব না! উটের ইপদেশ শুনে ইঁদুর মাথা নীচু করে ফেললো।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ