এপ্রিল ২২, ২০২১ ১৯:১৯ Asia/Dhaka

আজকের আসরে আমরা শুনবো প্রাচীন একটি প্রবাদের গল্প। প্রবাদটি হলো 'মর তবু দম দে'।

আগেকার দিনে যারা লোকা লক্কড়ের কাজ করতো মানে লোহা দিয়ে বিভিন্ন হাতিয়ার বানাতো তাদেরকে বলা হতো কামার। কামারেরা লোহাকে গরম করে পিটিয়ে সুন্দর সুন্দর জিনিস বানাতো। কামারের কাজটাকে তাই শিল্পকর্মের মতো মনে করতো অনেকেই।

বিশেষ করে গ্রামের মুরব্বিরা তাদের ছেলে সন্তানদেরকে এই কামারের কাছে দিয়ে দিতো যাতে তারা শিল্পের সাথে পরিচিত হতে পারে। সেইসাথে অলস কিংবা বেকার ঘুরাফেরা করার সুযোগ না পায়। ছেলেদের অভিভাবকেরা আরও একটা কাজ করতো। তারা তাদের ছেলে সন্তানদের বাজারে পাঠাতো। এতে করে ছেলেরা কাজও শিখতো সেইসঙ্গে রোজগারেরও ব্যবস্থা হতো। সংসার চলে যেতো দিব্যি, সঞ্চয়েরও ব্যবস্থা হতো। কিন্তু পরিবারে অলস ছেলেও যে ছিল না, তা কিন্তু নয়। এই অলস ছেলেরা সমস্যায় ফেলে দিতো অভিভাবকদের। এরকমই এক অলস ছেলেকে নিয়ে রয়েছে আজকের প্রবাদের গল্প।

সেই সুদূর অতীতে এক কিশোর ছেলে ছিল ভয়াবহ রকমের অলস। কোনো কাজই সে করতে চাইতো না। খালি খাওয়া আর ঘুরে বেড়ানোই ছিল তার কাজ। কাজের কথা শুনলেই সে মনমরা হয়ে যেত। ছেলের এই ভাবসাব দেখে বাবা চিন্তা করলো তাকে কামারের কাছে দেবে কাজ শেখার জন্য। কামারের কাজকর্ম শৈল্পিক হলেও বেশ কঠিন এবং পরিশ্রমের কাজ। ওই কাজে ছেলেকে দিলে ছেলের অলসতা বাপ বাপ করে পালাবে। বাবা একদিন ছেলের হাত ধরে নিয়েই গেল কামারের কাছে। কামার তার দোকানেই ছিল। সালাম এবং কুশল বিনিময়ের পর অলসের বাবা বললো:ওস্তাদ! ছেলেটা আমার যথেষ্ট চালাক চতুর! ভাবছি এই গ্রীষ্মের ছুটির অবসর দিনগুলোতে যেহেতু পড়ালেখা নেই আপনার কাছে রেখে যাবো। আপনি ওকে ঠিক আপনার মতোই একজন দক্ষ শিল্পী বানিয়ে ছাড়বেন।

ওস্তাদ কামার ভদ্রলোক অলস ছেলেটার দিকে একবার অভিজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো: ‘এগুলো হচ্ছে আমার কাজের হাতিয়ার’। কোন্ হাতিয়ার কী কাজে লাগে ছেলেকে ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝালো। এরপর ছেলেকে হাপর দেখিয়ে বাবাকে বললো: ‘আপনি চিন্তা করবেন না। আমার চেয়েও ভালো কামার বানিয়ে ছাড়বো ওকে! তবে শর্ত হলো কাজে মন বসাতে হবে’। বাবা বললো: ‘ওস্তাদ! এই ছেলের অভিভাবক এখন থেকে আপনি। আপনি ভাববেন ও এখন আপনারই ছেলে। যেরকম প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন মনে করবেন দেবেন। আমি শুধু চাই ও এক সুদক্ষ কামার হোক’। এই বলে বাবা তার অলস পুত্রকে ওস্তাদ কামারের কাছে সঁপে দিয়ে চলে গেল। বাবা চলে যাবার পর তার অলস ছেলে বুঝতে পারলো এটা অলসতা করার জায়গা নয়। তারপরও সে অলস মুহূর্ত কাটাবার ফাঁকফোকর খুঁজতে লাগলো।

কী করে কাজ কম করা যায়, কীভাবে কম পরিশ্রম করে কম ক্লান্ত হওয়া যায় সেইসব উপায় খুঁজতে লাগলো ছেলে। ওস্তাদ কামার তাঁর প্রশিক্ষণের কাজ শুরু করে দিলো। অলস ছেলেকে কাজের সকল যন্ত্রপাতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো।তারপর বললো কোন্ যন্ত্র দিয়ে কী কাজ করা হয় এবং কীভাবে করা হয়। সবশেষে হাপর দেখিয়ে বললো: দেখো বাবা! আমরা যা কিছুই বানাতে চাই, প্রথমে লোহাকে এই গনগনে আগুনের ভেতর জ্বালাই। লোহা গরম হয়ে লাল রঙের হয়ে গেলে নরম হয়ে যায়। ওই নরম অবস্থায় তাকে পিটিয়ে পিটিয়ে যে ডিজাইন করতে চাই করি। এ কাজের জন্য হাপরের আগুন টকটকে লাল এবং প্রাণবন্ত হতে হবে। হাপরের ভেতরের আগুন যদি জ্বলজ্বলে না হয় যদি মিটমিটে লাল হয় তাহলে কোনো কাজই করা যাবে না, লোহাও নরম হবে না। এখন যাও বিসমিল্লা পড়ে হাপরের কাছে গিয়ে বসো। হাপর হলো এক ধরনের বায়ু উৎপাদন এবং প্রবাহের যন্ত্র।

আজকাল যেমন বৈদ্যুতিক  ফ্যানের সাহায্যে বাতাস উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে, সেকালে এরকম ছিল না। চামড়ার কয়েক স্তর বিশিষ্ট মুখ খোলা বেলুনের মতো একটা যন্ত্র ছিল। বেলুনের ওপরের স্তরে রশি লাগিয়ে উপরে কোথাও এমনভাবে ঘুরিয়ে নীচে আনা হতো যাতে ওই রশি ধরে টান দিলেই হাপরের ভেতরের বাতাস খোলা মুখ দিয়ে বেরিয়ে চুল্লির ভেতর যেতো আর কয়লার আগুন গনগন করে জ্বলে উঠতো। ওস্তাদ তাকে ওই হাপরের রশি ধরে টেনে টেনে আগুন জ্বালাতে বললো। সবশেষে বললো: ‘আমরা কামারেরা এই কাজটাকে বলি ‘দম দেওয়া বা ফু দেওয়া’। তুমি এখন হাপরে দম দিতে থাকো’। অলস ছেলে নিজেকে খুব কাজের লোক হিসেবে প্রমাণ দিতে বললো: ‘ঠিক আছে ওস্তাদ’। এই বলে হাপরের পাশে গিয়ে বসলো এবং ওস্তাদের কথামতো রশি টেনে টেনে হাপরে বাতাস দিতে লাগলো।

ওস্তাদের কথামতো রশি টেনে টেনে হাপরে বাতাস দিতে লাগলো অলস ছেলে। রশি ধরে টান দিলেই চামড়ার বেলুনের ভেতর থেকে বাতাস হাপরের ভেতর যেত এবং কয়লার আগুন গনগন করে উঠতো। এভাবে ঘণ্টাখানেক কেটে গেল। অলস ছেলে হঠাৎ কাজের চাপে ক্লান্ত হয়ে গেল। তাই ওস্তাদের দিকে তাকিয়ে বললো: ‘ওস্তাদ ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমার ডান পা’টা একটু লম্বা করে দম দিতে পারবো’? ওস্তাদ তার কপালের ঘাম মুছে নিয়ে বললো: ‘এতো দ্রুত ক্লান্ত হয়ে গেছো? অসুবিধা নেই ডান পা’টা লম্বা করে ছড়িয়ে দাও’! এর কিছুক্ষণ পরই অলস ছেলে বলে উঠলো: ‘ওস্তাদ বাঁ পা’টা একটু লম্বা করে ছেড়ে দেবো’? ওস্তাদ অনুমতি দিলো বাঁ পা’টাও ছড়িয়ে দিতে। কিন্তু ছেলে তাতেও ক্ষান্ত হলো না। সে বিরক্ত হয়ে উঠতে লাগলো। কাজটা যেন তার জন্য ভয়াবহ কষ্টের মনে হলো। বলেই বসলো: ‘ওস্তাদ, একটু শুয়ে শুয়ে কাজ করতে পারবো? অসুবিধা নেই হাপরে দম দেওয়ার কাজ হবে’। ওস্তাদ এবার এক ঝলকে মাথা ঘুরিয়ে ছেলেটার দিকে তাকালো।

বললো: এরকম কথা তো আর কখনো শুনি নি। শুয়ে শুয়ে বিশ্রামও নেবে কাজও করবে। ঠিক আছে যদি তাতে তোমার সুবিধা হয় সমস্যা নেই, করো’। অলস ছেলে শুয়ে শুয়েই তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলো। কিছুক্ষণ পর সে মনে মনে বললো: ‘আমি তো সাংঘাতিক বোকা! হাপরের পাশে ঘুমিয়ে নিচ্ছি না কেন! ঘুমালেই তো পারি’। ছেলে অবসাদে হাই তুলতে তুলতে ওস্তাদকে বললো: ‘ওস্তাদ, আবহাওয়া বেশ গরম আজ। মানুষ অল্প কাজেই কেমন ক্লান্ত হয়ে যায়। যদি তুমি আমাকে অনুমতি দাও তাহলে হাপরের পাশেই ঘুমোতে ঘুমোতেই দম দেবো’! ওস্তাদ এবার অলস ছেলের কাণ্ড দেখে রেগে গেল। তার হাতের বিশাল হাতুড়িটা একপাশে রেখে বললো: ‘তুই মর, তবু দম দে’।

এই ঘটনার পর থেকে যখনই কেউ কাজে মনযোগ না দিয়ে ফাঁকি দেওয়ার অজুহাত খুঁজে বেড়ায় তখনই বলা হয়: ‘দম দে, মর তবু দম দে’।*#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ