এপ্রিল ২৬, ২০২১ ২০:২৩ Asia/Dhaka

ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জলাভূমিতে চালানো খায়বার অভিযানে পূর্বনির্ধারিত সবগুলো লক্ষ্য অর্জিত না হলেও এখান থেকে পরবর্তী অভিযানগুলোর জন্য মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়।

এই অভিযানের পর ইরাকের সহযোগী দেশগুলো বাগদাদের প্রতি সমরাস্ত্র সরবরাহ আরো বাড়িয়ে দেয়। সৌদি আরব কার্যত ইরানের ওপর ইরাকের আগ্রাসন শুরুর দিন থেকেই বাগদাদের পাশে দাঁড়ায়। ইরানের পতিত শাহ সরকারের অনুগত যেসব জেনারেল ইসলামি বিপ্লবের সময় সৌদি আরবে পালিয়ে গিয়েছিল তাদের কাছ থেকে পাওয়া ইরানের সামরিক গোয়েন্দা তথ্য রিয়াদ বাগদাদের হাতে তুলে দেয়।

যুদ্ধের আট বছরে ইরাকের সঙ্গে সৌদি আরবের গোয়েন্দা সহযোগিতা অব্যাহত থাকে। এ সময় বাগদাদের প্রতি রিয়াদের অন্যতম বড় সহযোগিতা ছিল সৌদি ভূখণ্ডের ভেতর পাইপ লাইন স্থাপন করে ইরাকের তেল রপ্তানি করতে দেয়া। ইরাকের বসরা থেকে লোহিত সাগর তীরবর্তী সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত ওই পাইপ লাইন স্থাপন করা হয়। এর ফলে যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে লোহিত সাগর দিয়ে অতি সহজে তেল রপ্তানি করে ইরাকের সাদ্দাম সরকার ব্যাপকভাবে লাভবান হয়।

খায়বার অভিযানের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। আমেরিকা ইরাকের সাদ্দাম সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে; যদিও তার আগেও আমেরিকার সঙ্গে সাদ্দামের গোপন সম্পর্ক ছিল এবং ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই সে ইরানে আগ্রাসন চালিয়েছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ইরাক-ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পর বলেন: “১৯৭০-এর দশকে ইরানের মাধ্যমে ইরাকের উগ্র সরকারকে প্রতিহত করা ছিল আমেরিকার নীতি। কিন্তু ১৯৮০’র দশকে ইরাকের মাধ্যমে ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে প্রতিহত করার নীতি গ্রহণ করে আমেরিকা। ইরাক-ইরান যুদ্ধ ঠিক এ কারণে শুরু হয়।”

১৯৭২ সাল থেকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাগদাদে আমেরিকার একটি ছোট কূটনৈতিক মিশন ছিল যার কর্মী সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩ জন। ১৯৮৪ সালে অর্থাৎ বাগদাদ-ওয়াশিংটন কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ১৭ বছর পর মার্কিন সরকার ইরাকে আবার দূতাবাস স্থাপন করে। কিন্তু তার আগে থেকেই অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ী হওয়ার পর থেকেই বাগদাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় ছিল। ইরানের ওপর ইরাকের আগ্রাসন শুরু হওয়ার দুই মাস আগে ইরাকি শাসক সাদ্দামের সঙ্গে তৎকালীন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেবিগনিউ ব্রেজিনিস্কির সাক্ষাৎ এই ঘটনার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন মাস পর ইরাকের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তারিক আজিজ ফ্রান্স সফরে গিয়ে সাদ্দামের সঙ্গে ব্রেজিনিস্কির সাক্ষাতের খবর প্রথম গণমাধ্যমে প্রকাশ করে বলেন, জর্দান-ইরাক সীমান্তে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সম্পর্কে ফরাসি পত্রিকা ফিগারো লিখেছে: ১৯৮০ সালের জুন মাসে ইরাক-ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ব্রেজিনিস্কি জর্দান সফর করেন। তিনি জর্দান-ইরাক সীমান্তে ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেন। তিনি সাদ্দামকে বলেন, আরভান্দ নদীর ওপর ইরাকের সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করে ওয়াশিংটন এবং বাগদাদ যদি ইরান দখল করে নেয় তাহলে আমেরিকার কোনো আপত্তি থাকবে না।

ইরানের ওপর ইরাকের আগ্রাসন শুরুর ঘটনায় আমেরিকার উসকানি দেয়ার বিষয়টি আরেকটি ঘটনায় প্রমাণিত হয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা সম্পর্কে তৈরি করা গোয়েন্দা প্রতিবেদন সৌদি আরবের মাধ্যমে বাগদাদের হাতে তুলে দেয়। ১৯৮৭ সালে সৌদি আরবে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত আমেরিকার ভিল্লানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘ইসলামি সমাজ’ শীর্ষক এক সম্মেলনে এই তথ্য তুলে ধরেন। বিখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট প্যারি তার ওয়েবসাইটে ‘সাদ্দামকে সবুজ সংকেত’ শীর্ষক এক নিবন্ধে এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার সে সময়কার সৌদি রাজা ফাহাদকে জানিয়েছিলেন, ইরাকের শাসক সাদ্দাম ইরানে হামলা চালালে তাতে ওয়াশিংটনের আপত্তি থাকবে না ।

এ সম্পর্কে হাওয়ার্ড থ্যাচার নামক তৎকালীন এক মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যও প্রনিধানযোগ্য। ওই কর্মকর্তা এক সময় আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং সে সময় তিনি ইরাক-ইরান যুদ্ধ সম্পর্কে অনেক গোপন তথ্য জানতে পারেন। তিনি এ সম্পর্কে বলেন: “আমেরিকার পক্ষ থেকে ইরাকের জন্য অর্থ সাহায্য, লজিস্টিক সাপোর্ট ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়। ইরানের সামরিক শক্তি সম্পর্কে সিআইএ’র গোপন প্রতিবেদন সাদ্দামের হাতে তুলে দেয়া হয়। আমি বিশ্বাস করি, এই গোয়েন্দা প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই সাদ্দাম ইরানে আগ্রাসন চালাতে উৎসাহী হয়ে ওঠেন।”

ইরানে হামলা চালাতে ইরাককে আমেরিকার উসকে দেয়ার দলিল এখানেই শেষ নয়। ইরাকের বাথ সরকারের একজন জেনারেলের স্মৃতিকথা থেকে এ সম্পর্কে আরো বেশি তথ্য জানা যায়। সাদ্দাম সরকারের শাসনামলে ইরাকের সেনা গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালনকারী ওয়াফিক আস-সামারাই নামের ওই জেনারেল তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন: “আমেরিকা আমাদেরকে যত বেশি সহায়তা করেছে ততটা সহায়তা অন্য কোনো দেশকে করেছে বলে আমার মনে হয় না। এমনকি ইসরাইলও আমাদের সমান সহায়তা পায়নি।”

খায়বার অভিযানের পর আমেরিকা সাদ্দামের প্রতি প্রকাশ্যে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইরাকের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালের মার্চ মাসে ডোনাল্ড রামসফেল্ড মার্কিন সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে বাগদাদ সফর করেন। এই সফর ছিল ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়কার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আমেরিকা সে সময় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছিল যে, ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার যে ঘটনা ঘটেছে তা অচিরেই জোড়া লাগার সম্ভাবনা নেই। কাজেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাককে যথাসম্ভব সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে।

ইরাকের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তারিক আজিজ ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে এ সম্পর্কে বলেন: ইরাক ও আমেরিকার চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আসার ফসল হিসেবে দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং দু’দেশ পরস্পরের আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমেরিকা যদি তার এ বন্ধু রাষ্ট্রটির প্রতি সুনজর দেয় তাহলে ইরানের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার শক্তি কমে যাবে। এ সম্পর্কে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ শুল্টজ বলেন: “আমরা এ যুদ্ধের ব্যাপারে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখছি। তবে আমাদের নিরপেক্ষতার অর্থ এই নয় যে, কবে যুদ্ধ শেষ হবে তা বসে বসে দেখতে থাকব।”#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ২৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ