এপ্রিল ২৪, ২০২১ ২১:১৯ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা গাফির বা মু'মিনের ৩৪ নম্বর থেকে ৩৭ নম্বর পর্যন্ত আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৩৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلَقَدْ جَاءَكُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالْبَيِّنَاتِ فَمَا زِلْتُمْ فِي شَكٍّ مِمَّا جَاءَكُمْ بِهِ حَتَّى إِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَنْ يَبْعَثَ اللَّهُ مِنْ بَعْدِهِ رَسُولًا كَذَلِكَ يُضِلُّ اللَّهُ مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ مُرْتَابٌ (34)

“অবশ্য এর পূর্বে তোমাদের কাছে ইউসুফ এসেছিলেন স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ; কিন্তু তিনি তোমাদের কাছে যা নিয়ে এসেছিলেন তাতে তোমরা সর্বদা সন্দেহ পোষণ করতে। পরিশেষে যখন (ইউসুফের) মৃত্যু হল তখন তোমরা বলেছিলে, তাঁর পরে আল্লাহ্‌ আর কখনোই কোন রাসূল প্রেরণ করবেন না। এভাবেই আল্লাহ প্রতিটি সংশয়বাদী অমিতব্যয়ী (ও উগ্রপন্থিকে) বিভ্রান্ত করেন।” (৪০:৩৪)

গত আসরে আমরা ফেরাউনের হাত থেকে হযরত মূসা (আ.)কে রক্ষা করার জন্য ফেরাউনের একজন ঈমানদার পারিষদের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা করেছি। তারপর আজকের এ আয়াতে বলা হচ্ছে: ওই ঈমানদার ব্যক্তি তার বক্তব্যে সে  সময়েরও আগে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া হযরত ইউসুফের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি বলেন, ইউসুফ আল্লাহর একজন নবী ছিলেন এবং তার মৃত্যু খুব বেশিদিন আগে হয়নি। তিনি নিজের নবুওয়াতের পক্ষে  বহু নিদর্শন হাজির করলেও দুঃখনজকভাবে মানুষ নানা ধরনের অযৌক্তিক অজুহাত তুলে তাঁকে নবী হিসেবে মেনে নেয়নি। এমনকি হযরত ইউসুফ (আ.)র মৃত্যুর পর লোকেরা একথা বলাবলি করে যে, এরপর আল্লাহ আর কোনো নবী পাঠাবেন না। নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা ও পাপাচার চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তারা এ দাবি করেছিল।

এ ধরনের মানুষ সত্যের বাণী শুনতে ও তা মেনে নিতে রাজি নয়। তারা নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন পরিচালিত করে বলে আল্লাহর হেদায়েতের আলো থেকে বঞ্চিত হয়। তারা নবী-রাসূলদের আনীত বাণীতে সংশয় পোষণ করে বলে আল্লাহ তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দেন। মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি আছে বলেই নানা বিষয়ে সে সন্দেহে পড়ে যায়। কিন্তু সব বিষয়ে সন্দেহ করার বাতিক তৈরি হলে তা মানুষের জন্য ক্ষতিকারক হয়। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলসহ ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলিতে সংশয়ের মধ্যে থাকলে হেদায়েতের আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এই আয়াতে এমনটিই বলা হয়েছে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- অতীতের জাতিগুলোর আচরণবিধি জানা থাকলে ভবিষ্যত প্রজন্মগুলোর আচরণ সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। ফেরাউনের দরবারের মুমিন ব্যক্তি এজন্যই বলেছিলেন, তোমরা শুধু যে আজ হযরত মূসার প্রতি ঈমান আনোনি তা নয়, বরং অতীতে তোমরা হযরত ইউসুফকেও প্রত্যাখ্যান করেছিলে।

২- যদি গবেষণা করার জন্য কেউ কোনো বিষয়ে সন্দেহে পড়ে যায় তাহলে সেটা ভালো। কিন্তু আমাদেরকে যেন সব বিষয়ে সন্দেহ বাতিকে পেয়ে না বসে।

৩- যারা নিজেদের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী চলে এবং কোনো যুক্তি ছাড়া আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তাদেরকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করে দেন। তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। 

সূরা গাফিরের ৩৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آَيَاتِ اللَّهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ أَتَاهُمْ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ وَعِنْدَ الَّذِينَ آَمَنُوا كَذَلِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ (35)  

“যারা নিজেদের কাছে কোন দলীল-প্রমাণ না আসা সত্ত্বেও আল্লাহর নিদর্শনাবলী সম্পর্কে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়, (তাদের এ কাজ) আল্লাহ্ ও মুমিনদের জন্য প্রচণ্ড ক্ষোভ উদ্রেককারী। এভাবে আল্লাহ্ প্রত্যেক অহংকারী, স্বৈরাচারী ব্যক্তির হৃদয়ে মোহর মেরে দেন।”(৪০:৩৫)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে অতিরিক্ত সন্দেহবাতিকের কারণে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে: এরা সাধারণত অহেতুক তর্কে লিপ্ত হয়; সত্য উপলব্ধি করার কোনো মানসিকতা তাদের নেই। কাজেই তারা কোনো চিন্তাভাবনা না করেই এবং নিজেদের বক্তব্যের পক্ষে কোনো দলিল উপস্থাপন ছাড়াই সত্য প্রত্যাখ্যান করে। এ ধরনের মানুষ তর্কের সময় নিজেদেরকে যুক্তিবাদী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও প্রকৃত অর্থে তারা অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতার পরিচয় দেন।  এ ধরনের গোঁয়ার প্রকৃতির মানুষের কাছ থেকে আল্লাহ তায়ালা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা কেড়ে নেন এবং তাদেরকে চিরতরে পথভ্রষ্ট করে দেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- যারা সত্যকে খুঁজে পেতে চায় তাদের জন্য বিতর্ক একটি ইতিবাচক ও কার্যকরী মাধ্যম কিন্তু যেসব দাম্ভিক মানুষ সত্য প্রত্যাখ্যানের অজুহাত খোঁজে তাদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হলে কোনো ফল পাওয়া যায় না।

২- ঈমানদার ব্যক্তি যুক্তিহীন তর্কে লিপ্ত হয় না; বরং সে এমনভাবে কথা বলে যাতে অন্য সবাই বুঝতে পারে তার কাছে যুক্তিহীন ও দলিল-প্রমাণহীন কথা টিকবে না। 

সূরা মুমিন বা গাফিরের ৩৬ ও ৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ (36) أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا وَكَذَلِكَ زُيِّنَ لِفِرْعَوْنَ سُوءُ عَمَلِهِ وَصُدَّ عَنِ السَّبِيلِ وَمَا كَيْدُ فِرْعَوْنَ إِلَّا فِي تَبَابٍ (37) 
 

“ফেরাউন (তার উজিরকে) বলল: ‘হে হামান! আমার জন্য এক সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ কর, যাতে আমি কোনো অবলম্বন পেতে পারি।” (৪০:৩৬)

“আসমানে (আরোহনের) অবলম্বন, যেন দেখতে পাই মূসার ইলাহকে; আর নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি। আর এভাবে ফেরাউনের কাছে শোভনীয় করা হয়েছিল তার মন্দ কাজকে এবং তাকে সত্য পথ থেকে নিবৃত্ত রাখা হয়েছিল এবং ফেরাউনের ষড়যন্ত্র কেবল ব্যর্থই হয়েছিল।” (৪০:৩৭)

যাই হোক, ফেরাউনের দরবারের মুমিন সভাষদটি হযরত মূসা (আ.)’র প্রাণ বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দেন এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান।  শেষ পর্যন্ত তার বক্তব্য ফেরাউনের ওপর প্রভাব ফেলে এবং সে হযরত মূসাকে আপাতত হত্যা করা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ফেরাউন নিজের দাম্ভিক অবস্থানে অটল থাকে। সে তার উজিরকে সুউচ্চ টাওয়ার নির্মাণের নির্দেশ দেয় যাতে তাতে আরোহণ করে আসমানে হযরত মূসার আল্লাহকে দেখতে বা তাঁর সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। 

এটা স্পষ্ট যে, সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য ফেরাউন এ নির্দেশ দেয়। কারণ, হযরত মূসা (আ.) তাকে একথা বলেননি যে, তাঁর আল্লাহ আসমানে থাকেন কিংবা তাকে ধরা বা ছোঁয়া যায়।  ফেরাউন চেয়েছিল উঁচু টাওয়ার নির্মাণ করে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখাতে এবং নিজের ক্ষমতা জাহির করতে। ফেরাউনের ধারণা ছিল এ কাজ করলে জনগণ আর হযরত মূসার নবুওয়াতের পেছনে ছুটবে না বরং আগের মতোই ফেরাউনের উপাসনা করবে।  এভাবে  ফেরাউনের দম্ভ ও আত্মাভিমানের কারণে আল্লাহ তায়ালা তার চোখে তার মন্দ কর্মকে সুশোভিত করে দেন। এর ফলে তার পক্ষে সত্য গ্রহণ করা অসম্ভব হয়ে যায়। তার সব পরিকল্পনা বরবাদ হয়ে যায় এবং তার পরিণতি হয় ধ্বংস ও মৃত্যু। 

এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে; 

১- যারা যুক্তি-বুদ্ধির ধার ধারে না তারা বিতর্ক ও হৈ চৈ সৃষ্টিকারী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মানুষকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করে।
২- জনগণকে ধোঁকা দিয়ে কার্যসিদ্ধি করা জালেম শাসকদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য; যা তখনকার যুগে ছিল এবং এখনো আছে। 
৩- অহংকার ও দম্ভ মানুষের সামনে তার মন্দ কর্মকে শোভনীয় করে তুলে ধরে। ফলে তার পক্ষে আর সংশোধন হওয়ার সুযোগ থাকে না। #

পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/২৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

 

ট্যাগ