মে ০২, ২০২১ ১৮:৫৬ Asia/Dhaka

মহান আল্লাহর কোনো কোনো নামের মধ্যে ভিন্নতা দেখা গেলেও সেসব পরস্পরের মোকাবেলায় লিপ্ত নয়।

যেমন, আলিম ও ক্বাদির। কিন্তু আল্লাহর কোনো কোনো নাম পরস্পরের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক। মহান আল্লাহর ক্বাবিদ্ বা ক্বাবিয্‌ নামটি বাসিত্ব নামের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক। ক্বাবিদ দান ও দয়ার পথে বাধা, কিন্তু বাসিত্ব দান ও দয়া-দাক্ষিণ্যে মশগুল। আজ আমরা মহান আল্লাহর এমনই দুই দ্বান্দ্বিক নাম খাফিদ্ বা খাফিয ও রাফিই নিয়ে আলোচনা করব।

মহান আল্লাহর খাফিদ্‌ নামের অর্থ  যিনি নিচে নামান, ভেঙ্গে দেন, অপমান বা হেয় করন এবং এর বিপরীতে রাফিই নামের অর্থ যিনি বিশ্বাসী আর খোদাভীরু মানুষদের ওপরে তোলেন ও করেন সম্মানিত বা প্রশংসিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খাফদ্‌ গুণ অবাধ্য প্রবৃত্তি, শয়তান ও পাপীদের মোকাবেলায় ব্যবহার করা হয়। আর মুমিনদের ক্ষেত্রে সম্মাননা জানাতে রাফ্‌ গুণ ব্যবহার করা হয়। খাফ্‌দ্‌ শব্দের ব্যবহার দেখা যায় সুরা আসরার ২৪ নম্বর আয়াতে। এ আয়াতে বলা হয়েছে:

'তাদের সামনে ভালবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বলঃ হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।–'

মহান আল্লাহ উদ্ধত ও অহংকারীকে ভালবাসেন না। তিনি অহংকারীদের খাফিদ্‌ নামের কারণে অপদস্থ করেন। মহান আল্লাহ মুমিনদের নম্র ও ক্ষমাশীল হতে বলেছেন। মহানবী (সা) পরিপূর্ণ আদর্শ মানব  এবং বিনম্রতায় ও ক্ষমাশীলতায় শ্রেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও মহান আল্লাহ তাঁকেও সুরা শোয়ারার ২১৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন: এবং আপনার অনুসারী মুমিনদের প্রতি সহৃদয় বা সদয় হোন। -এখানে দ্রয়ার্দতা বা সহৃদয়তা বোঝাতে নির্দেশবাচক আখ্‌ফিদ্‌ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।  

মহান আল্লাহ কিয়ামত বা পুনরুত্থান দিবসের বর্ণনা দিতে গিয়ে তাঁর দুই নাম খাফিদ্ ও রাফিই -উভয়ই উল্লেখ করেছেন:   যখন সেই মহা-ঘটনা সংঘটিত হবে। তখন তার সংঘটিত হওয়াকে কেউ-ই মিথ্যা বলতে পারবে না বা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাতে কেউ নিচু বা অপদস্থ হবে ও কেউ সমুন্নত বা সম্মানিত হবে। -

মহান আল্লাহ অবাধ্য, জালিম ও অহংকারী পাপীকে অপদস্থ করেন। যেমন, শয়তান এক সময় খুবই মর্যাদার অধিকারী হয়েছিল আল্লাহর ইবাদতের সুবাদে। কিন্তু অহংকার করা ও অবাধ্যতার কারণে সে মর্যাদা হারায়। মক্কার অনেক কুরাইশ নেতাও সমাজে সম্মানের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু তারা মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার বিষয়ে মহানবীর দাওয়াত কবুল না করায় তারাও শেষ পর্যন্ত অপদস্থ হয়। মহান আল্লাহর রাফিই নামের সুবাদে আকাশগুলো কোনো স্তম্ভের ওপর ভর না করেই সমুন্নত হয়েছে এবং মেঘামালাও আকাশে ভাসমান হয়। একই কারণে পাখিরা উড়তে পারে অসীম আকাশে। মহান আল্লাহ একইভাবে রাফিই নামের কারণে সৎ ও উচ্চ পর্যায়ের মুমিনদের দুনিয়া ও পরকালে সম্মানিত করেন।

আল্লাহ মহাপুরুষদের প্রতি জনগণের মনকেও শ্রদ্ধায় নুইয়ে দেন। সুরা আনআমের ১৬৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেছেন:  তিনিই তোমাদের করেছেন দুনিয়ার প্রতিনিধি এবং যা কিছু তোমাদের দিয়েছেন তাতে তোমাদের পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তোমাদের কাউকে অন্যের ওপর বেশি মর্যাদা দান করেছেন। -

দরিদ্রদের ওপর বড়াইকারীর সম্মান আল্লাহ বাড়ান না। আল্লাহ রাফিই হওয়ার কারণে সৎকাজকে গ্রহণ করেন ও তা ওপরে ওঠান। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা না করে কোনো কাজ করে আল্লাহ তাদের হেয় ও অপদস্থ করেন। আল্লাহ নিজে পবিত্র তাই তিনি পবিত্র কথা ও কাজই গ্রহণ করেন। সুরা ফাতির-এ আল্লাহ বলেছেন, 'কেউ সম্মান চাইলে জেনে রাখুন, সব সম্মান আল্লাহরই জন্যে। তাঁরই দিকে আরোহণ করে সৎবাক্য এবং তিনিই সব সৎকর্মকে মহীয়ান করেন।'- আল্লাহর সত্যায়ন ও সহায়তা ছাড়া কেউ উচ্চ-মর্যাদা পায় না এবং আল্লাহই মানুষকে দেখান সরল পথ। আল্লাহর রহমতে মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তির হৃদয় থাকে খোদা-প্রেমে মশগুল এবং তাঁর জিহ্বায় উচ্চারিত হয় প্রতিনিয়ত আল্লাহর প্রশংসা ও খোদায়ি নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা।

আল্লাহর পক্ষ থেকে মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তির কান্নাসিক্ত ও প্রেমার্ত দোয়া আসমানে পৌঁছে  এবং তিনি সব সময়ই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট থাকেন।  মহানবী (সা)'র নামকে মহান আল্লাহই উচ্চতর মর্যাদা দান করেছেন। তিনি মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং সব সময়ই মহান আল্লাহর সর্বোচ্চ দাসত্বে নিয়োজিত। তিনি আল্লাহর দিকে চিরস্থায়ী আহ্বানকারী ও সৎকর্মশীল ছিলেন।

মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম সৃষ্টি সর্বশেষ রাসুলকে (সা)সম্বোধন করে সুরা ইনশিরাহতে বলছেন:  আমরা কি তোমার জন্য তোমার বক্ষ প্রশস্ত করিনি? এবং তোমার থেকে তোমার ভার অপসারণ করিনি? যা তোমার পৃষ্ঠকে ভেঙ্গে ফেলছিল; এবং আমরা তোমার নাম বা স্মরণকে উন্নীত করেছি।

মহানবীর প্রতি সালাম ও দরুদ পাঠানো ছাড়া মুসলমানের নামাজ শুদ্ধ হয় না। প্রতিদিন ৫ বার আযানে উচ্চারিত হচ্ছে মহানবীর নাম। আর বিভিন্ন স্থানে সময়ের ব্যবধানের কারণে প্রতিটি মুহূর্তেই উচ্চারিত হয় এই আযান। জামাআতে নামাজ আদায়ের সময় আরও একবার উচ্চারণ করা হয় আযান তথা একামত।  যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পাপ থেকে দূরে থাকে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ তাকে উচ্চতর সম্মান দান করেন।

মহান আল্লাহর খাফিদ ও রাফিই নাম একই পাল্লার দুই পাত্রের মত। বান্দার পাপের পাল্লা ভারি হলে সম্মানের পাত্র নীচে নেমে যায় আর সৎ কাজ ও খোদাপ্রেমের পাল্লা ভারী হলে সম্মানের পাত্র ওপরে উঠে তথা অসম্মানের পাত্র নীচে নেমে যায়। তাই যেখানেই সত্যকে দেখা যাবে সেখানেই তার সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। আর যেখানে মিথ্যা দেখা যায় সেখানে তা নাকচ করতে হবে। আল্লাহর বন্ধুদের প্রতি ভালবাসা ও সেবার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে এবং আল্লাহর শত্রুদের সঙ্গে করতে হবে শত্রুতা।

আল্লাহর খাফিদ ও রাফিই নাম যার মধ্যে প্রতিফলন ঘটায় সে আল্লাহর সম্মানিত বিষয় ও ব্যক্তিকে সম্মান করে ও আল্লাহ ছাড়া অন্য  কিছুকে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ হিসেবে দেখতে পায় এবং আল্লাহকেই সবচেয়ে বড় হিসেবে দেখতে পায়।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ