মে ০২, ২০২১ ১৯:০৫ Asia/Dhaka

আট দিনব্যাপী বদর অভিযানে ইরানের কয়েকটি গ্রাম পুনরুদ্ধার হওয়া ছাড়াও ‘হোর’ অঞ্চলের ৮০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা ইরানের দখলে আসে।

সেইসঙ্গে ইরাকের খন্দক মহাসড়কের ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশের ওপরও ইরানি যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মহাসড়ক থেকে বসরা-আম্মারা মহাসড়কের দূরত্ব মাত্র ছয় কিলোমিটার। বদর অভিযানে ইরাকি বাহিনীর সাতটি ব্রিগেড ও পাঁচটি ডিভিশন শতকরা ২০ থেকে ১০০ ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া, ইরাকের তৎকালীন শক্তিশালী প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড রেজিমেন্টও মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়। অভিযানে ইরাকের প্রায় ১৫ হাজার সেনা হতাহত হওয়া ছাড়াও তাদের  তিন হাজার ২০০ সৈন্য ইরানের হাতে বন্দি হয়। বন্দি সেনাদের মধ্যে ১৩০ জনই ছিল কর্মকর্তা। বদর অভিযানে ইরাকের ২৫০টি সাঁজোয়া যান ও বিভিন্ন আকৃতির ৪০টি গোলা ইরানি যোদ্ধাদের হস্তগত হয়।

খায়বার অভিযানের মতো বদর অভিযানেও ইরান কাঙ্ক্ষিত সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু তারপরও এই দু’টি অভিযানকে আট বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওই দুই অভিযানের পরবর্তী বছরগুলোর যুদ্ধে ইরান যেসব সাফল্য পায় তার প্রায় সবগুলোর ভিত্তি রচিত হয়েছিল বদর ও খায়বার অভিযানে। এই দুই অভিযানে ইরান যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা পরবর্তীতে যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি পাল্টে দেয়। ইরাকের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর সর্বাত্মক পৃষ্ঠপোষকতার বিপরীতে ইরানের সমরাস্ত্রের যে ঘাটতি ছিল, বদর ও খায়বার অভিযানে ইরাকি ভূমি দখল করার পর সে ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়। ইরানি যোদ্ধারা ইরাকের মাটিতে এমন রণকৌশল প্রদর্শন করেন যাতে ইরাক সরকার রাজনৈতিক ও সামরিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়।

খায়বার ও বদর অভিযানের পর ইরাকের পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকরা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে খায়বার অভিযানের মাধ্যমে ইরান যুদ্ধের ময়দানে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে এবং বাগদাদ ইরানকে প্রতিহত করার জন্য নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য হয়। এছাড়া, আমেরিকা এই যুদ্ধের ব্যাপারে নিজের নীতি পুনর্মূল্যায়ন করে এবং বাগদাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরো বাড়িয়ে দেয়। খায়বার ও বদর অভিযানে প্রমাণিত হয়, সমরাস্ত্রের ঘাটতি নিয়েই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সব ধরনের বাধা বিপত্তি পেরিয়ে যুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করার ক্ষমতা রাখে যে ক্ষমতা এর আগে ইরানি যোদ্ধাদের ছিল না। খায়বার ও বদর অভিযানের ফলে ইরাকের সাদ্দাম বাহিনী মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়।

এ অবস্থায় সাদ্দাম সরকার পশ্চিমা দেশগুলোকে বেশি করে একথা বলার সুযোগ পেয়ে যায় যে, তোমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য ছাড়া ইরানের মোকাবেলায় টিকে থাকা ইরাকের পক্ষে অসম্ভব। বদর অভিযানে শত্রুসেনাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তীতে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ফাও দ্বীপ শত্রুর দখলমুক্ত করার পথ সুগম হয়। এই অভিযানের ফলে ইরানে এ উপলব্ধি জোরদার হয় যে, জলাভূমিতে অভিযান চালানোর জন্য আলাদা বিশেষ সেনা ইউনিট গঠন করতে হবে। ইরান প্রথম খায়বার অভিযান চালিয়েছিল জলাভূমিতে এবং বদর অভিযানেও তা অব্যাহত রাখা হয়। পরবর্তী অভিযানগুলোতেও যুদ্ধের একটি অংশ জুড়ে থাকে জলাভূমি।  ইরানি সেনাবাহিনীর নবগঠিত গানবোট ও ডুবুরি ইউনিটগুলো নদী, জলাশয় ও পারস্য উপসাগরে সংঘটিত যুদ্ধগুলোতে ইরাকি বাহিনীর জন্য মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়। আট বছরের যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত ইরাকিরা কখনোই ইরানের এই রণকৌশলের সঙ্গে পেরে ওঠেনি।

বদর অভিযানের আগ পর্যন্ত ইরাকিদের ধারনা ছিল, ইরানের সামরিক শক্তি ফুরিয়ে এসেছে এবং তাদের পক্ষে আর বড় ধরনের অভিযান চালানো সম্ভব নয়। কিন্তু বদর অভিযানের পর ইরাকিরা আরো একবার এ সত্য উপলব্ধি করে যে, ইরানি যোদ্ধাদেরকে কাবু করা এত সহজ নয় বরং তাদের পক্ষ থেকে নিত্যনতুন বিপদ আসছে। ইরানের নতুন নতুন রণকৌশল ও প্রযুক্তি বাগদাদকে ভাবিয়ে তোলে। ইরাক সরকার তার সামরিক শক্তি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।  বিশাল হোর অঞ্চলকে নিজের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসার পাশাপাশি এই অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য একটি নতুন বাহিনী গঠন করে বাগদাদ। বাহিনীর সদস্যদেরকে নতুন নতুন অস্ত্রসস্ত্রসহ হোর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হয়। কিন্তু জলাভূমিটি এত বিস্তীর্ণ যে, ইচ্ছে করলেই অতি অল্প সময়ের মধ্যে গোটা অঞ্চলকে একটি নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব নয়। ইরা

তারপরও ইরাকিরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যায় যাতে তাদের একটি কৌশলগত ভুলের কারণে ইরানি যোদ্ধারা আর কোনো সাফল্য অর্জন করতে না পারে। এদিকে আগের প্রতিটি অভিযানের মতো এবারও ইরাকি বাহিনী ইরানের বিভিন্ন শহরের আবাসিক এলাকার ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একইসঙ্গে পারস্য উপসাগরে ইরানের তেল কূপগুলো এবং ইরানের তেল ট্যাংকারগুলোর ওপর হামলা জোরদার করে। সাদ্দাম বাহিনীর এ কাজের লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের জন্য দায়ী পক্ষকে চিহ্নিত না করেই যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে ইরানকে বাধ্য করা। বলা যায়, ঠিক এখান থেকে ইরাক-ইরান যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে বাগদাদ সচেষ্ট হয়।

ইরান এতদিন ইরাকের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দিতে পারেনি। কিন্তু ১৯৮৫ সালের ১১ মার্চ ইরান পথমবারের মতো ইরাকের কিরকুক শহর লক্ষ্য করে একটি স্কাড-বি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ক্ষেপণাস্ত্রটি কিরকুক শহরের একটি বড় সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে আঘাত হানে। ইরাকিরা ইরানের রাজধানী তেহরানকে লক্ষ্য করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে থাকায় ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খামেনেী (রহ.) ১৯৮৫ সালের ১‌২ মার্চ ইরাকের রাজধানী বাগদাদে হামলা চালানোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। তিনি এক বক্তব্যে ইরাকের হাতে ক্ষেপণাস্ত্র তুলে দেয়ার জন্য তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের তীব্র সমালোচনা করেন।

ইরানের বেসামরিক এলাকাগুলোতে ইরাকের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এতটা বেড়ে গিয়েছিল যে, জাতিসংঘ দু’পক্ষকেই যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। ইরান তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রস্তাব মেনে নেয়। কিন্তু ইরাকিরা তেহরানের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রাখায় ১৯৮৫ সালের ১৪ মার্চ ইরান ইরাকের রাজধানী বাগদাদকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করে। ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত ১৩ তলাবিশিষ্ট রাফেদিন ব্যাংক ভবনে আঘাত হানে। এই হামলার পর ইরান সাদ্দাম সরকারের প্রতি এই আহ্বান জানায় যে, বাগদাদ যেন তার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখে তেহরানকে এ ধরনের হামলা চালিয়ে যেতে বাধ্য না করে।৳

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ